আইএমইডির মূল্যায়ন প্রতিবেদন
আশ্রয়কেন্দ্রে অনিয়মের ঠাঁই
পানি নেই, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ
কক্সবাজারের চকরিয়ায় বেহাল আশ্রয়কেন্দ্র। সম্প্রতি তোলা -সমকাল
আবু হেনা মুহিব
প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ০৯:২৯ | আপডেট: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৪১
| প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের ১৬ জেলার ৮৬টি উপজেলায় নির্মিত ২২০ আশ্রয়কেন্দ্রের সবকটির অবস্থা নাজুক। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মানুষকে সহায়তা দিতে একটি প্রকল্পের আওতায় এসব আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছিল। এখন আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর কোনোটিই ব্যবহারের জন্য শতভাগ উপযোগী নয়। অনেক আশ্রয়কেন্দ্রে পানির ব্যবস্থা নেই। পরিবেশও অস্বাস্থ্যকর। কোনো আশ্রয়কেন্দ্রে বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা হয়নি। এ কারণে ৫৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এসব স্থাপনা বন্যার মতো দুর্যোগের সময় দুর্গতদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারেনি।
‘উপকূলীয় ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় বহুমুখী আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ (দ্বিতীয় পর্যায়)’ প্রকল্পের কাজ শেষে প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এসব অনিয়ম পেয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ আইএমইডি। প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০২২ সালের জুন মাসে। গত এপ্রিলে সরেজমিন পরিদর্শন, প্রকল্পের দলিলাদি, উপকারভোগীদের সঙ্গে আলোচনা, প্রকল্পের সমাপ্তি প্রতিবেদন, অনুমোদিত নকশা পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। তৃতীয় পক্ষ হিসেবে বিআইএসআর কনসালট্যান্টস লিমিটেড আইএমইডির পক্ষে এ কাজ করেছে।
প্রতিবেদনে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের তিনটি আশ্রয়কেন্দ্রের উদাহরণ দেওয়া হয়। এগুলো হলো সেলিমাবাদ ডিগ্রি কলেজ-কাম বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, তোরাব আলী মেমোরিয়াল মাধ্যমিক বিদ্যালয় ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র ও সোনাখালী আজিজিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র। এসব কেন্দ্রের কোনোটিতেই প্রকল্পের প্রধান চার কার্যক্রমের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। কেন্দ্রগুলোতে গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়নি। গবাদি পশুর আশ্রয়কেন্দ্র নেই। অ্যাপ্রোচ রোড নেই। সোলার প্যানেল নষ্ট হয়ে আছে।
আইএমইডির প্রতিবেদনের তথ্য যাচাই করতে সমকালের পক্ষ থেকে কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্রে খোঁজ নেওয়া হয়েছে। গত বুধবার সরেজমিন গিয়ে সোনাখালী আজিজিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রটিকে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। কেন্দ্রটির দরজা-জানালা খুলে গেছে। কেন্দ্রটির নির্মাণের কার্যাদেশ পাওয়া মূল ঠিকাদার কাজ না করে শুক্কুর আলী নামে স্থানীয় একজন ঠিকাদারের কাছে তা বিক্রি করে দেন।
গত কয়েক দিনে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেন দুর্গত অনেকে। গত সোমবার সেখানে আশ্রিতদের দুর্ভোগ দেখা গেছে। বন্যার পানি সরে যাওয়ার আগেই অনেকে আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়েছেন। অনেকে জানিয়েছেন, বিদ্যুৎহীন রাত তাদের কাছে ভয়ানক ছিল। মোবাইল ফোনের আলোতে প্রয়োজনীয় কাজ সারতে হয়েছে। স্থানীয় একটি ক্লাবের পক্ষ থেকে খাবারের ব্যবস্থা করায় কিছুটা উপকার হয়েছে তাদের।
কক্সবাজারের পেকুয়ার উজানটিয়া বহুমুখী কমিউনিটি আশ্রয়কেন্দ্রের অবস্থা আরও নাজুক। ছাদের পলেস্তারা খসে পড়েছে। পিলারেও ফাটল। ঝুঁকি জেনেও বানভাসি মানুষ সেখানে আশ্রয় নেন। এবারের বন্যায় ২০০ পরিবার সেখানে আশ্রয় নেয়। স্থানীয়রা জানান, দুর্গত মানুষের পরিবর্তে আশ্রয়কেন্দ্রটি মাদকসেবী ও কিশোর গ্যাংয়ের আস্তানা হিসেবেই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।
প্রকল্পটি নেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল দরিদ্র, অসহায়, সম্বলহীন জনগোষ্ঠীকে দুর্যোগকালীন আশ্রয় দেওয়া। দুর্যোগে গবাদি পশু ও গৃহস্থালি সামগ্রীর সুরক্ষা দেওয়া। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নেওয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। ২০১৬ সালের জুলাইয়ে প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয়। শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৯ সালের জুনে।
জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব সাইদুর রহমান খান গতকাল সমকালকে বলেন, আশ্রয়কেন্দ্রগুলো বছরজুড়ে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। এটাই মূল সমস্যা। এগুলোকে ব্যবহার উপযোগী করতে উদ্যোগ নিয়েছেন তারা। এ জন্য আলাদা বাজেটের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সারা বছর শিক্ষা কার্যক্রম, প্রশিক্ষণ ও সামাজিক বিভিন্ন কাজে আশ্রয়কেন্দ্রের ব্যবহার উপযোগিতা বাড়াতে কার্যকর কৌশল নির্ধারণে শিক্ষা ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ শুরু করেছেন তারা।
নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় মেয়াদ দুই বছর বাড়িয়ে দ্বিতীয় দফা সংশোধনী শেষে ২০২২ সালের জুনে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। বিলম্বকে অনেক বড় ক্ষতির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় আইএমইডির প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, সময়মতো প্রকল্পের কাজ শেষ হলে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ফণী ও বুলবুল এবং ২০২০ সালে আম্পানের মতো ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের কবল থেকে উপকূলবাসীর জীবন ও সম্পদ রক্ষা করা যেত। শুধু আম্পানেই ২৫ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
প্রকল্পের পটভূমিতে বলা হয়, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। দেশটিতে প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যার কারণে ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়। ১৯৭০ ও ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়, ২০০৭ সালে সিডর, ২০০৯ সালে আইলা ও ২০১৩ সালে মহাসেনের মতো দুর্যোগে উপকূলীয় অঞ্চলে মারাত্মক প্রভাব পড়ে। একইভাবে ১৯৮৭, ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০০০ ও ২০০৪ সালের বন্যায় দেশের ৩৯ জেলার ২৬৫ উপজেলায় ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি হয়। এই ক্ষতি থেকে রক্ষায় সরকারি ও বেসরকারিভাবে ৩ হাজার ৮৫১টি আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত জনপদ, গবাদি পশু ও সম্পদের নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করতে তা পর্যাপ্ত ছিল না। এ বাস্তবতায় দুর্যোগকালে নিরাপদ আশ্রয়ের পাশাপাশি স্বাভাবিক সময়ে শিক্ষা ও সামাজিক কার্যক্রমে ব্যবহার উপযোগী অবকাঠামো গড়ে তুলতে ২২০টি বহুমুখী আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়।
আইএমইডির প্রতিবেদন বলা হয়, প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে ২২০টি। তবে সবই নষ্ট অবস্থায় আছে। এ কারণে দুর্যোগকালে আশ্রয় নেওয়া দুর্গতরা বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দুর্যোগকালে সাধারণত গ্রিডে বিদ্যুৎ থাকে না। এ কারণে সোলার প্যানেলকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা ‘রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং’ স্থাপন করা হয়। কিন্তু অপরিচ্ছন্নতার কারণে এগুলো ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিটি কেন্দ্রে গবাদি পশু আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের কথা ছিল। বাস্তবে ১০০টিও নির্মাণ করা হয়নি। গবাদি পশু রাখার ব্যবস্থা না থাকায় অনেকে এগুলো কম দামে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন।
ডিপিপিতে প্রতিটি গবাদি পশু আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ বাবদ ব্যয় ধরা হয় ১৪ লাখ টাকা। সে হিসাবে ১৪ কোটি টাকার কাজও হয়নি। ৩৪টি গভীর নলকূপ নির্মাণ করা হয়নি। প্রতিটির জন্য বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা। সে হিসাবে এই খাতে ৭৬ কোটি ৫০ হাজার টাকার কাজ হয়নি। যেসব গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগের মোটর নষ্ট। ফলে এগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী।
প্রকল্পের এসব অনিয়মের কারণ হিসেবে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের দুর্বলতার কথা উল্লেখ করা হয় আইএমইডির প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, সমীক্ষাটি তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ ও বাস্তব চাহিদা নিরূপণের দিক থেকে পর্যাপ্ত ছিল না। এ কারণে মাঝপথে প্রকল্প সংশোধন করতে হয়েছে। প্রকল্পে চারজন পরিচালক দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে সর্বশেষ ২০২১ সালের নভেম্বর থেকে প্রকল্পের মেয়াদকাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব অঞ্জন চন্দ্র পাল। ঘন ঘন পরিচালক পরিবর্তন করার কারণেও প্রকল্পের কাজের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছে। তবে নির্মিত আশ্রয়কেন্দ্রগুলো স্থানীয় স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটি ও মাদ্রাসা কমিটির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে যাতে প্রকল্পের উদ্দেশ্য অনুযায়ী দুর্যোগকালে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার ও স্বাভাবিক সময়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়।
প্রতিবেদনের সুপারিশ অংশে আইএমইডি দীর্ঘ মেয়াদে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর স্থায়িত্ব ও পূর্ণাঙ্গ কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে রক্ষণাবেক্ষণ জোরদার, নিয়মিত তদারক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করে সমন্বিত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং জরুরি ভিত্তিতে ভবনের ফাটল, দরজা-জানালার সংস্কার, সোলার সিস্টেম ও ডিপ টিউবওয়েল মেরামতের কথা বলা হয়। এ ছাড়া নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ, কার্যকর তদারক এবং আর্থিক অনিয়মের অনিষ্পন্ন অডিট আপত্তি দ্রুত নিষ্পত্তির সুপারিশ করেছে আইএমইডি।
(প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন সমকালের কক্সবাজার প্রতিনিধি ইব্রাহীম খলিল মামুন, কক্সবাজার জেলার বাঁশখালী প্রতিনিধি আবুল মাতলুব কালু ও বাগেরহাট জেলার মোরেলগঞ্জ প্রতিনিধি ফজলুল হক খোকন)
- বিষয় :
- আইএমইডি
- আশ্রয়কেন্দ্র