ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

নিচতলা-প্রথম তলার দ্বন্দ্বে ‘জীবিত’ হলেন মৃত ব্যক্তি

নিচতলা-প্রথম তলার দ্বন্দ্বে ‘জীবিত’ হলেন মৃত ব্যক্তি
×

ছবি-সংগৃহীত

ইন্দ্রজিৎ সরকার

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৭:৪০ | আপডেট: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৭:৫৬

রাজধানীর মিরপুরের একটি আটতলা বাণিজ্যিক ভবনের মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দু’পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছে। এর মধ্যে মূল সমস্যা বেধেছে ভবনের প্রথম তলা নির্ধারণ নিয়ে। ক্রেতার দাবি, নিচতলাই হচ্ছে প্রথম তলা। অন্যদিকে বিক্রেতাপক্ষের ভাষ্য, গ্রাউন্ড ফ্লোর বা নিচতলার ওপরের তলা হলো প্রথম তলা। এ নিয়ে জল ঘোলা হয়েছে অনেক। পরে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ (এনএইচএ) তদন্ত করে বিক্রেতার পক্ষেই মত দেয়। তখন ভবনের মৃত মালিককে ‘জীবিত’ দেখিয়ে জাল ঘোষণাপত্র দলিল তৈরি করে ক্রেতাপক্ষ। সেটিও তদন্তে প্রমাণ হয়। এরপরও গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ নিচতলা বিক্রি ও নামজারির অনুমোদন দেওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ফয়েজ আহমেদ নামের এক ব্যক্তি ১৯৮৪ সালে এনএইচএর মিরপুর হাউজিং এস্টেটের সোয়া চার কাঠার প্লট বরাদ্দ নিয়ে আটতলা ভবন নির্মাণ করেন। ভবনটি মিরপুর-১ নম্বর সেকশনের বি-ব্লকের ৬/এ নম্বর প্লটে। ২০১২ সালের ১০ অক্টোবর ফয়েজ ভবনের প্রথম থেকে চতুর্থ তলা শেখ আবদুস সালাম, শেখ আবদুস শামীম ও শেখ বুলবুল আহমেদের কাছে বিক্রির জন্য গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেন। এরপর ১৫ অক্টোবর তৃতীয় ও চতুর্থ তলার রেজিস্ট্রি হয়। কিন্তু পরের বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর আবদুস সালাম প্রথম ও দ্বিতীয় তলার বদলে নিচতলা ও দ্বিতীয় তলা রেজিস্ট্রি করে নেন। 

এ নিয়ে জটিলতা নিরসনের জন্য গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ ২০১৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি এক চিঠিতে আবদুস সালামদের কাছে মূল মালিকের ঘোষণাপত্র দলিল চায়। এর আড়াই মাস আগেই ভবন মালিক ফয়েজ আহমেদের মৃত্যু হয়। পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের রেকর্ড অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। কিন্তু ২০১৪ সালের মার্চে তাঁকে জীবিত দেখিয়ে তৈরি করা জাল ঘোষণাপত্র দলিল (নম্বর ২৯০৩) গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে জমা দেওয়া হয়। মৃতের ছেলে তানভীর ফয়েজ অঞ্জন বিষয়টি জানার পর মামলা করেন এবং গৃহায়ন কর্তৃপক্ষকে নামজারির অনুমোদন না দেওয়ার অনুরোধ জানান। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ২০১৬ সালের ১৪ আগস্ট গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে। ডিসেম্বরে দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রথম তলা ও নিচতলাকে এক করে দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে নিচতলা হচ্ছে গ্রাউন্ড ফ্লোর এবং তার ওপরের তলাই প্রথম তলা। 

গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

২০১৬ সালের ২৮ এপ্রিল গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের উপপরিচালক নুরুল ইসলাম আদালতের স্থগিতাদেশ সত্ত্বেও আবদুস সালামকে নামজারির অনুমোদন দেন। এ নিয়ে বিরোধ চলমান থাকার একপর্যায়ে ২০২২ সালের ১৮ জুলাই সাব-রেজিস্ট্রার নুরুল আমিন এনএইচএকে জানান, সংশ্লিষ্ট দলিলটি জাল।

এরপর আদালত ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে চার দফায় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষকে জমির কাগজপত্র আদালতে উপস্থাপনের নির্দেশ দেয়। কিন্তু গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ তা করেনি। বরং ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট গৃহায়নের আইন কর্মকর্তা ‘বিক্রিতে আইনগত বাধা নেই’ বলে মত দিলে আবদুস সালাম সম্পত্তির একটি অংশ মোহাম্মদ আরিফ হোসেনের কাছে বিক্রি করেন। যদিও গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্যানেল আইনজীবীরা ‘বিক্রয় অনুমতি ও নামজারি করা সমীচীন নয়’ বলে মতামত দিয়েছিলেন। পরে গত বছরের ১০ অক্টোবর এনএইচএ উভয় পক্ষের শুনানি শেষে সম্পত্তি বিক্রি ও মিউটেশনের অনুমোদন বাতিল করে। 

ভবনটির মালিক প্রয়াত ফয়েজ আহমেদের ছেলে তানভীর ফয়েজ কানাডা প্রবাসী। তিনি জমির মামলাসংক্রান্ত বিষয় পরিচালনার জন্য নিচতলার একটি দোকানের মালিক মাহবুবুর রহমানকে ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ দিয়েছেন। 

মাহবুবুর  সমকালকে বলেন, আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও গত ১২ জুলাই গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ নিচতলার দোকান উচ্ছেদের জন্য অভিযানের নির্দেশ দেয়। অবশ্য পরে আদালত উচ্ছেদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন, যা এখনও বহাল।

সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন

জানতে চাইলে শেখ আবদুস সালাম বলেন, পুরোনো ভবনে গ্রাউন্ড ফ্লোর বলতে নিচতলাই বোঝায়। তাই প্রথম তলা ও নিচতলা একই। আর আমরা কোনো জাল দলিল করিনি। আমরা ফয়েজ আহমেদের কাছ থেকে কিনেছি। তাঁর ছেলে কী বললেন তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না। 

এনএইচএর সচিব মনদীপ ঘরাই বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়েই উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তখন আদালতের নিষেধাজ্ঞা ছিল না। পরে আইন কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিকভাবে দেওয়া সাত দিনের নিষেধাজ্ঞা এখনও বহাল। তাই আমরা আর কোনো উদ্যোগ নিইনি। তবে জাল দলিল ও মামলাসংক্রান্ত বিষয়ে ভূমি ও সম্পত্তি শাখা ভালো বলতে পারবে।

ভূমি ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা শাখার উপপরিচালক সেলিম শাহনেওয়াজ বলেন, আইন কর্মকর্তার মতামতের ভিত্তিতেই সব কার্যক্রম পরিচালনা হয়েছে। 
তাদের বক্তব্যের বিষয়ে জানতে এনএইচএর আইন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি জানান, ছুটিতে থাকায় সংশ্লিষ্ট নথিপত্র না দেখে মন্তব্য করতে পারছেন না।

আরও পড়ুন

×