ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

উদ্ভিদ

ঢাকার প্রাকৃত তরু মেন্দা

ঢাকার প্রাকৃত তরু মেন্দা
×

ধানমন্ডি ঝিলের পাড়ে মেন্দাগাছে ফুল ফুটেছে - লেখক

মৃত্যুঞ্জয় রায়

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৭:০৭ | আপডেট: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৯:৫৪

বর্ষাকাল। সকালবেলায় হাঁটছি ধানমন্ডি ঝিলের ধারের পূর্ব পাশের রাস্তা ধরে। হাঁটতে হাঁটতে পানসী রেস্তোরাঁ ও একটি সেতু পেরিয়ে রাস্তার তেমাথায় গিয়ে পৌঁছালাম। সেখান থেকে একটা পথ গেছে কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের মাঠের দিকে, একটি পথ গেছে লেকের পশ্চিমপাড়ের উদ্যানে; আর একটি রাস্তা, যেটি দিয়ে আমি এলাম। হঠাৎ বৃষ্টি নামল। তাই তেমাথায় একটা ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে পড়লাম। চারপাশ মেঘ-জলে ঘোলাটে হয়ে গেছে। ঝিলের জলে বৃষ্টি পড়ছে, যেন অজস্র জলের গুঁড়া মিলিয়ে যাচ্ছে জলের ভেতর। হঠাৎ ছাউনির পাশে ঝিলের কোলে একটা সঘন পাতাওয়ালা গাছ চোখে পড়ল। বৃষ্টিচ্ছটায় গাছ থেকে রাস্তার ওপর হলদে ছোট ছোট ফুল ঝরে পড়ে জলের ভেতর লুটোপুটি খাচ্ছে। গাছের ডালে ডালে হলদে ফুলের যেন আসর বসেছে।

বৃষ্টি থামতেই একটা বেঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে ফুলগুলো ভালো করে দেখলাম, পাতা ছিঁড়ে কচলিয়ে তার ঘ্রাণ শুঁকলাম, ফুল-পাতার ছবি তুললাম। নিশ্চিত হলাম, এ গাছটাই মেন্দাগাছ; ঢাকার প্রাকৃত তরু। শালবনে শালগাছের সহযোগী এক বৃক্ষ। মনে পড়ছে, টাঙ্গাইলের সখীপুরে এক শালবনে এ গাছ অনেক দেখেছিলাম বছর দুয়েক আগে; রমনা উদ্যানের সীমানাপ্রাচীরের কোলেও আছে এ গাছ। আছে পরীবাগে রাস্তার ধারে, বেইলি রোডে যাওয়ার পথে। ঢাকায় কোথায় নেই এ গাছ! ভাওয়াল ও মধুপুর গড় এলাকায় এ গাছ সহজে দেখা যায়। শুধু এ দেশেই না; মেন্দাগাছ আছে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাতেও। সিকিমে এ গাছ প্রচুর দেখা যায়।

মেন্দাগাছের অনেক নাম– কারজুকি, কাজলী পাতা, কুকুরচিতা, খারাজোড়া, খারাজুরা, চাপাইত্তা, ফটেক্কা, পিপুলটি, পেপলটি, রতন ইত্যাদি। শিশুরা এর মটরদানার মতো ফল বাঁশের সরু চোঙার মধ্যে ঢুকিয়ে পটকা ফুটায়, ফটাস ফটাস করে আওয়াজ হয়। এ জন্য এর এক স্থানীয় নাম ফটেক্কা বা ফটাস। মেন্দাগাছের ইংরেজি নাম Soft bollygum, Bollywood, Brown beech ইত্যাদি। উদ্ভিদতাত্তিক নাম Litsea glutinosa ও পরিবার লরেসি।

চিরসবুজ মাঝারি বৃক্ষ প্রকৃতির এ গাছ ৫ থেকে ১৮ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। পাতা উজ্জ্বল সবুজ, থোকা ধরে থাকে ডালে ডালে। গাছভরে ছোট ছোট হলদে রঙের প্রচুর ফুল ফোটে। বছরে কয়েক দফায় ফুল ফোটে; গ্রীষ্মে ও বর্ষায় সাধারণত ফুল দেখা যায়। এরপর ছোট মটরদানার মতো ফল ধরে থোকায়। কাঁচা ফলের রং সবুজ; পাকলে হয় কালো। পাকা ফল পাখিরা খুব খায়।

ঢাকা শহরে পাখিদের জন্য ফল ধরা গাছের খুব অভাব। মেন্দাগাছে ধরা প্রচুর ফল পাখিদের সে অভাব খানিকটা দূর করে। এর বীজের তেল বাত রোগের কাজে লাগে। এর পাতা ও বাকল সুগন্ধযুক্ত। পাতা ও বাকল পেটের পীড়া নিরাময় করে, বিশেষ করে পল্লি অঞ্চলে এর পাতা ও ছাল পানিতে চটকে তা শরবতের মতো খাওয়া হয়। এমনকি সর্দি-জ্বর বা গরম-ঠান্ডা লাগায় এ শরবত খেলে তা দূর হয়। তাতে ডায়রিয়া ও আমাশয় থাকলে সেরে যায়। বাকলের ক্বাথ দিয়ে ভাঙা হাড়ের চারপাশে প্রলেপ দিলে উপকার পাওয়া যায়। গরম লাগলে এর পাতা পানিতে ডলে লাল রঙের সে রস মাথায় মাখলে গরম কেটে যায়। এর কাঠ দিয়ে দারুভাস্কর্য তৈরি করা যায়। সুলভ এ গাছটি নগরপথের দুপাশে খুব ভালো ছায়াতরু হিসেবে লাগানোর পরিকল্পনা করা যেতে পারে। ভেষজ বিজ্ঞানীরা এর চিকিৎসা পদ্ধতি, প্রাণ-রাসায়নিক উপাদান ও ভেষজ গুণ নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করতে পারেন।

আরও পড়ুন

×