ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

অনলাইনে গরুর হাট, জমেও জমছে না

অনলাইনে গরুর হাট, জমেও জমছে না
×

প্রতীকী ছবি

রাশেদ মেহেদী

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২০ | ০৭:২০ | আপডেট: ২১ জুলাই ২০২০ | ০৮:৪১

কভিড-১৯ মহামারির বদলে যাওয়া সময়ে এবার অনলাইন পশুর হাট জমেও জমছে না। তবে অনলাইনে গরু কেনায় ‘স্লটারিং সার্ভিস’ বা জবাই করে ফুড গ্রেডেড প্যাকেটে মাংস বাসার ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ার নতুন সেবায় বেশ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ, অনলাইনে গরু কেনার পর সেই গরু আর বাসায় নেওয়ার দারকার হবে না। অনলাইন হাটেই থাকবে। কোরবানি ঈদের দিন বাসায় একেবারে মাংস পেয়ে যাবেন।

বাংলাদেশ ডেইরি ফার্ম অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ ইমরান হোসেন সমকালকে জানান, এরই মধ্যে তাদের সাইট থেকে অনলাইনে মোট গরুর ৫০ শতাংশ বুকিং এসেছে। তবে উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ডিজিটাল হাটের অন্যতম উদ্যেক্তা ও বাংলাদেশ ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েসনের সাধারণ সাম্পাদক মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহেদ তমাল জানিয়েছেন, তাদের এই হাটে সাড়া কম। মাত্র ১৫ শতাংশ গরু মঙ্গলবার পর্যন্ত তাদের হাট থেকে বিক্রি হয়েছে।

ক্রেতাদের মূল্যায়ন থেকে দেখা যায়, অনলাইনে সাধারণ বাজারের চেয়ে দাম বেশি ধরা হয়েছে বলে অধিতাংশ ক্রেতার মত। তবে বিক্রেতারা বলছেন, দাম বরং সাধারণ বাজারের চেয়ে কম। কারণ সাধারণ বাজারে হাসিল এবং পরিবহনের যে অতিরিক্ত খরচ তা অনলাইনে নেই। বরং অনলাইনে রয়েছে ফ্রি হোম ডেলিভারি।

অনলাইনে অনেক বিক্রেতা, অনেক গরু: দেশে অনলাইন পশুর হাট নতুন নয়। ২০১১ সালে ‘সাদেক অ্যাগ্রো কোরবানি বাজার’-এর মধ্য দিয়ে অনলাইনে পশুর হাট শুরু হয়। এরপর কিছু হাট অনলাইনে প্রতি বছরই দেখা গেছে। তবে এ বছর মহামারির সময়ে সাধারণ বাজারে যাওয়ার ক্ষেত্রে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি বিবেচনায় অনলাইন পশুর হাট বেশি জমতে পারে, এ আশায় একলাফে প্রায় এক ডজন অনলাইন পশুর হাট খুলে গেছে। কয়েক ধরনের বাজার রয়েছে। একটি হচ্ছে উদ্যোক্তার নিজস্ব বাজার। যেমন সাদেক অ্যাগ্রো কোরবানি বাজার। এখানে সাদেক অ্যাগ্রোর ফার্মের নিজস্ব গরু পাওয়া যায়। কিন্তু ডিজিটাল হাট হচ্ছে বিভিন্ন অনলাইন এবং বিক্রেতার সমাহার। এই মার্কেট প্লেস ব্যবহার করে তৃতীয় আর একজন বিক্রেতার কাছ থেকে গরু কিনছেন। ডিজিটাল হাট সাধারণ হাটের মতই অনলাইনে একটি জায়গা, যেখানে নানা ধরনের বিক্রেতারা গরু নিয়ে আসছেন। আবার ই-অর্ডারের মত কোরবানি শপে উদ্যেক্তারা বিভিন্ন স্থান থেকে গরু সংগ্রহ করেছেন। সেই একটি প্লাটফর্ম থেকে বিক্রি করা হচ্ছে।

ক্রেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, যেসব অনলাইনে নির্দিষ্ট ফার্মের গরু বিক্রি হচ্ছে সেগুলোর প্রতিই মানুষের আকর্ষণ বেশি। যেমন সাদেক অ্যাগ্রো ফার্মের প্রধান মোহাম্মদ ইমরান হোসেন জানান, গত ১১ জুলাই থেকে অনলাইনে বুকিং নেওয়া শুরু করেছেন। তাদের ফার্মের প্রায় দুই হাজার গরুর মধ্যে গত ২০ জুলাই পর্যন্ত এক হাজারের বেশি গরুর বুকড হয়ে গেছে। এর ৬০ শতাংশ আবার ‘স্লটাররিং’ বা জবাই সহ বুকিং হয়েছে। তিনি জানান, এ বছর বড় গরুর চাহিদা কম, ছোট গরুর চাহিদা বেশি। ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকার মধ্যে যেসব গরু সেগুলোই বেশি বিক্রি হচ্ছে। বুকড হওয়া গরুর মধ্যে ৯০ শতাংশের দাম দুই লাখের নীচে। ১০ শতাংশের দাম দুই লাখ থেকে চার লাখ টাকার বেশি।

ডিজিটাল হাটের ব্যাপারে মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহেদ তমাল জানান, ডিএনসিসি’র ডিজিটাল হাটসহ অন্যান্য যেসব হাট বা মার্কেট প্লেস আছে সেগুলোতে যথাযথ সাড়া এখন পর্যন্ত মেলেনি। ডিজিটাল হাট থেকে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত মাত্র ৩০০ গরু বুকিং হয়েছে। অথচ হাটে গরু আছে দুই হাজারের বেশি। তিনি বলেন, মানুষ এখনও অনলাইন থেকে গরু কেনার সুবিধার বিষয়টি বুঝতে পারছেন না। যে কারণে ডিজিটাল হাটসহ এ ধরনের সাইটগুলোতে এখন পর্যন্ত বুকিং হতাশাজনক। তবে ঈদ যত কাছে আনবে বুুকিং তত বাড়বে বলে তার প্রত্যাশা।

এদিকে বিভিন্ন সাইটে ক্রেতাদের রিভিউতে বলা হচ্ছে, অনলাইনে দাম বেশি রাখা হচ্ছে। মার্কেট প্লেস ‌‘দারাজের গরু বাজারে’ একটা গরুর দাম ১ লাখ ১৬ হাজার ২৪০ টাকা। নীচে প্রায় দশটির বেশি মন্তব্য এসেছে। অধিকাংশই লিখেছেন, সাধারণ বাজারে এই গরুর দাম ৭৫ হাজার টাকার বেশি হবে না। একজন লিখেছেন, দাম দেখে হতাশ হয়েছেন। এখন সরাসরি হাটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ডেইরি ফার্ম অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ ইমরান হোসেন বলেন, ‘কিছু কিছু মার্কেট প্লেসে দাম বেশি লেখার কথা তারা নিজেরাও শুনেছেন। এ কারণে তাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে ই-ক্যাবের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে, দাম যেন অবশ্যই যৌক্তিক এবং সহনীয় পর্যায়ে থাকে। তবে ই-ক্যাব সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহেদ তমাল বলেন, অনলাইনে বরং গরুর দাম কম। বিশেষ করে সাধারণ হাটে হাসিল এবং পরিবহন বাবদ অতিরিক্ত খরচ যোগ হয়, অনাইনে হয় না। এ বিষয়টি বিবেচনায় আনলে দাম অবশ্যই সাধারণ হাটের চেয়ে কম। তিনি আরও জানান, ডিজিটাল হাটে ক্রেতারা জ্যান্ত গরুর ক্ষেত্রে ৪০০ কেজির নিচে প্রতি কেজি ৩৭৫ টাকা, ৪০০ থেকে ৫০০ কেজির মধ্যে প্রতি কেজি ৪২৫ টাকা এবং ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি বা তার বেশি ওজনের গরুর জন্য ৪৭৫ টাকা কেজি দরে কিনবেন। এটা সর্বাচ্চ দাম, এর উপরে যাবে না।’

‘স্লটারিং সার্ভিস’, একদম ঝামেলা মুক্ত: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কোরবানির জন্য ‘স্লটারিং সার্ভিস চালু আছে। এবার বাংলাদেশেও এই অফার দিচ্ছেন অনলাইন পশু বাজারের উদ্যেক্তারা। মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহেদ তমাল পুরো বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, এ বছর কভিড-১৯ মহামারির কারণে অনেক ভবনেই পশু জবাই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ কারণেই এ বছর অনলাইনে ‘স্লটারিং সার্ভিস’ জনপ্রিয় হচ্ছে।

তিনি জানান, অনলাইনে গরু কেনার ক্ষেত্রে ‘স্লটাররিং সার্ভিস’ যুক্ত করে অর্ডার দিতে পারছেন গ্রাহকরা। এক্ষেত্রে গরু হোম ডেলিভারি করা হবে না। ২৮ জুলাই ক্রেতা অনলাইন বিক্রেতার কছ থেকে গরুটি স্লটারিং সেন্টার বা জবাইখানায় নিয়ে যাবেন কিংবা নিয়ে যাওয়ার জন্য সম্মতি দেবেন। জবাইখানায় গরু জবাই করে মাংস ফুড গ্রেডেড প্যাকেটে করে বাসায় দিয়ে আসা হবে। ক্রেতা নিজেও জবাই করার সময় স্লটারিং সেন্টারে উপস্থিত থাকবেন বা থাকতে পারেন। জবাই খানায় প্রক্রিয়াকরণের পর মাংস ক্রেতার বাসায় পৌঁছে দেওয়া হবে। স্লটারিং সার্ভিস এর জন্য গরুর মূল্যের সঙ্গে পৃথক সার্ভিস যুক্ত হবে।

মোহাম্মদ ইমরান হোসেন জানান, স্লটারিং সার্ভিসে প্রক্রিয়াজাত করে ক্রেতার বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দিতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ৩৭৫ টাকা কেজি দরে (জীবন্ত গরুর ওজন) হিসাব করে বিক্রি করা হবে। ক্রেতা যদি প্রসেস করে নিতে চান তাহলে দামের ১৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জ দিলে তা তার বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া হবে। ক্রেতা গরু কেনার সময় অনলাইনে যে ওজনের হিসেব দেখবেন, সে অনুযায়ী মাংস গ্রহণের সময় মাংস মেপে নেবেন। ফলে ক্রেতার প্রতারিত হওয়ার কোন আশঙ্কা নেই। তিনি বলেন, ‘যদি দুই কেজি মাংস কম হয় তাহলে তার দাম ফেরত দেওয়া হয়, যদি দুই কেজী বেশি হয়, দাহলে দাম নেওয়া হয় না।’

আরও পড়ুন

×