অভিমত
বিচারের পাশাপাশি দরকার জাতীয় রিকনসিলিয়েশন
মনে হচ্ছে, বাংলাদেশ অতীতের সে-ই প্রতিশোধ ও দায় এড়ানোর সংস্কৃতিতেই পড়ে থাকবে
আলতাফ পারভেজ
আলতাফ পারভেজ
প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০২৫ | ০৮:০৭ | আপডেট: ১৯ নভেম্বর ২০২৫ | ০৮:২৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বা আইসিটিতে শেখ হাসিনাসহ তিনজনের মামলার রায় এবং দেশের একাধিক বন্দরের টার্মিনাল বিদেশিদের ইজারা দেওয়া হলো একই দিনে। দুটিই রাজনৈতিক-অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তবে আপাতত চারদিকে আলোচনা-পর্যালোচনা চলছে প্রথমটা নিয়ে।
দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বন্দরগুলো এখন কেবল অর্থনীতিকেন্দ্রিক বিষয় হিসেবে নেই, ভূরাজনৈতিক এবং সামরিক কৌশলগত বিষয়ও বটে। ফলে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার যে বন্দরগুলোর ব্যবস্থাপনা বিদেশি সংস্থাকে ইজারা দিচ্ছে এবং নাগরিক অধিকার আন্দোলনকর্মীদের তুমুল দাবি সত্ত্বেও ইজারার শর্তাবলি যে প্রকাশ হচ্ছে না, সেটা ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মনোযোগ পেয়েছে। তবে নিঃসন্দেহে শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় বেশি মনোযোগ পেয়েছে বিশ্বজুড়ে।
যদিও শেখ হাসিনা বাংলাদেশে নেই, ফলে ফাঁসি কার্যকরের আপাতত কোনো সম্ভাবনাও নেই; কিন্তু এই রায়ের মাধ্যমে অনেক প্রশ্ন সামনে চলে আসবে। প্রথমত, সাবেক প্রধানমন্ত্রী যে দলের সভাপতি, সেই কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত দল এখন কী করবে? তাদের ভবিষ্যৎ কী? তারা আসন্ন নির্বাচন প্রশ্নে কী ভূমিকা নেবে?
দ্বিতীয়ত, শেখ হাসিনা ও তাঁর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রদত্ত রায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বা প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে কোনো পরিবর্তন আনবে কিনা? আগামীতে এ দেশে ক্ষমতাসীনদের স্বৈরাচারী-ফ্যাসিবাদী হওয়া ঠেকাতে এই রায় ইতিবাচক নজির হিসেবে ভূমিকা রাখবে কিনা?
এ রকম প্রশ্নগুলোর পাশাপাশি আলোচ্য মামলার আইনি প্রক্রিয়াগত বিষয় নিয়েও অনেক মূল্যায়ন ও পর্যালোচনা হচ্ছে এবং আরও হবে। বাংলাদেশের চাওয়া অনুযায়ী শেখ হাসিনাকে ফেরত আনার ক্ষেত্রে ভারতের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়েও অনেক অনুমান শুরু হয়েছে। সব মিলে হাসিনা ও তাঁর দল নিষিদ্ধ অবস্থাতেও আসন্ন দিনগুলোতে দেশের রাজনৈতিক সমাজে প্রবল আলোচ্য বিষয় হয়ে থাকবেন বলে ধারণা করা যায়।
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। আইসিটিতেও আরও অনেক মামলায় তিনি অন্তর্ভুক্ত আছেন। ক্রমে নিশ্চয়ই সেসব মামলারও চার্জশিট, শুনানি ও রায় হবে। সেসব রায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গেলে, প্রথম মামলার রায়ের মতো তাঁর দল হয়তো মেঠো রাজনৈতিক কর্মসূচি দিতে পারে এবং তাতে সমাজে ভীতি ও সহিংসতার শঙ্কা অমূলক নয়। সংগত কারণেই প্রশ্ন ওঠে, রাজনৈতিক এ অবস্থায় বাংলাদেশ কোথা থেকে কোথায় পৌঁছাবে?
শেখ হাসিনার দল যে ইতোমধ্যে তাদের দলনেত্রীর বিরুদ্ধে দেওয়া রায় মেনে নেয়নি, সেটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিবেচনায় অপ্রত্যাশিত নয়। কিন্তু এটা তো অসত্য নয়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে দুই-তিন সপ্তাহের ভেতর শত শত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড হয়েছে। এসব মৃত্যুর জন্য তখনকার সরকার ও সরকার পরিচালনাকারী দলকে জবাবদিহি না করে উপায় নেই। কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের কাছ থেকে অনুশোচনা বা স্বীকারোক্তিমূলক কিছু পাওয়া যায়নি। এ থেকে মনে হচ্ছে, তারা ভবিষ্যৎ দিনগুলোতে নিজেদের নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত অন্যান্য মামলার বিষয়ে অভিন্ন অবস্থান বজায় রাখবে। এটা কার্যত বাংলাদেশের অতীত রাজনৈতিক সংস্কৃতির মতোই।
১৯৭১ থেকে ৫৪ বছর ধরে এখানে বিপুল রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ হওয়ার অভিযোগ থাকলেও তার বিচার-আচার হয়েছে সামান্য। তার চেয়েও কম হয়েছে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর দায় স্বীকার। বরং রাজনৈতিক দলগুলো এ রকম বিচারের উদ্যোগকে তাদের প্রতি অবিচার হিসেবে দেখেছে এবং এক ধরনের প্রতিশোধ স্পৃহা নিয়ে মাঠে উপস্থিত থেকেছে।
ফলে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশ অতীতের সে-ই প্রতিশোধ ও দায় এড়ানোর সংস্কৃতিতেই পড়ে থাকবে যেখানে কোনো দল নিজেদের অপকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয় না। এ রকম অবস্থা সহিংসতার শঙ্কার পাশাপাশির রাজনীতির চোরা স্রোত তৈরি করে সমাজে, যা সর্বত্র অর্থনৈতিক জীবনকে স্থায়ী ঝুঁকিতে রাখে।
এ রকম সহিংসতা যে বহুমুখী, সেটা শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পরপর একদল মানুষের বুলডোজার নিয়ে নেমে পড়া দেখেও আঁচ করা যায়। ভবিষ্যতের বাংলাদেশের এ রকম বাস্তবতা বিগত বছরের গণঅভ্যুত্থানের পরও অনুমান করা হচ্ছিল এবং তখন ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন বা জাতীয় পুনর্মিলন উদ্যোগের অংশ হিসেবে একটা ট্রুথ কমিশন গঠনের আলাপ উঠেছিল। কিন্তু সেদিকে আর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। কীভাবে অতীত রাজনৈতিক অপরাধের বিচার অব্যাহত রাখা যায় এবং একই সঙ্গে সব মত ও পথের মাঝে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সহাবস্থানের সংস্কৃতি রক্ষা করা যায়, সেই দিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন আবারও।
এটা না হলে নির্বাচন হলেও সেটা প্রকৃত প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে না এবং বাংলাদেশের সমাজ পারস্পরিক ভেদাভেদে ভেতর থেকে দুর্বল হতে থাকে, যা এই দেশের ওপর বিদেশিদের কর্তৃত্ব করতে ও নাক গলাতে সুবিধা করে দেবে।
এ প্রসঙ্গে এ-ও বলতে হয়, বিগত সব আমলের মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং অন্য সব অপরাধের বিচার যেমন জরুরি, তেমনি এ-ও মনে রাখতে হবে, এসব বিচারই কেবল ভবিষ্যতে অনুরূপ দুর্নীতি ও অপরাধ কমাতে পারবে না, যদি না সে-ই ব্যবস্থাটার সংস্কার করা হয়, যে ব্যবস্থা শাসক-প্রশাসকদের স্বৈরাচারী করে তোলে, ফ্যাসিবাদীতে পরিণত করে। গত ১৫ মাসে বাংলাদেশ প্রশাসন ও পুলিশ ব্যবস্থার ঔপনিবেশিক সেসব ধরন কতটা বদলাতে পারল, সেটা নিয়ে এখনই ভাবা দরকার।
আলতাফ পারভেজ: রাজনৈতিক বিশ্লেষক
