দেশে কিশোর-কিশোরীর মধ্যে স্বউদ্যোগ বাল্যবিয়ে বাড়ছে
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৪৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের বিভিন্ন শহর ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে কিশোর-কিশোরীর মধ্যে বাল্যবিয়ের হার ক্রমেই বাড়ছে। নতুন বাস্তবতায় প্রায়ই এসব বিয়ে ঘটছে নিজ উদ্যোগে। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকা, সীমান্তবর্তী অঞ্চল, দুর্গম এলাকা ও শহুরে বস্তি থেকে সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, কিশোরীদের মধ্যে নিজেরাই বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এ অঞ্চলগুলোর মধ্যে রয়েছে রংপুর ও বরিশাল। এসব এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ ও দুর্বল অবকাঠামো মেয়েদের দ্রুত বাল্যবিয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। ‘বিটুইন চয়েস অ্যান্ড কনস্ট্রেইন্ট: এক্সামিনিং ইনস্টিটিউশনাল গ্যাপস অ্যান্ড এমার্জিং ট্রেন্ডস রিলেটেড টু চাইল্ড ম্যারিজ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক ওই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানীর ধোলপুর এলাকায় মেয়েদের ৩২ শতাংশ এবং ছেলেদের ১১ শতাংশ বিয়ে নিজেদের উদ্যোগেই হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিয়ের প্রস্তাব আসে ছেলেদের পক্ষ থেকে। নতুন বিয়ের এক বছরের মধ্যে প্রায় অর্ধেক মেয়েই অন্তঃসত্ত্বা হয়ে যায়। ফলে প্রসবজনিত জটিলতা ও নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষা ও অবকাঠামোর অভাবও বাল্যবিয়ের বড় কারণ। দোয়ারাবাজার ও উলিপুরের একাধিক ইউনিয়নে উচ্চ বিদ্যালয় নেই। মেয়েরা প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করার পরই স্কুল ছাড়ে। কারণ, বাবা-মা তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার প্রতি উৎসাহ দেন না। শহরাঞ্চলে ডিজিটাল মাধ্যমে অশালীন কনটেন্ট ও যৌন বিষয় সম্পর্কে আগাম পরিচিতি ও সমাজের নীরবতা কিশোরীদের নিজ উদ্যোগে বিয়ে করার প্রবণতা বাড়াচ্ছে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের এ গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, ইউনিসেফ, একাডেমিয়া, নাগরিক সমাজ এবং তরুণ সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা বোস বলেন, ‘শিশু সুরক্ষার কাজ করতে গিয়ে আমরা লক্ষ্য করেছি, মেয়েশিশুরা তুলনামূলকভাবে বেশি বঞ্চিত ও সহিংসতার শিকার হয়। সেই উপলব্ধি থেকেই আমরা মেয়েশিশুদের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। জেন্ডার সমতার পৃথিবী গড়তে হলে মেয়েদের শিক্ষিত, নেতৃত্বদক্ষ ও সিদ্ধান্তগ্রহণে সক্ষম হতে হবে।’
উচ্চ পর্যায়ের প্যানেল আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা আইন প্রয়োগ, সামাজিক কাঠামো, ধর্মীয় নেতৃত্ব ও তরুণদের সক্রিয় ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তসলিমা ইয়াসমিন বলেন, ‘যখন কিশোর-কিশোরী নিজেরাই বিয়ে নির্ধারণ করে, তখন আইনের প্রয়োগ জটিল হয়ে যায়। শাস্তিমূলক ব্যবস্থায় শিশুদের অধিকার লঙ্ঘন না করার নিশ্চয়তা দিতে হবে।’
ডিএমপি যুগ্ম পুলিশ কমিশনার ফারুক হোসেন বলেন, ‘বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন, পরিবার ও সমাজের মধ্যে নিবিড় সমন্বয় জরুরি।’ তরুণ প্রতিনিধি শিরিন আখতার আশা বলেন, ‘তরুণরা যদি সচেতন হয়, তবে তারাই সমাজে পরিবর্তনের চালিকা শক্তি হতে পারে।’
প্রতিবেদনের সুপারিশগুলোর মধ্যে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে চাইল্ড ম্যারিজ প্রিভেনশন কমিটির (সিএমপিসি) কার্যকারিতা বৃদ্ধি, ১৮ বছর বয়সের আইনি সীমার স্বাস্থ্যগত যুক্তি জনসচেতনতায় তুলে ধরা, অভিভাবক-সন্তানের মধ্যে ইতিবাচক যোগাযোগ বাড়াতে প্যারেন্টিং প্রোগ্রাম চালু, ডিজিটাল বিয়ে নিবন্ধন ব্যবস্থা, প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সভায় বক্তারা বলেন, সরকারি সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী এবং কমিউনিটির যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব, যেখানে প্রতিটি মেয়ে শিক্ষা, নেতৃত্ব ও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার পাবে–বাল্যবিয়ে ও লিঙ্গবৈষম্যমুক্ত সমাজে।
- বিষয় :
- বাল্যবিয়ে
