ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সাদাপাথর নিয়ে দুদকের প্রতিবেদন

স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারাও জড়িত

কর্তব্যে অবহেলা, যোগসাজশ ও ঘুষের প্রমাণ মিলেছে

স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারাও জড়িত
×

.

 হকিকত জাহান হকি

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৫ | ০১:২০ | আপডেট: ২২ আগস্ট ২০২৫ | ০৭:০৭

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে ভোলাগঞ্জ পর্যটন এলাকা থেকে সাদাপাথর চুরি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরকারের ছয়টি প্রশাসনিক সংস্থা ও বিভাগ জড়িত। তারা সাদাপাথর সংরক্ষণে প্রত্যক্ষভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েও সেগুলো সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এসব কথা বলা হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক প্রতিবেদনে। 

দুদকের গোয়েন্দা শাখার অনুসন্ধানে ৪২ জন স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তি, পাথর ব্যবসায়ী ও অন্যদের পাথর চুরিতে সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। তারা সরকারের ওই সব সংস্থার সঙ্গে যোগসাজশে কয়েকশ কোটি টাকার পাথর চুরি করেছেন। যাদের কর্তব্যে অবহেলার তথ্য-প্রমাণ রয়েছে দুদকের হাতে তারা হলেন– বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, থানার অফিসার ইনচার্জ এবং খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো ও বিজিবি সদস্য। 

দুদক মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন গতকাল বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, কমিশনের এনফোর্সমেন্ট টিম ভোলাগঞ্জে অভিযান চালিয়ে, অনুসন্ধান শেষে কমিশনে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। কমিশন অভিযোগটি প্রকাশ্যে অনুসন্ধানের জন্য শিগগির অনুমতি দেবে। এরপর অনুসন্ধান শেষে যে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে, সেটির ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। 
দুদকের একটি সূত্র জানায়, প্রকাশ্য অনুসন্ধানের সময় পাথর চুরির সঙ্গে জড়িত চিহ্নিত ব্যক্তিদের জ্ঞিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, স্থানীয় সরকারি সংস্থা ও প্রশাসনের চোখের সামনে রাষ্ট্রের সম্পদ চুরি হবে আর তারা এই দায় থেকে মুক্ত থাকবেন– এটা হতে পারে না। তাদের এই চুরির দায় নিতে হবে। ক্ষমতার অপব্যবহার ও কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর বিষয়ে যা বলা হয়েছে 
দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়, সাদাপাথর চুরি প্রতিরোধে খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো (বিএমডি) থেকে কোনো কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। প্রকাশ্য অনুসন্ধানে তাদের কর্তব্যে অবহেলার দায় নির্ণয় করা হবে। দুদকের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, সাদাপাথর মূলত একটি খনিজ সম্পদ। খনি ও খনিজ সম্পদ (নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়ন) আইন-১৯৯২ এবং ওই আইনের আলোকে প্রণীত খনি ও খনিজ সম্পদ বিধিমালা-২০১২ অনুযায়ী খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো (বিএমডি) সারাদেশে প্রাপ্ত খনিজ সম্পদের (তেল ও গ্যাস ব্যতীত) সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করবে। এই সংস্থা অনুসন্ধান লাইসেন্স, খনি ইজারা ও কোয়ারি (প্রাকৃতিকভাবে পাথরের নির্দিষ্ট অবস্থান) ইজারা দিয়ে থাকে। 

খনি ও খনিজ সম্পদ বিধিমালা-২০১২-এর বিধি ৯১ ও ৯৩ অনুযায়ী খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ এলাকা থেকে অবৈধভাবে সম্পদ উত্তোলন ও বেহাত করা হলে স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসনের সহায়তায় ওইসব সম্পদ উদ্ধার করতে হবে। এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের এখতিয়ার বিএমডির।

সিলেট বিভাগীয় কমিশনারকে নিয়ে বক্তব্য
সিলেটে ২০২০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে পাথর উত্তোলন নিষিদ্ধ রয়েছে। সিলেট বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবী গত ৮ জুলাই তাঁর কার্যালয়ে পাথর ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে বলেন, ‘সারাদেশে পাথর উত্তোলন করা গেলে সিলেটে যাবে না কেন? এর সঙ্গে মানুষের জীবন ও জীবিকা জড়িত।’ তাঁর এ বক্তব্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়। তাঁর বক্তব্য সাদাপাথর লুটপাটে ব্যাপক উৎসাহ জুগিয়েছে। সরকারিভাবে পাথর উত্তোলন নিষিদ্ধ থাকলেও তিনি ওই বক্তব্যের মাধ্যমে পাথর লুটপাটকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে পাথর-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক ও রাজনৈতিক নেতাদের অবৈধ স্বার্থ রক্ষায় ভূমিকা রেখেছেন। 

জেলা প্রশাসককে নিয়ে বক্তব্য 
প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি বিধি অনুযায়ী পর্যটন স্পটগুলোর নান্দনিক সৌন্দর্য বজায় রাখাসহ পরিবেশ সংরক্ষণে যথাযথ উদ্যোগ বা কার্যক্রম গ্রহণ করা জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব। পাথর উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এবং সংশ্লিষ্ট জেলার আওতাধীন রাষ্ট্রীয় সম্পদ (ভূমি ও ভূমি সংশ্লিষ্ট) রক্ষার দায়িত্ব জেলা প্রশাসকের হলেও পাথর লুটপাট ঠেকাতে সিলেটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদের সদিচ্ছার অভাব, অবহেলা, ব্যর্থতা ও নিষ্ক্রিয়তার তথ্যপ্রমাণ মিলেছে দুদকের অনুসন্ধানকালে। তাঁর অধীন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনকে সাদাপাথর পর্যটন স্পট রক্ষায় সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। এই স্পটের বর্তমান অবস্থা এক দিনে হয়নি। পাথর উত্তোলন সাত-আট মাস ধরে চললেও জেলা প্রশাসক ও তাঁর অধীন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
 
কোম্পানিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রসঙ্গে বক্তব্য 
দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এক বছরে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় বিশেষ করে সাদাপাথর পর্যটন এলাকায় দৃশ্যমানভাবে দিনে-দুপুরে উপজেলা প্রশাসনের গোচরেই লুটপাট হয়েছে। কোম্পানীগঞ্জে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে আজিজুন্নাহার চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত, মোহাম্মদ আবুল হাছনাত গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত, উর্মি রায় গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত, আবিদা সুলতানা গত বছরের ১১ জুলাই থেকে ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। তারা নামমাত্র ও লোক দেখানো কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া পাথর লুট বন্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। 

দুদকের অভিযানকালে পর্যটন স্পটে উপস্থিত দর্শনার্থী, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও অন্যদের কাছ থেকে জানা গেছে, অবৈধভাবে উত্তোলিত পাথর বাণিজ্যের কমিশন বাবদ প্রশাসনের তহশিলদার, এসিল্যান্ড, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট অন্যদের প্রতি ট্রাক থেকে পাঁচ টাকা হারে ও প্রত্যেক বারকি নৌকা থেকে একই হারে টাকা প্রদান করা হয়েছে। সিভিল প্রশাসনকে টাকা প্রদান করা হয় অন্যভাবে। যেমন– মোবাইল কোর্ট পরিচালনা না করা হলে ও অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের কাজে বাধা প্রদান করা না হলে সেলামির টাকা পকেটে উঠে যেত। সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস ও উপজেলা প্রশাসনের নির্দিষ্ট সোর্স, কর্মচারীর মাধ্যমে এই অর্থ সংগ্রহ করা হয়।

পুলিশ সুপারকে নিয়ে বক্তব্য 
চলতি বছরের ২৭ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন ও পরিবহন বন্ধের জন্য পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ প্রদান করলেও সিলেট জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান সাদাপাথর লুটপাটের বিষয়ে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। পুলিশ সুপারের নিষ্ক্রিয়তা ও যোগসাজশের কারণে সাদাপাথর লুটপাট করা সম্ভব হয়েছে। 

কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসিকে নিয়ে বক্তব্য
আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি এলাকায় আইন প্রয়োগ ও সরকারি সম্পদ অবৈধ দখল ও লুটপাট রোধের দায়িত্ব থানা পুলিশ তথা ওসির ওপর বর্তায়। ওই সময়ে কোম্পানীগঞ্জ থানায় ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী উজায়ের আল মাহমুদ আদনানসহ সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশ সদস্যরা অবৈধ পাথর ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিভিন্ন অঙ্কের কমিশন গ্রহণ করে সাদাপাথর লুটপাটে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেছেন বলে দুদকের অনুসন্ধানে তথ্য মিলেছে। 

দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিমের অভিযানকালে আরও জানা যায়, অবৈধভাবে উত্তোলিত পাথর প্রতি ট্রাকে প্রায় ৫শ ঘনফুট করে লোড করা হয়। পরিবহন ভাড়া ব্যতীত প্রতি ট্রাকের পাথরের দাম ধরা হয় ৯১ হাজার টাকা। এর মধ্যে প্রতি ট্রাক থেকে ১০ হাজার টাকা, পুলিশ ও প্রশাসনের জন্য আলাদা করা হয়। বাকি ৮১ হাজার টাকা অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনকারীরা নিজেদের মাঝে বণ্টন করে নেন। 

প্রতি ট্রাক থেকে ১০ হাজার টাকার মধ্যে পুলিশের (ওসি, সার্কেল এএসপি, এসপি ও অন্যান্য) জন্য পাঁচ হাজার টাকা এবং প্রশাসনের (তহশিলদার, এসিল্যান্ড, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক ও অন্যান্য) জন্য পাঁচ হাজার টাকা হারে প্রদান করা হয়। এ ছাড়া অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনকাজে ব্যবহৃত প্রতিটি বারকি নৌকা থেকে এক হাজার টাকা করে উত্তোলন করা হয়। তার মধ্যে পুলিশ বিভাগ পায় ৫শ টাকা এবং প্রশাসন (ডিসি ও ইউএনও) পায় ৫শ টাকা। পুলিশ নির্দিষ্ট সোর্সের মাধ্যমে প্রত্যেক ট্রাক ও নৌকা থেকে এসব চাঁদা বা অবৈধ অর্থ সংগ্রহ করে। 

বিজিবিকে নিয়ে বক্তব্য
কোম্পানীগঞ্জের সাদাপাথর এলাকায় ৩টি বিজিবি ক্যাম্প ও পোস্ট থেকে ঘটনাস্থলের দূরত্ব ৫০০ মিটার থেকেও কম। এত কম দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও কোম্পানি কমান্ডার অনুসন্ধানকালে ইকবাল হোসেনসহ বিজিবি সদস্যদের আর্থিক সুবিধা গ্রহণ ও নিষ্ক্রিয়তার কারণে পাথর উত্তোলনকারীরা খুব সহজেই পাথর লুটপাট করতে পেরেছে। অভিযানকালে জানা যায়, বিজিবি সদস্যরা নৌকা প্রতি ৫০০ টাকার বিনিময়ে নৌকাগুলো প্রবেশের অনুমতি দিয়েছেন এবং পাথর উত্তোলনের সময় কোনো বাধা প্রদান করেননি।

আরও পড়ুন

×