ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জোট শরিকদের একই প্রতীকে নির্বাচনের সুযোগ নিয়ে বিতর্ক

জোট শরিকদের একই প্রতীকে নির্বাচনের সুযোগ নিয়ে বিতর্ক
×

প্রতীকী ছবি

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৫ | ১৩:৫৫ | আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০২৫ | ১৪:০৪

জোটের শরিক দলের প্রার্থীকে একই প্রতীকে নির্বাচনের সুযোগ দিতে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) পুনরায় সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এতে চটেছে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপির সঙ্গে গোপন আঁতাতের অভিযোগ তুলেছে দল দুটি। 

এনসিপির পক্ষ থেকে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে ‘নিরপেক্ষতা’ ভঙ্গের অভিযোগ এনে তাঁর কাছেই চিঠি পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি দলটির পক্ষ থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনকেও চিঠি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গতকাল সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলন ডেকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে জামায়াত। 

গত ২৩ অক্টোবর উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে বড় পরিবর্তন এনে আরপিও সংশোধনে নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় উপদেষ্টা পরিষদ। এতে জোটভুক্ত হলেও প্রার্থীকে নিজ নিজ দলের প্রতীকে ভোট করার বিধান যুক্ত করা হয়। ভোটের সময় অনেকে জোটভুক্ত হলে জনপ্রিয় বা বড় দলের মার্কায় ভোট করতেন। সেই সুযোগ বন্ধ করা হয় আরপিও (২০ ধারা) সংশোধনের মাধ্যমে। সরকার গঠিত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশ আমলে নিয়ে এই সুযোগ বন্ধের প্রস্তাব করা হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে পাঠানো প্রস্তাবে এই সুপারিশ অপরিবর্তিত রাখা হয়।

কিন্তু উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অনুমোদনের পর গেজেট প্রকাশের আগেই সংশোধনী বাতিল ও আগের বিধান বহাল রাখার দাবি জানিয়ে গত ২৯ অক্টোবর আইন উপদেষ্টাকে চিঠি দেয় বিএনপি। একই দাবিতে ২৭ অক্টোবর নির্বাচন কমিশনকেও চিঠি দেয় তারা। জোটবদ্ধ দলগুলোর ক্ষেত্রে ইচ্ছামতো জোটের প্রতীকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ চায় দলটি। 

বিএনপির দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত শনিবার রাতে উপদেষ্টা পরিষদের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ২৩ অক্টোবরের সিদ্ধান্ত পাল্টে বিএনপির দাবির বিষয়টি নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়। আজ উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ বৈঠকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।  

উপদেষ্টা পরিষদের আলোচনার খবর বের হলে গতকাল রোববার জামায়াতের পক্ষ থেকে দলীয় বিবৃতিতে বলা হয়, আরপিওর এই বিধান বাতিল করে সরকার একটি দলের সঙ্গে গোপন সমঝোতা করলে সেটাতে ন্যক্কারজনকভাবে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ভঙ্গ হতে পারে। 

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বিবৃতিতে বলেন, বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, বিএনপির একজন নেতার সঙ্গে জনৈক উপদেষ্টার তথাকথিত ‘জেন্টলম্যান অ্যাগ্রিমেন্ট’-এর পরিপ্রেক্ষিতে নিজেদের অনুমোদিত সেই আদেশ বাতিল হতে যাচ্ছে।  

বিবৃতিতে বলা হয়, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও উপদেষ্টা পরিষদ অনুমোদিত আরপিও বাতিল করা হলে, তা হবে অত্যন্ত ন্যক্কারজনক, অগণতান্ত্রিক ও স্পষ্টতই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বিএনপির এক নেতার কথিত ‘জেন্টলম্যান অ্যাগ্রিমেন্ট’-এর নামে উপদেষ্টা পরিষদের সভায় এটি বাতিল হলে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে জাতির সামনে একটি বড় প্রশ্নের জন্ম দেবে। 

গোলাম পরওয়ার বলেন, জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এবং সব দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও উপদেষ্টা পরিষদ অনুমোদিত আরপিও সংশোধনী বহাল রাখার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।

আসিফ নজরুলকে এনসিপির চিঠি

আরপিও সংশোধনে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে বিএনপিকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ তোলার পাশাপাশি এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চেয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে এনসিপি। একই দিন সংশোধিত আরপিও অধ্যাদেশ বহাল রাখার দাবি জানিয়ে সিইসির কাছে আবেদন করেছে দলটি।

আইন উপদেষ্টার কাছে লেখা এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেনের সই করা চিঠিতে বলা হয়, আরপিও সংশোধন-সংক্রান্ত আলোচনায় বিএনপির দাবির পক্ষে আসিফ নজরুলের ব্যক্তিগতভাবে অবস্থান নেওয়ায় এনসিপি উদ্বিগ্ন। বিএনপিকে দেওয়া আইন উপদেষ্টার ব্যক্তিগত আশ্বাস ও অবস্থান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

চিঠিতে উপদেষ্টার নিরপেক্ষতাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলা হয়, ‘আপনি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি নন। নির্বাচনী আইন সংশোধনের মতো বিষয়ে কোনো একটি রাজনৈতিক দলকে এককভাবে আশ্বাস প্রদান করা জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পদের নিরপেক্ষতা ও দায়বদ্ধতার পরিপন্থি।’

সংশোধনীর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে আখতার বলেন, যখন একাধিক নিবন্ধিত দল বড় দলের প্রতীকে নির্বাচন করে, তখন ভোটার জানেন না, তিনি আসলে কাকে ভোট দিচ্ছেন। ভোটার যে রাজনৈতিক দর্শন, নীতি বা নেতৃত্বকে সমর্থন জানাতে চান, তা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। ফলে ভোটার-দায়বদ্ধতার সম্পর্ক ভেঙে যায়।

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন ও নির্বাচন কমিশনের অবস্থানের সঙ্গে একমত পোষণ করে এনসিপির ওই চিঠিতে বলা হয়, এমন সংশোধন রাজনৈতিক বহুত্ববাদকে সংকুচিত করবে না। বরং প্রকৃত গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদকে শক্তিশালী করবে। কারণ, এতে প্রতিটি দলকে নিজের নাম, নীতি ও নেতৃত্বের দায় নিজেকেই নিতে হবে। এটি ভোটারের অধিকার, রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতা এবং সাংবিধানিক ভারসাম্য রক্ষার অন্যতম শর্ত। চিঠিতে দলটির সদস্য সচিব এই দুটি বিষয়ে সরকারকে অবস্থান স্পষ্ট করার অনুরোধ জানান। 

এদিকে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সই করা পৃথক চিঠিতে সিইসির কাছে  দাবি জানানো হয়, ‘জোটে ভোট করলেও নিজ দলের প্রতীকে নির্বাচন করতে হবে’ এমন বিধান বহাল রাখতে হবে। গেজেট প্রকাশ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে রাজনৈতিক চাপে এখন সরকার বা ইসির সরে আসার সিদ্ধান্ত পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর আঘাত দেওয়া হবে। এতে নির্বাচন আয়োজনকারী সংস্থাটির ‘নিরপেক্ষতা, সক্ষমতা’ এবং সামগ্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়ার ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ সম্পর্কে জনগণের সন্দেহ পাকাপোক্ত হবে। 

ইসি সচিবের বক্তব্য

বিএনপির চাপে আরপিওতে পুনরায় সংশোধনী বাতিল হবে কিনা– এমন প্রশ্নে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, বিষয়টি সম্পূর্ণ সরকারের আইন মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ার। কোন কোন সংশোধনী রাখা হবে, কোনটা বাতিল হবে– এর জবাব তারাই দিতে পারবে। আর অধ্যাদেশ জারির পরই এ বিষয়ে ইসি বিস্তারিত জানতে পারবে।

আরও পড়ুন

×