প্রতিবাদের রঙিন ভাষা দেয়ালের গ্রাফিতি
.
দ্রোহী তারা
প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৫ | ২৩:৩৪ | আপডেট: ০৩ আগস্ট ২০২৫ | ০৭:৩৩
চব্বিশের জুলাই-আগস্ট ছিল বিদ্রোহের রঙিন ঋতু। ঝলমলে দিনের আড়ালে জমে থাকা নীরব ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়েছিল রাজপথে। নগরীর প্রতিটি দেয়াল পরিণত হয় প্রতিবাদের ক্যানভাসে। শব্দ যেখানে থেমেছিল, সেখানে রঙের রেখা নিয়েছিল উচ্চারণের দায়িত্ব। ২৮ জুলাই রাজধানীর পলাশীতে কার্টুনিস্ট ও চারুকলার শিক্ষার্থীরা পুলিশি বাধার মুখে নিজেদের গ্রাফিতি ও লেখার কাজ সম্পন্ন করতে পারেননি। কিন্তু সেই অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন হতে থাকে পরদিন থেকেই। রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে স্প্রে পেইন্ট দিয়ে লেখা প্রতিবাদী বাক্যে ভরে ওঠে সারাদেশের দেয়াল থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থাপনা।
আবু সাঈদের মায়ের কান্নাজড়িত কথা ‘হামার বেটাক মারলু ক্যান’ থেকে শুরু করে ‘৫২ দেখিনি ২৪ দেখেছি’, ‘সম্পদের হিসাব পরে, লাশের হিসাব আগে’, ‘দিনে নাটক, রাতে আটক’, ‘পুলিশি হত্যার বিচার চাই’– এমন নানা গ্রাফিতিতে ভরে ওঠে দেয়াল।
খুলনার বিএল কলেজের দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী সাবরিনা আক্তার শান্তা বলেন, ‘পুরো আন্দোলনে আমরা গ্রাফিতি করেছি। সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো, আমরা মানুষকে জানাতে পেরেছি যে, জুলাইয়ে আসলে কী হয়েছিল। ডুমুরিয়া উপজেলার সাহাপুরের মধুগ্রাম কলেজে আমরা কয়েকজন মিলে গ্রাফিতি করতে যাই। ওখানকার মানুষ ঠিকমতো জানতই না দেশে কী বিপর্যয় নেমে এসেছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘দেয়ালে যখন আবু সাঈদের শেষ সময়ের বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর গ্রাফিতি আঁকছিলাম, তখন মানুষ কৌতূহলী হয়ে এসে জিজ্ঞেস করছিল, কার ছবি, কী হয়েছে ছেলেটার। তখন আমরা আন্দোলনের পুরো ঘটনা, আবু সাঈদের মৃত্যু, তাঁর মা-বোনের কান্নার কথা বলেছিলাম। এসব শুনে তারা অবাক হয়েছিল। আমরা খুলনায় মূলত সম্প্রীতিমূলক গ্রাফিতিগুলো বেশি এঁকেছি। পাশাপাশি কল্পনা চাকমাকেও তুলে ধরেছি।’
গ্রাফিতি করার সময় অন্দোলনকারীদের তটস্থ থাকতে হতো। দ্রুত কাজ শেষ করে স্থান ত্যাগ করার তাড়া থাকত। এসব বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী নুজহাত নায়লাহ। তিনি বলেন, ৫ আগস্টের আগে যখন কলাভবনের ভেতরে ইনকিলাব জিন্দাবাদ– এই দুটি শব্দ লিখছিলাম, তখন এক ধরনের মানসিক চাপ ও ভয় অনুভব করেছিলাম। তখন অনেকটাই লুকিয়ে কাজ করতে হতো। কিন্তু পুরো দৃশ্যপট পাল্টে যায় ৫ আগস্ট। সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আমি ও আমার বন্ধুরা ক্যাম্পাসের দেয়ালজুড়ে আমাদের অধিকারের কথাগুলো ফুটিয়ে তুলেছিলাম।
ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক এলাকায়ও আন্দোলনের শেষের দিকে চলে দেয়াল লিখন ও গ্রাফিতি আঁকা। বিশেষত রামপুরার বনশ্রী এলাকার স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরা রাস্তাজুড়ে শেখ হাসিনার ব্যঙ্গচিত্রসহ নানা ছবি আঁকেন। ‘আসছে ফাগুন, আমরা হবো দ্বিগুণ’, ‘পানি লাগবে পানি’– এমন নানা প্রতিবাদী লেখায় রাঙিয়ে তোলেন দেয়ালগুলো।
বনশ্রীর বাসিন্দা কলেজপড়ুয়া দুই বন্ধু তানজিন রহমান ও খায়রুল বাশার। জীবনে কখনোই রংতুলি হাতে ধরেননি তারা। আন্দোলনে বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তা ও বাধার কারণে রাস্তায় বেরোতে না পারলেও শেষ দিকে বাবার হাত ধরেই নেমে আসেন রাস্তায় রংতুলি নিয়ে। রংতুলি কেনার টাকাও দিয়েছিলেন খায়রুলের মা। খায়রুল বলেন, ‘ইন্টারনেট যতটুকু সময় ছিল, এর মধ্যে যা দেখতাম ও যে স্লোগান শুনতাম, সেগুলোই আমরা ফুটিয়ে তুলেছিলাম রংতুলি দিয়ে। সত্যি বলতে, আমার ভেতরে জমে থাকা রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটছিল প্রতিটি রেখায়।’
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষর্থী আরিফুল ইসলাম নিজ শহর চট্টগ্রামে বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে রাঙিয়ে তুলেছিলেন দেয়াল। তিনি বলেন, ‘রাতে বের হতে পারতাম না। দিনের বেলায় স্প্রে পেইন্ট দিয়ে দেয়ালে স্লোগান লেখার চেষ্টা করতাম। কিন্তু ৫ আগস্টের পর আমার মনের ভেতর জমে থাকা সব কথা দেয়ালে ফুটিয়ে তুলেছি। তবে এখন কষ্ট লাগে সেগুলো নষ্ট হতে দেখে।’
নিজেদের ভেতরে জমে থাকা সব অনুভূতি গ্রাফিতি ও দেয়ালচিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরেছিলেন শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের মানুষ। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতায় অধ্যয়ন করা সিলমী সাদিয়া বলেন, ‘প্রিয় খুলনা শহরে গ্রাফিতি এঁকেছি মুক্ত গণমাধ্যম নিয়ে। পরে দেশের বিভিন্ন শহরে-গ্রামে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে, স্কুল-কলেজে গিয়ে গ্রাফিতির ছবি তুলে বেড়িয়েছি। যেন এগুলোর স্মৃতি সংরক্ষণ করতে পারি। আমি যখন গ্রাফিতি আঁকছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল, যেন শিক্ষার্থীদের রঙের আঁচড়ে দেশের নতুন ভিত গড়ে উঠছে।’
- বিষয় :
- গ্রাফিতি
