আজ বাঘদের দিন
খসরু চৌধুরী- ফেসবুক থেকে নেওয়া ছবি
খসরু চৌধুরী
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৫ | ০১:২০ | আপডেট: ২৯ জুলাই ২০২৫ | ১৮:৪১
| প্রিন্ট সংস্করণ
আজকের দিনটি বাঘদের জন্য বরাদ্দ। আজ আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস। ১৫ বছর ধরে দিনটি বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে। বাঘ বিড়াল গোত্রের ৩৭ প্রজাতির মধ্যে সবচেয়ে বড় আকারের প্রাণী। শুধু দেহের আকার বা রাজকীয় সৌন্দর্যের জন্য নয়– পুরাণ, উপকথা, শিকার কাহিনি, সংস্কৃতি, কাল্ট, মিথ মিলিয়ে বাঘ নিয়ে যত লেখা হয়েছে; একক কোনো প্রাণী নিয়ে তত লেখা, আলোচনা অন্য কারও ভাগ্যে জোটেনি।
যে ১৩টি দেশে এখনও বাঘ টিকে আছে সেসব দেশের জনগণের কাছে বাঘ তাদের জাতীয় সম্মানের স্মারক। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে বাঘ বসতির মানচিত্র দ্রুত সংকুচিত হতে হতে একুশ শতাব্দীর শুরুতে বিলুপ্তির আশঙ্কা দেখা দেয়। ১৯৭৩ সালে ভারতে বাঘ প্রকল্প চালু করে বাঘ সংরক্ষণের সফল কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এই সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে অন্যান্য বাঘ অধ্যুষিত দেশ একে একে বাঘ সংরক্ষণ জোরদার করতে থাকে। কিন্তু বাঘের জঙ্গল ইতোমধ্যে এতটাই বিরান হয়ে গেছে যে, ২০১০ সালে উদ্বিগ্ন বিশ্ব বন্যপ্রাণী তহবিল, আইইউসিএন, ক্যাট স্পেশালিস্ট গ্রুপ, প্যান্থেরা, স্পিসিস সারভাইভ্যাল কমিশন তড়িঘড়ি করে রাশিয়াতে বাঘ সম্মেলন ডাকে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পেরে সম্মেলনে বাঘ অধ্যুষিত দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানদের নিমন্ত্রণ করা হয়। কারণ রাষ্ট্রপ্রধানদের উদ্দীপনা ছাড়া কোনো উদ্যোগ প্রণোদনা পায় না। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর এটাই নিয়তি।

গত ১৫ বছরে কাজের কাজ যা হয়েছে তা হলো– বাঘ বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছেন, বাঘের জাত শুধুমাত্র দুটি। মূল ভূখণ্ডের বাঘ, আর দ্বৈপায়ন সুন্দা বাঘ। আগে মলিকুলার বিজ্ঞানীরা বাঘের ৯টি উপপ্রজাতির বয়ান দিয়েছিলেন। সাইবেরিয়ান বা আমুর বাঘ, কাস্পিয়ান বাঘ, দক্ষিণ চীনা বাঘ, ইন্দোচায়নিজ বাঘ, উপমহাদেশের বাংলা বাঘ, মালয়ান বাঘ, সুমাত্রাণ বাঘ, বালির বাঘ, জাভার বাঘ। এদের মধ্যে বালি, জাভা, কাস্পিয়ান, দক্ষিণ চীনের বাঘ গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকের মধ্যেই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।
২০২২ সালের মধ্যে বনের বাঘ দ্বিগুণ করার অঙ্গীকার ঘোষণা করেছিল বিশ্বব্যাংক। কিন্তু নেপাল, ভারতের কয়েকটি রাজ্যে বাঘ কিছু বেড়েছে। বাকি দেশগুলোয় বাঘের বসতি কমে এই মহান প্রাণীটি তার নিয়তির দিকে হাঁটছে। তবে হেকমতি দেখিয়েছে চীন। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরাট এলাকা ভাড়া নিয়ে সেখানে দক্ষিণ চীনের তিনটি বাঘ ছেড়েছে। বাঘগুলো জোগাড় করেছে চীনের বাঘ খামারিদের কাছ থেকে– খাঁটি জাতপাত পরখ করে। এর মধ্যে বাঘগুলো শিকার শিখেছে, বংশবৃদ্ধি করেছে। এই অবসরে দক্ষিণ চীনা বাঘের নষ্ট বসত পুনর্নির্মাণ, শিকার উন্নয়ন করে সর্বসাধারণের প্রবেশ রুখতে স্পেশাল টাস্কফোর্স নিয়োগ দিয়েছে তারা। সাম্প্রতিক খবর হচ্ছে, বাঘগুলো বনে নিজেদের দখলিস্বত্ব কায়েম করেছে, বাচ্চা দিয়েছে। দুর্ভাগ্য বলতে বাধ্য হচ্ছি, প্রকৃতি সংরক্ষণে কর্তৃত্ববাদী সরকার অনেকটাই সফল, অন্তত এশিয়ার প্রেক্ষাপটে এটাই নির্মম সত্য।
বাংলাদেশ বাঘের দেশ। আরও নৈকট্যে বললে, রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দেশ। রয়েল বেঙ্গল নাম নিয়ে অনেক শুদ্ধতাবাদীর অসূয়া আছে। আমি এর মধ্যে কোনো হীনমন্যতার কিছু পাইনি। বেশ কয়েকজন ব্রিটিশ সিভিলিয়নের লেখায় সম্মানের সঙ্গে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের উল্লেখ পেয়েছি।
দেড়শ বছর আগেও বাংলাদেশের প্রায় সব জেলায় প্রাকৃতিক বনভূমি, চর অঞ্চলের জঙ্গল, গ্রামীণ বাগানে বাঘ মানুষের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থ বজায় রেখে সহাবস্থান করত। বাংলায় দুর্ভিক্ষ, রাষ্ট্রবিপ্লব, মহামারি হলে বহু এলাকা জনবিরান হয়ে পড়ত। জনবসতি হয়ে উঠত জঙ্গলাকীর্ণ। বন্যপ্রাণী সেখানে প্রাণের স্পন্দন হয়ে দেখা দিত। কিন্তু নীল চাষ, পাট চাষ যেমন গ্রামীণ বন উজাড় করেছে, তেমনি দুটি বিশ্বযুদ্ধে কাঠের জোগান দিতে সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলো নষ্ট হয়ে গেছে।
এখন সুন্দরবন আর পার্বত্য চট্টগ্রামের সামান্য অঞ্চল ছাড়া বাংলায় বাঘ আর নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামে আদৌ বাঘ আছে কিনা সন্দেহ করি। একটি দুটি থাকলেও সেটা ‘জেনেটিক্যালি ভায়াবল’ বলে প্রত্যয় হয় না। সেখানে বাঘের শিকার প্রায় নেই। মারণ আগ্নেয়াস্ত্র ছড়িয়ে আছে আকসার। কয়েক বছর আগে সেখানে বাঘের অভয়ারণ্য রচনার একটি আলাপ ছিল। এ আকাশ কুসুম ভাবনা। প্রকৃতিতে মাংসাশী প্রাণী পুনঃস্থাপন অত্যন্ত দুরূহ। আর বাঘের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর মেগা প্রিডেটর পুনর্বাসন প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। ও কেবল চীনারাই পারে।

সুন্দরবনের বড় অংশ আমাদের ভাগে পড়েছে। বাঘও আছে সেখানে। কিন্তু এই জলাজংলায় বাঘের আয়ু কতদিন। দিন গোনার প্রসঙ্গ আসছে তার সংগত কারণ আছে। সুন্দরবন নদীমোহনায় পলি জমে গড়ে ওঠা চরের ওপর গজিয়ে ওঠা অত্যন্ত কষ্টসহিষ্ণু নির্বাচিত গাছ-গাছালির জঙ্গল। মাটি অস্থিতিশীল, ঝড় জলোচ্ছ্বাসের তাণ্ডব প্রতিবছর বাঘ আর তার শিকারের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলে।
এর ওপর চোখ রাঙাচ্ছে সম্ভাব্য উষ্ণায়নের প্রভাবে সমুদ্র সমতল ফুলে ওঠার আতঙ্ক। প্রতিবছর বিলিয়ন টন পলি সাগরে পড়ে গঙ্গা-মেঘনা মোহনা দিয়ে। কোনো সচেতন দেশ হলে এই পলি অপচয় একটি ব্যবস্থাপনায় নিয়ে আসত। তাতে জলস্তর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভূমির উচ্চতাও বাড়ানো সম্ভব হতো।
সুন্দরবনে অ্যানথ্রোপজনিক চাপ বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। মেঠো কাঁকড়া সুন্দরবনের জৈব সমন্বয়ের সবচেয়ে বড় অবদানকারী, প্রতিবেশ শৃঙ্খলের প্রধান জৈবযন্ত্র– বন নিংড়িয়ে ধরা হচ্ছে। প্রতিদিন, প্রতি মাসে। বৈধ-অবৈধ উপায়ে। নিয়ত জৈবপ্রাণ মেরে বিষ দিয়ে চিংড়ি, সাদামাছ ধরা হয়, হচ্ছে। সম্প্রতি পূর্ব সুন্দরবনে কর্তৃপক্ষের অভিযানে বিপুল পরিমাণ হরিণ ধরা ফাঁদ উদ্ধার প্রমাণ করে, কী বিশাল পরিমাণ হরিণ মারা পড়ে চোরা শিকারিদের হাতে। বাঘের প্রধান খাবার চিত্রাহরিণ। সেখানে যদি চোরা শিকারিরা থাবা বাড়ায়, বিষ শিকারিরা প্রাণের নিশানা মুছে দেয়, তাহলে বাঘ খাবে কী; বাঁচবে কেমন করে!
খবর পাই কিছু কিছু বন অফিসে বন বন্ধের সময় নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিলে জঙ্গলে শুঁটকির কারবার করা যায়। এই চিংড়ি শুঁটকি বস্তা বোঝাই করে লোকালয়ে বয়ে আনে বন কর্মচারীরাই। অথচ ভারতীয় সুন্দরবনের ব্যবস্থাপনা এমন যে, সেখানে হরিণ শিকার, চোরাই শুঁটকি করা, গাছ চুরি, ঘুষ নিয়ে অভয়ারণ্যে মাছ-কাঁকড়া ধরার ব্যবস্থা একেবারে বন্ধ। সেখানকার বন আধিকারিকরা জনগণকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে, এ বন তাদেরই। এর থেকে সম্পদ আহরণ করতে হবে রয়েসয়ে।
এসব দেখেশুনে মনে হয়, এই বন, বনের বাসিন্দা বাঘ কতদিন টিকতে পারবে! ভারতের লৌকিক সংস্কৃতিতে, ধর্মীয় সংস্কৃতিতে বাঘ বা বন্যজন্তুর সঙ্গে সংগতি রেখে জীবনযাপন অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার। জঙ্গলসংলগ্ন ভুপালে বাঘ চলে আসে জনপদে। সিংহ রাতে দলবেঁধে শিকার খোঁজে গুজরাতের শহরে। আরাবল্লীর জনবসতির পাশের পাহাড়ে, খোদ মুম্বাইতে চিতাবাঘ চলে আসে পাশের সঞ্জয় গান্ধী পার্ক থেকে। আমাদের এই আচার বা সহনশীলতা নেই।
এবারের বাঘ দিবসের প্রতিপাদ্য, বাঘে-মানুষে সহনশীল সহাবস্থান। বাঘ বাঁচাতে আমাদের এ মন্ত্রের কাছাকাছি আসতে হবে।
লেখক: খসরু চৌধুরী, বাঘ ও সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ
