সমকাল এক্সপ্লেইনার
ভূমিকম্পে বড় ক্ষতি এড়ানোর উপায়, জাপান-ইন্দোনেশিয়া যা করেছে
ঢাকা শহরে কংক্রিটের ভবনের ৫৬ দশমিক ২৬ শতাংশই ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে। ছবি: সংগৃহীত/ ইলাস্ট্রেশন: সমকাল
সাদিকুর রহমান
প্রকাশ: ২৩ নভেম্বর ২০২৫ | ১৮:৪৮ | আপডেট: ২৩ নভেম্বর ২০২৫ | ২২:৩২
ভূমিকম্পের হার বিবেচনায় একেক বছর একেক দেশ শীর্ষে থাকে। যেমন গত বছর সবচেয়ে বেশি ভূমিকম্প হয় মেক্সিকোতে- ১ হাজার ৯৭১টি। দেড় হাজারের বেশি ভূমিকম্প হওয়া দেশগুলোর মধ্যে ছিল যথাক্রমে ইন্দোনেশিয়া ও জাপান।
গত বছর মেক্সিকো ও ইন্দোনেশিয়ায় ৬.৪ এবং জাপানে সর্বোচ্চ ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। চলতি বছরের ২২ নভেম্বর পর্যন্ত সবচেয়ে বড় মাত্রার তিনটি ভূমিকম্প হয়েছে রাশিয়ার কামচাটকায় (৮.৮, ৭.৮ ও ৭.৪)। একাধিকবার ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে, যুক্তরাষ্ট্র, ভেনেজুয়েলা, জাপান, আফগানিস্তান, ফিলিপাইন, চীন, ইন্দোনেশিয়া এবং বাংলাদেশের দুই প্রতিবেশী দেশ মায়ানমার ও ভারতে।
ফলে পৃথিবীর যেখানেই থাকুন না কেন, ভূমিকম্প বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি সব সময়ই থাকে। আবার ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে থাকার মানে এই নয় যে, প্রতিদিনই ভূমিকম্প হবে। তবুও প্রস্তুতি থাকা জরুরি।
ভূমিকম্পে ঢাকা শহরে ঝুঁকির বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় আছে। গত শুক্র ও শনিবারের পর যা নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। প্রস্তুতি ও সতর্কতা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। কিন্তু একদিন বা এক মাসে তো সবকিছু ভূমিকম্প সহনশীল করা সম্ভব নয়। তাহলে উপায় কী?
উদাহরণ জাপান-ইন্দোনেশিয়া
ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে জাপান ও ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকা দেশ। উন্নত প্রযুক্তি থাকায় জাপানে স্বল্প মাত্রার ভূমিকম্পও রেকর্ড হয়। আবার বাসিন্দারা সরাসরি অনুভব করতে পারে এমন মাত্রার ভূমিকম্প বেশি হয় ইন্দোনেশিয়ায়।
_1763902698.jpg)
জাপান প্যাসিফিক রিং অব ফায়ার-এ অবস্থিত। যা প্রশান্ত মহাসাগরের চারপাশের একটি অত্যন্ত ভূমিকম্প সক্রিয় অঞ্চল। এখানকার টেকটোনিক সক্রিয়তা এবং ভূমিকম্পের ঝুঁকি খুবই বেশি। অন্যদিকে, ইন্দোনেশিয়া প্রতি বছর প্রায়ই ৬.০ বা এর বেশি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এ কারণে দেশটিকে বিশ্বের বড় ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে ধরা হয়।
ক্ষতি এড়ানোর প্রথম পদক্ষেপ
কানাডার ইনস্টিটিউট ফর ক্যাটাস্ট্রফিক লস রিডাকশনের প্রধান প্রকৌশলী কিথ পোর্টার। তাঁর মতে, বড় ধরনের ভূমিকম্পের জন্য কেমন প্রস্তুতি নেওয়া উচিত তা আগে থেকে নির্ধারণ করা কঠিন। এগুলো সাধারণত অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে নেওয়া হয়।
বিষয়টি ভালোভাবে বোঝা যায় জাপানের উদাহরণ থেকে। ১৯২৩ সালে ৭.৯ মাত্রার ভূমিকম্পে দেশটিতে প্রাণ হারান ১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষ। ধ্বংস হয়েছিল হাজার হাজার ভবন। ওই ঘটনার পর দেশটির শহুরে এলাকায় নতুন ভবন নির্মাণে ভূমিকম্প সংক্রান্ত নীতিমালা চালু হয়।
পরের কয়েক দশকে এই নীতিমালায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়। ১৯৮১ সালের সংশোধনীতে শুধু নির্মাণের নির্দেশনা নয়, ভবনগুলো ভূমিকম্পের সময় কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে সেটির জন্যও মান নির্ধারণ করা হয়। প্রকৌশলী কিথ পোর্টার বলেন, দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত অখণ্ডতা নয়, এই ভবনগুলোর মূল লক্ষ্য হলো জীবন বাঁচানো।
কম্পন থেকে রক্ষা
জাপানে বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভবনগুলোকে ভূমিকম্পের মানদণ্ড পূরণে সক্ষম করা হয়। কোন পদ্ধতি ব্যবহার হবে তা নির্ভর করে ভবনের ধরনের ওপর। যেমন বহুতল বা একক পরিবারের বাড়ি।
_1763902773.jpg)
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের নিবন্ধ অনুযায়ী, প্রথম ও মৌলিক পদক্ষেপ হিসেবে ভবনগুলো যাতে কম্পন সহ্য করতে পারে সেজন্য পিলার, বিম ও প্রাচীরগুলো ঘন ও শক্তিশালী করা হয়। এরপর আসে মাটির সরাসরি কম্পন থেকে ভবনকে রক্ষার প্রযুক্তি। একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি হলো, ভবনের ভিত্তিতে রাবারের মতো পদার্থ দিয়ে প্যাড বসানো। এই প্যাড মাটির কম্পনের ধাক্কা শোষণ করে কাঠামোর ক্ষতি কমায়।
অন্য একটি পদ্ধতি হলো ‘বেস আইসোলেশন সিস্টেম’। ভবনের ভিত্তিতে রাবারের প্যাড ব্যবহারের পাশাপাশি পুরো ভবনকে একটি পুরু প্যাডের ওপরে নির্মাণ করা হয়। এটি মাটি ও ভবনের মাঝে একটি পৃথক স্তর তৈরি করে।
তবে কোনো প্রযুক্তি আসলে সম্পূর্ণরূপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। ভবনের অবস্থান অনুযায়ী বিশেষ চ্যালেঞ্জও দেখা দেয়। যেমন, লিকুইফেকশন জোন। এ ধরনের এলাকায় ভূমিকম্পের সময় মাটির ঘনত্ব কমে যায়। ফলে সেটি স্বাভাবিকভাবেই ধসে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
ইউনিভার্সিটি অব ইন্দোনেশিয়ার পুরকৌশল বিভাগের শিক্ষক নুরআজিজ হানডিকার। বিশ্ববিদ্যালয়টির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তাঁর একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে, ভূমিকম্প প্রতিরোধী ভবন নির্মাণের জন্য বেশকিছু কাজ গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, উপাদান নির্বাচন, প্রাচীরকে কলামের সঙ্গে যুক্ত করা ইত্যাদি। কলাম ও স্ল্যাব বিমের মধ্যে এংকরিং দৈর্ঘ্য তার ব্যাসার্ধের অন্তত ৪০ গুণ হতে হবে।
গ্লোবাল ফ্যাসিলিটি ফর ডিজাস্টার রিডাকশন অ্যান্ড রিকভারি (জিএফডিআরআর) এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সালের সুনামির পর ইন্দোনেশিয়া বেশ কিছু উদ্ভাবনী পদ্ধতির আশ্রয় নেয়। বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন দেশের সমর্থনে ৬৫৫ মিলিয়ন ডলারের তহবিল সংগ্রহ করে। এর আওতায় দুর্যোগ সহনশীল ২০ হাজারের বেশি নতুন বাড়ি নির্মাণ করা হয়।
বাংলাদেশের চিত্র
সম্প্রতি হওয়া ভূমিকম্প ঢাকাসহ সারাদেশের মানুষের মাঝে নতুন করে ভূমিকম্প নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বেশ কয়েক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ভূমিকম্পের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শহরের তালিকা প্রকাশ করেছিল। যাতে ঢাকার অবস্থান ছিল ২০তম।
_1763903586.jpg)
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র গত ৪৮৫ বছরের ভূমিকম্প তালিকাভুক্ত করে দেখিয়েছে- ঢাকা ও এর আশপাশে ঐতিহাসিকভাবে মাত্র ছয়টি ভূমিকম্প হলেও গত ১২ বছরে সংখ্যাটা দশে দাঁড়িয়েছে। কেন্দ্রস্থলও বদলে গেছে। আগে সিলেট, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে বেশি ছিল। এখন মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, দোহার ও নরসিংদীর দিকে সরে এসেছে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাদের তালিকা প্রকাশ করেছিল ২০১৩ সালে। এরপর কেটে গেছে প্রায় এক যুগ। তবে এখনো দেশে সমন্বিত জাতীয় নীতি তৈরি হয়নি। গত শুক্রবার গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান সমকালকে বলেছিলেন, বিচ্ছিন্ন কিছু কাজ চলছে। কিন্তু একটি স্পষ্ট নীতিপত্র ছাড়া ভবন নির্মাণ থেকে নগর পরিকল্পনা; কোনো কিছুই কাঙ্ক্ষিত পথে যাচ্ছে না।
তাহলে উপায় কী
হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এইচবিআরআই) এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা শহরে বিদ্যমান কংক্রিটের ভবনের ৫৬ দশমিক ২৬ শতাংশই ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে আছে। ৩৬ দশমিক ৮৭ শতাংশ আছে মাঝারি ঝুঁকির মধ্যে। বলা হচ্ছে, রিখটার স্কেলে ৪ বা এর বেশি মাত্রার ভূমিকম্পে ক্ষতির মুখে পড়তে পারে এসব ভবন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলছেন, ভূমিকম্প আতঙ্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হলো। এ থেকেই বোঝা যায়, এই শহরে মানুষ কতটা ঝুঁকিতে আছে। কিন্তু এই ঝুঁকি যেহেতু এক-দুই মাসে এড়ানো সম্ভব নয়, সেহেতু প্রাথমিক কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
ইটের ভবনগুলোর তুলনায় আরসিসি (রিইনফোর্সড সিমেন্ট কংক্রিট) ভবনে ঝুঁকি কিছুটা কম। ভবনের স্ল্যাব ভাঙলেও কলাম ঠিক থাকে। তাই কলামের নিচে দাঁড়ানোটা জরুরি। আদিল মুহাম্মদ খান বলছেন, ভবনের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ হলো সিঁড়ি। ভূমিকম্পের সময় সেখানে গিয়েও দাঁড়ানো যেতে পারে।
_1763903901.jpg)
বিশ্লেষকরা ভবিষ্যতেও ভূমিকম্পের আশঙ্কার কথা বলছেন। সেক্ষেত্রে ফাটল থাকা ভবন থেকে নিরাপদ ও মজবুত ভবনে বাসা স্থানান্তরের পরামর্শ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদের।
নাগরিক উদ্যোগ
জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তোশিতাকা কাটাদার মতে, সম্ভবত পৃথিবীর অন্য যেকোনো অঞ্চলের মানুষের তুলনায় জাপানিজরা দুর্যোগ মোকাবিলায় সবচেয়ে বেশি প্রস্তুতি রাখে। এসব ক্ষেত্রে নাগরিকদের মহড়া দেওয়া ও নিরাপদ স্থানে যাওয়ার পরিকল্পনাকে দৈনন্দিন রুটিনের মতো বিবেচনা করা হয়। এ কারণেই দেশটির প্রায় সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্যান্য স্থাপনায় জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সরঞ্জাম থাকে।
কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার প্রিভেনশন রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ফেলো ও সমাজবিজ্ঞানী জেমস ডি গোল্টজ মনে করেন, আগের দুর্যোগের অভিজ্ঞতাই জাপানের মানুষদের মাঝে এমন সচেতনতা তৈরি করেছে। ২০১১ সালের ভূমিকম্প ও সুনামির পর থেকেই প্রস্তুতিমূলক শিক্ষার ওপরে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
আদিল মুহাম্মদ খান বলছেন, ঢাকা শহরকে বসবাস উপযোগী করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। কিন্তু ব্যবসায়িক স্বার্থ থাকা গোষ্ঠীগুলো যেমন, রিয়েল এস্টেট কোম্পানির কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। এর আগে তাই নাগরিক সচেতনতা বাড়ানোর পদক্ষেপ ক্ষয়ক্ষতি কমাতে কিছুটা হলেও কাজে লাগতে পারে। তবে নগরায়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না নিলে সম্ভাব্য ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করা ছাড়া উপায় থাকবে না।
(ভূমিকম্পের সংখ্যা ও মাত্রা সংক্রান্ত তথ্য নেওয়া হয়েছে ইউএসজিএস, ডেটা ক্যাপিটালিস্ট ও ওয়ার্ল্ড অ্যাটলাস থেকে)
- বিষয় :
- ভূমিকম্প
- ঢাকা
- ভবন
- জাপান
- ইন্দোনেশিয়া
- সমকাল এক্সপ্লেইনার
