ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রতিযোগিতামূলক হয়নি সৌরবিদ্যুতের দরপত্র

প্রতিযোগিতামূলক হয়নি  সৌরবিদ্যুতের দরপত্র
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০২ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৪৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

চার ধাপে ৫৫টি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে দরপত্র আহ্বান করে সরকার। এর মধ্যে ২২টিতে দরপ্রস্তাব পড়েছে একটি করে। ১৩টি দরপত্রে কোনো প্রস্তাব জমা হয়নি। প্রতিটি দরপত্রের বিপরীতে গড়ে প্রস্তাব পড়েছে ১ দশমিক ৪টি। অর্থাৎ দরপত্র প্রতিযোগিতামূলক হয়নি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) পরিচালিত এক গবেষণা জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটি বলছে, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হওয়ায় বিদেশি কোম্পানি দরপত্রে অংশ নেয়নি। 

রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার মিলনায়তনে গতকাল সোমবার আয়োজিত জাতীয় সংলাপে জরিপের ফলাফল তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নিয়োজিত ১০৫টি কোম্পানির ওপর জরিপ চালানো হয়েছে। এর মধ্যে ৪৮টি কোম্পানি দরপত্র কিনেও জমা দেয়নি। ৪৪টি দরপত্রে অংশ নিয়েছে। আর বাকি ১৩টি দরপত্র কেনেনি।

সংলাপে অনলাইনে যোগ দেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। তিনি বলেন, দুর্নীতিগ্রস্ত একটা প্রক্রিয়া থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা চলছে। এতে কিছু ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ আছে। সবাইকে বুঝতে হবে উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে। এখন দরপত্রের মাধ্যমে যে দর পাওয়া গেছে, এগুলোর দাম অনেক কম। এটি প্রতিযোগিতামূলক দর, এটাই এ প্রকল্পের গ‍্যারান্টি। মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য এগুলো পাঠানো হবে। 

তিনি আরও বলেন, বিশেষ ছাড়ের কোনো সুযোগ নেই। আগের মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। তবে যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দর পাওয়া যায়নি, সেগুলোর জন্য নতুন করে দরপত্রের ক্ষেত্রে সেমিনারের সুপারিশ বিবেচনা করা হবে।
সিপিডির জরিপ বলছে, দরপত্রে অংশ নেওয়ার জন্য যেসব শর্ত দেওয়া হয়েছে, সেগুলো শিথিল করা প্রয়োজন। বিশেষ করে আর্থিক সক্ষমতা বেশি চাওয়া হয়েছে। দরপত্রে কারিগরি ও আর্থিক যোগ্যতার আলাদা বিষয় ছিল। দরপত্র কেনা ৯২টি কোম্পানির মধ্যে ৫২টি কারিগরিভাবে যোগ্য হলেও ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র করার আর্থিক সক্ষমতা দেখাতে পেরেছে ৩৫টি। আর ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র করার আর্থিক সক্ষমতা আছে ৩০টির।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দেশের বিভিন্ন জেলায় সৌরবিকিরণ আলাদা, তাই সব দরপত্রে একই শর্ত রাখা ঠিক হয়নি। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জায়গা কাগজে-কলমে আগের চেয়ে অনেক ভালো। তবে চর্চার জায়গায় অত স্বচ্ছতা আসেনি। দরপত্র আহ্বানের পর কার্যাদেশ দেওয়ার মাঝখানের সময় অনেক বেড়ে গেছে। তবে দরপত্রে আগের চেয়ে কম দর পাওয়া গেছে।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির (পিজিসিবি) চেয়ারম্যান এম. রেজওয়ান খান বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা করা হয়েছে প্রায় ২৮ হাজার মেগাওয়াট। সর্বোচ্চ চাহিদা ১৭ হাজার। তাই বিদ্যুৎ উৎপাদন না করে ক‍্যাপাসিটি চার্জ দিয়ে যেতে হচ্ছে। একের পর এক সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের সময় ভাবতে হবে, এগুলো উৎপাদনে এলে রাতে বিদ্যুৎ কোথা থেকে আসবে। শুধু রাতের জন্য তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র চালালে খরচ বেড়ে যায়।
ইউনাইটেড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী বলেন, প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা বিনিয়োগবান্ধব হতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার আগের সরকারের সময় দেওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্মতিপত্র বাতিল করেছে। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে গেছে। দরপত্রে বিদেশি বিনিয়োগকারী আসেনি। তারা মনে করছে, এ সরকারের সময় কাজ নিলে পরের সরকার আবার তা বাতিল করতে পারে।

বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বিইপিপিএ সভাপতি ডেভিড হাসনাত বলেন, সরকারের নীতিনির্ধারকরা অন্য দেশের সঙ্গে তুলনা করে বিদ্যুৎ খরচ হিসাব করতে চান। অথচ নানা রকমের পার্থক্য থাকে। সৌদিতে সূর্যের বিকিরণ বেশি, তাই খরচ কম। নীতিনির্ধারকরা এটা বুঝতে চান না। 
সরকারের উচিত বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বসে নীতি ঠিক করা।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন অস্ট্রেলিয়া হাইকমিশনের ডেপুটি হেড অব মিশন ক্লিনটন পোবকে, বিইপিপিএর সাবেক সভাপতি ইমরান করিম, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউবেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ, জিসোলারিক বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজনীন আখতার, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের উপপরিচালক রাজিয়া সুলতানা প্রমুখ। জরিপ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিপিডির প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট আতিকুজ্জামান সাজিদ।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আগে দরপত্র ছাড়া বিশেষ ক্ষমতা আইনের অধীনে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হতো। আগের ব্যবস্থার চেয়ে বর্তমান ব্যবস্থাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন জরিপে অংশগ্রহণকারীরা। তবে দক্ষতার বিচারে এ প্রক্রিয়া আগের চেয়ে পিছিয়ে। পুনঃদরপত্রে যাওয়ার আগে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা কমিয়ে ছোট ছোট কেন্দ্র করা দরকার। আর্থিক সক্ষমতাও শিথিল করা দরকার। 

আরও পড়ুন

×