ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা
চেয়ারগুলো নড়ছিল, মনে হচ্ছিল আজই সব শেষ
ভূমিকম্পের পর সড়কে আতঙ্কিত মানুষের ভিড়। ছবি: বাসস-এর সৌজন্যে
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২৫ | ১৮:২৩ | আপডেট: ২১ নভেম্বর ২০২৫ | ১৯:০২
শুক্রবার সকাল প্রায় সাড়ে দশটা। রাজধানীর হাতিরঝিলের মহানগর আবাসিক এলাকার শতাধিক ভবন থেকে বেরিয়ে আসা মানুষের ভিড় সড়কে। চোখে মুখে কয়েক মুহূর্ত আগের তীব্র কম্পনের আতঙ্ক ও পরাঘাতের শঙ্কা।
সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় এলাকাটির বেশিরভাগ বাসিন্দাই নিজ বাসায় ছিলেন। ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর সড়কে দাঁড়িয়ে থেকেই মোবাইল ফোনে অনেকে খোঁজ নিচ্ছিলেন নিকটআত্মীয়দের। আর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে পোস্ট দিয়ে কেউ কেউ জানাচ্ছিলেন ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল রাজধানী ঢাকার একেবারে কাছে- নরসিংদীর মাধবদীতে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে একটি ভূমিকম্পের উত্তপত্তিস্থল ছিল নরসিংদী। উপকেন্দ্র ছিল ঘোড়াশাল এলাকায়। শুক্রবার রাজধানীবাসী যে অভিজ্ঞতার সাক্ষী হলেন, এমন দৃশ্য দেখা গিয়েছিল ২০১৫ সালেও।
বিবিসির সে সময়কার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১২ মে দুপুর একটার দিকে অন্তত দুই দফায় ভূকম্পন অনুভূত হয়েছিল। উঁচু ভবনগুলো থেকে নেমে অসংখ্য মানুষ সড়কে অবস্থান নিয়েছিলেন। একই বছরের এপ্রিলে নেপালে ভয়াবহ ভূমিকম্পে প্রাণ হারান ৮ হাজারের বেশি মানুষ।
‘মনে হচ্ছিল আজই সব শেষ’
রাজধানীর তেজকুনিপাড়ার বাসিন্দা সোহেল দেওয়ান। ভূমিকম্পের প্রায় আধাঘণ্টা আগেই তাঁর ঘুম ভেঙেছিল। বাসার ড্রয়িং রুমে যখন শুয়েছিলেন পাশেই খেলছিল দুই বছরের ছেলে।
সোহেল বলেন, হঠাৎ ভবন ভীষণ নড়ে উঠল। নয়তলা ভবনের দোতলায় ছিলাম। এতটাই নড়ছিল যে, মনে হচ্ছিল এই বুঝি সব ভেঙে পড়বে। ছেলে ও অন্য স্বজনদের নিয়ে বাসার নিচে গিয়ে দেখি আশপাশের ভবনের বাসিন্দারা ঘরে যে অবস্থায় ছিলেন সেভাবেই নিচে নেমে এসেছেন। পাশের একটি ভবনে দেয়ালের ফাটলও পরখ করে দেখছিলেন কেউ কেউ।
_1763727687.jpg)
তেজকুনিপাড়া থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে তেজগাঁও শিল্প এলাকার একটি অফিসে দায়িত্ব পালন করছিলেন দেলোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, হঠাৎ করেই ঝাঁকুনিতে চতুর্থ তলার ঝুলন্ত বাতি, চাকাযুক্ত চেয়ারগুলো নড়তে শুরু করে। দৃশ্যটি ছিল খুবই ভয়াবহ। আমি কান্না করছিলাম, মনে হচ্ছিল আজই সব শেষ হয়ে যাবে।
‘ভেসে আসছিল নারী-শিশুর চিৎকার’
রাজধানীর কুড়িলের বাসিন্দা আবদুস সামাদ আজাদ বলেন, দোতলায় ঘরের খাটের ওপর বসে ছিলাম। হঠাৎ, বিকট আওয়াজ শুনে লাফিয়ে উঠি। ক্ষণিকের জন্য মনে হলো কড়কড়, কটমট আওয়াজ। পুরো ভবন কাঁপছে। তবে বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। এই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মনে হচ্ছিল পুরো ভবন ধসে পড়বে।
আবদুস সামাদ বলেন, খাট থেকে ঘরের দরজা পর্যন্ত ছুটে যাওয়ার সময়ের মতো ভয়ংকর পরিস্থিতি আর ছিল না। বাইরে থেকে ভেসে আসছিল নারী-শিশুর চিৎকার। ভবনের সিঁড়ি বেয়ে খুব বেশি মানুষ নামতে পারেনি। যাদের ঘরে শিশু আছে তারাই সবচেয়ে বেশি আতঙ্কের মধ্যে ছিল।
বাসার নিচে নেমে এক দোকানির সঙ্গে আলাপ হয় আবদুস সামাদের। ভূমিকম্পের সময় ওই দোকানি রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে ছিলেন। নিজেই সড়ক থেকে ভবনগুলোর কম্পন দেখেছেন। তিনি বলেন, আগে কখনও এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখেননি।
ঢাকার কাছে ভূমিকম্প নতুন নয়
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরেই তিনবার ভূমিকম্প হয়েছিল। সে সময় এ নিয়ে করা এক প্রতিবেদনে ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হুমায়ুন আখতারের দেওয়া কিছু তথ্য ব্যবহার করে বিবিসি বাংলা। এতে বলা হয়, দেশে ১৫-২০ বছরের মধ্যে এমন কয়েকটি ভূমিকম্প হয়েছে যেগুলোর উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার আশেপাশের কয়েকটি জেলা। যেমন- নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও ময়মনসিংহ।
এর মধ্যে শক্তিশালী ভূমিকম্প হিসেবে ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে নারায়ণগঞ্জে ৫.১ মাত্রার একটি ভূমিকম্পের কথা বলে থাকেন গবেষকরা। এছাড়া ফরিদপুর থেকেই গত দেড় দশকের মধ্যে অন্তত দুবার ভূমিকম্পের উৎপত্তি হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
- বিষয় :
- ভূমিকম্প
- অভিজ্ঞতার আলোকে
- ঢাকা
