ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

বন্ধ করা হয় ফেসবুক

শেখ হাসিনার ভাষণ প্রত্যাখ্যান, রাজপথে ছাত্রদের পাশে জনতা

রামপুরা, যাত্রাবাড়ী দখল

শেখ হাসিনার ভাষণ প্রত্যাখ্যান, রাজপথে ছাত্রদের পাশে জনতা
×

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ০৯:২৬ | আপডেট: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৫৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

আগের দিন রংপুরে আবু সাঈদসহ চট্টগ্রাম ও ঢাকায় ছয়জন শহীদ হওয়ার পর ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই ছিল পবিত্র আশুরার সরকারি ছুটির দিন। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় শোকের কালো পোশাক পরে টেলিভিশনে ভাষণ দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বলেন, ‘অনেক দুঃখ-ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আমি এসেছি।’ তিনি কোটা আন্দোলন ঘিরে নিহতদের জন্য শোক প্রকাশ করেন। বলেন, ‘আমি খুবই মর্মাহত।’ একই সঙ্গে তিনি এসব ঘটনায় যারা জড়িত, তাদের বিচার হবে বলে জানান।

কিন্তু শেখ হাসিনার ওই ভাষণ প্রত্যাখ্যান করে রাত পৌনে ৮টায় প্রথমে রামপুরা ও পরে যাত্রাবাড়ীতে হাজারো ছাত্র-জনতা নেমে আসে ‘নাটক কম কর পিও’ স্লোগানে।

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলনটি রূপ নেয় সংঘর্ষে। ১৭ জুলাই বিক্ষোভের কেন্দ্র ছিল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবু সাঈদসহ অন্যান্য শহীদের গায়েবানা জানাজা করতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয়।

এর আগে ছুটির দিনেও ক্যাম্পাসগুলোতে বিক্ষোভ হয়। ১৭ জুলাই প্রথমবারের মতো এতে যোগ দেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তবে তাদের দাবি কোটা সংস্কার নয়; তারা চেয়েছিলেন আবু সাঈদসহ ১৬ জুলাইয়ের হত্যা এবং ছাত্রলীগের হামলার বিচার। এ দাবিতে রামপুরায় নামা ইস্ট ওয়েস্ট ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দুপুরে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়।

শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে ভাষণে উচ্চ আদালতের রায় আসা পর্যন্ত ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানালেও যাত্রাবাড়ীতে সেদিন নেমে আসে হাজার হাজার মানুষ। পুলিশের এলোপাতাড়ি গুলিতে সাংবাদিক মেহেদি হাসানসহ ছয়জন নিহত হন।

আওয়ামী লীগের পক্ষে সেদিন যারা যাত্রাবাড়ীতে নেমেছিল, তারা প্রথম ধাওয়াতেই ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। 

সংঘর্ষ, ছাত্রলীগ বিতাড়িত

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের হল বন্ধের ঘোষণা ও পুলিশের তৎপরতার মুখে অনেক শিক্ষার্থী সন্ধ্যায় ক্যাম্পাস ছেড়ে যান। তবে হল বন্ধের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে রাতেও অনেক ছাত্রছাত্রী হল ও ক্যাম্পাসে অবস্থান করেন। 

তারা ওই রাতে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হল থেকে বিতাড়িত করেন। ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি হল থেকে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনকে বের করে দেওয়া হয়। কক্সবাজার, বগুড়া ও শেরপুরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশ ও ছাত্রলীগ-যুবলীগের কর্মীদের সংঘর্ষে অনেকে আহত হন। 

এদিন অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের ঘোষণা ও নারী শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু তা মানেননি শিক্ষার্থীরা। তারা প্রাধ্যক্ষসহ শিক্ষকদের তালাবদ্ধ করে রাখেন। 

১৭ জুলাই দুপুরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হলেও শিক্ষার্থীরা মানেননি। হামলা করতে এলে ছাত্রলীগকে ধাওয়া দিয়ে বের করে দেয় ক্যাম্পাস থেকে। উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করে রাখেন শিক্ষার্থীরা।

১৭ জুলাই দুপুরে গায়েবানা জানাজা শেষে আন্দোলনকারীরা কফিন মিছিল নিয়ে রাজু ভাস্কর্যের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। এই সময় ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয়। পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়লে শিক্ষার্থীরা ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করেন। এর আগে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেন শিক্ষার্থীরা। 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যকে প্রায় ৫ ঘণ্টা অবরুদ্ধ রেখে ছাত্রলীগকে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেন শিক্ষার্থীরা।

অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও ক্যাম্পাস বন্ধে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলন চালিয়ে যান। আবু সাঈদকে ১৭ জুলাই রংপুরের পীরগঞ্জে তাঁর গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দাফনের পর ক্যাম্পাসে জানাজা পড়েন। 

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক তৎপরতা কাজ করছিল না

সাধারণ মানুষ যখন শিক্ষার্থীদের পাশে নেমে আসে, তখন আওয়ামী লীগ তা দমনের ছক কষছিল। ১৭ জুলাই দলীয় কার্যালয়ে দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ঢাকা জেলা ও মহানগর (উত্তর ও দক্ষিণ) আওয়ামী লীগ, দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত কাউন্সিলর এবং ঢাকার দলীয় সংসদ সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশ নেন। ছাত্র-জনতাকে মোকাবিলায় ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে প্রস্তুতি নিতে বলেন। 

আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার জন্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো ‘গুজব’ দায়ী বলে দাবি করেন তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক।
এদিন দুপুর থেকেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহারে সমস্যায় পড়ে মানুষ। দুপুরের পর থেকে মোবাইলে ইন্টারনেটের গতি কমে যায়। ফেসবুক ও মেসেঞ্জার ব্যবহার ব্যাহত হতে থাকে। রাতে বন্ধ করায় ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যম। 

১৭ জুলাই পুরানা পল্টন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীর ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী সেখানে জড়ো হয়েছিলেন দলটির নেতাকর্মীরা। গায়েবানা জানাজার পর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বিএনপির নৈতিক সমর্থন রয়েছে।

শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর আকুতি

১৭ জুলাই বিকেলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া পরদিন থেকে সারাদেশে কমপ্লিট শাটডাউনের ঘোষণা দেন। শিক্ষার্থীদের পাশে জনতাকে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। 

সন্ধ্যার পর সাধারণ মানুষ রাজপথে নামতে শুরু করে। রামপুরা-বাড্ডা এবং যাত্রাবাড়ী-হানিফ ফ্লাইওভার এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। 

শিক্ষার্থীদের ওপর এই হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে আফতাবনগর, বনশ্রী এবং হাজীপাড়ার স্থানীয় বাসিন্দা, দোকানদার ও মেসের সাধারণ তরুণরা রাস্তায় নেমে আসেন। গলির ভেতর থেকে সাধারণ মানুষ পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে এবং প্রধান সড়কে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। যাত্রাবাড়ী, শনিরআখড়ায় রিকশাচালক, হকার ও যুবকরা তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। সাধারণ মানুষ ইটপাটকেল ও লাঠিসোটা নিয়ে পুলিশকে ধাওয়া করে। রাজপথ তাদের দখলে চলে যাওয়ায় চট্টগ্রামের সঙ্গে ঢাকার সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

যাত্রাবাড়ীতে সেদিন সাধারণ মানুষ শিক্ষার্থীদের পানি ও খাবার এগিয়ে দেয়। উত্তরা ও আজমপুরের বিভিন্ন গলির ভেতর থেকে সাধারণ মানুষ, গৃহিণী ও যুবসমাজ রাজপথে এসে শিক্ষার্থীদের সমর্থনে স্লোগান দিতে শুরু করেন। তারা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে রাতেও রাস্তায় অবস্থান নেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৭ জুলাই সন্ধ্যায় শেখ হাসিনার ভাষণটি ছিল আন্দোলনের বাঁকবদলকারী। এতে ক্ষুব্ধ মানুষ ফুঁসে ওঠে এবং সন্তানদের ওপর চালানো রাষ্ট্রীয় হিংসার প্রতিবাদে রাজপথে নেমে আসে।

আরও পড়ুন

×