পুষ্পকথা
অন্য এক আমাজন লিলি
সিংগাইর উপজেলার পারিল গ্রামে জহির মঞ্জিলে দেখা আমাজন লিলি লেখক
মৃত্যুঞ্জয় রায়
প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:৫৬ | আপডেট: ১৯ নভেম্বর ২০২৫ | ০৮:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
উনিশ শতকের ত্রিশ দশকের গোড়ার দিকে ডা. ডেইন টাসকার আমাজন লিলির একটা ছবি তোলেন। তিনি ছিলেন পেশায় চিকিৎসক। যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের উইলশায়ার হাসপাতালের রেডিওলজিস্ট হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর প্রধান কাজ ছিল এক্স-রে করা ও দেখা। সেই এক্স-রে করাকেই তিনি শিল্পে পরিণত করলেন। তাঁর আলোকচিত্রের কৌশল ছিল অদ্ভুত। মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের পরিবর্তে তিনি ফুলের ছবি তোলার ক্ষেত্রে এক্স-রে পদ্ধতি প্রয়োগ করেন। তিনি ভেবেছিলেন, এটিও আলোকচিত্রের একটি মাধ্যম ও কার্যকরী কৌশল, যে কৌশলে ফুলের ইন্দ্রিয়গত অভ্যন্তরীণ গঠনগুলো পরিষ্কার বোঝা যায়, যা কখনও সাধারণ আলোকচিত্রে দেখা সম্ভব নয়। ফুলের অভ্যন্তরীণ অঙ্গাণু থেকে শুরু করে তার শৈল্পিক কোষসজ্জা, মসৃণ ও স্বচ্ছ অবয়ব– সবকিছুই যেন আলাদা নান্দনিকতা, সৌন্দর্যের এক অদেখা ভুবন।
ডা. ডেইনের সেই ফুলটি এ দেশে দেখে খুব অবাক হলাম। হেমন্তের ভোরের কুয়াশা তখনও নামেনি, তবে আকাশটা ঝকঝকে পরিষ্কার, নীল। মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার পারিল নওয়াধা গ্রামে বিখ্যাত আলোকচিত্রী ও কৃষিবিজ্ঞানী ড. নওয়াজেশ আহমদের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে অন্দরমহলে পেলাম দুটি পুরোনো জিনিস– একটা হলো ১৯৩৩ সালে তৈরি করা সচল পাতকুয়া, অন্যটি কাঠের ঢেঁকি। এ দুটির মাঝে গাছগাছালির ছায়াময় একটি স্থানে টবে তেজিয়ে বেড়ে উঠেছে কয়েকটা গাছ। হলুদগাছের পাতার মতো পাতা, কিন্তু পাতাগুলো খাটো ও চওড়া, অগ্রভাগ সূচাল, পাতার মধ্যশিরা গভীরভাবে রয়েছে, রং চকচকে সবুজ। পাতাগুলোর মাঝখান থেকে একটা লম্বা ডাঁটির মাথায় তিনটি ফুল ফুটে আছে তারার মতো। আহা কী শুভ্র ও মিষ্টি সৌরভ তার!
প্রথম দেখে ভেবেছিলাম ড্যাফোডিল ফুল। ভালো করে দেখার পর শনাক্ত করতে গিয়ে সে ভুল ভাঙল। ফুলের সঙ্গে ড্যাফোডিলের কিছুটা মিল থাকলেও তা ড্যাফোডিল না, আমাজন লিলি। সেখানেও আর একটা খটকা। কেননা, আমাজন লিলি নামে আমরা চিনি ভিক্টোরিয়া আমাজোনিকাকে, যেটি বলধা গার্ডেন ও জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে আছে। তাই এ নামে আরেকটা উদ্ভিদের নামের সঙ্গে তা তালগোল পাকিয়ে দিল। আন্তর্জালে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ১৮৫৫ সালে মারিয়াস পোর্টে ইউরোপে এ গাছ নিয়ে আসেন। তিনি এ গাছ আবিষ্কার করেছিলেন ময়োম্বার কাছে আমাজন নদীতীরে। সে কারণেই এর ইংরেজি নামকরণ করা হয়েছে আমাজন লিলি।
এ গাছের ইংরেজি নাম কন্দজ বা লিলি জাতীয় বিরুৎ শ্রেণির বহুবর্ষজীবী চিরসবুজ উদ্ভিদ। আমারিলিডেসি গোত্রের এ গাছের উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Urceolina amazonica (পূর্বে নাম ছিল Eucharis amazonica)। গাছের উচ্চতা প্রায় ৭৫ সেন্টিমিটার, পাতাগুলো গোড়ার কন্দ বা মোথা থেকে গজায় ও চারপাশে প্রায় ৬০ সেন্টিমিটার জায়গাজুড়ে ছড়িয়ে ঝাড় তৈরি করে। টবে কন্দ বা মোথা লাগিয়ে এ গাছ তৈরি করা যায়। আর্দ্র ও ছায়া জায়গায় গাছ ভালো হয়। সুদর্শন তরু হিসেবে কোনো কোনো বাগানে ও বাড়িতে লাগানো হয়। অন্দর বাগানের জন্যও উপযুক্ত। তবে এ গাছ এ দেশে খুব একটা চোখে পড়ে না।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ
