পুষ্প
হেমন্তদূত দেবকাঞ্চন
রমনা উদ্যানে হেমন্তে ফোটা দেবকাঞ্চন ফুল লেখক
মৃত্যুঞ্জয় রায়
প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:০৫ | আপডেট: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৯:০৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘ফাল্গুনে বিকশিত/ কাঞ্চন ফুল,/ ডালে ডালে পুঞ্জিত/ আম্রমুকুল’–রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় যে কাঞ্চন ফুলের উল্লেখ রয়েছে তা কি দেবকাঞ্চন ফুল? প্রশ্নটা মাথায় আসতে হিসাব কষতে বসলাম। দেবকাঞ্চন ফুল তো হেমন্তের দূত, তবে কি তা ফুটতে ফুটতে শীত পার করে বসন্তে চলে যায়? বসন্তের সে দৃশ্যটা কল্পনা করলাম। ঢাকার রমনা উদ্যানের মধ্যে বসন্তেও তো কাঞ্চন ফোটে, ফাল্গুন মাসে নিষ্পত্র গাছের ডালে ডালে ফোটা সেসব কাঞ্চন ফুলের শোভা মনোমুগ্ধকর। দুধসাদা সুরভিত কাঞ্চন ফুল! ডালে ডালে শুভ্রবরণা প্রজাপতিদের মেলা। কী যে মধুময়!
ফুলের রংটা সাদা বলে অনেকেই আমরা তাকে শ্বেতকাঞ্চন বলে ভুল করি। শ্বেতকাঞ্চন (Bauhinia acuminata) ফুলও সাদা, তবে সেগুলো ফোটে শরতে। এর গাছ অন্য কাঞ্চন গাছের চেয়ে ছোট, গুল্ম প্রকৃতির। হেমন্তে যে দেবকাঞ্চন (Bauhinia purpurea) ফোটে তার ফুলের রং সাদাটে বা হালকা গোলাপি। হেমন্ত ও শীতে আরও এক রকমের কাঞ্চন ফোটে, যার নাম অর্কিড কাঞ্চন (Bauhinia variegata), এর ইংরেজি নাম অর্কিড ট্রি বলেই হয়তো অর্কিড কাঞ্চন বলা হয়। ফুল ঘন বেগুনি রঙের। কেউ কেউ লাল মনে করে একে বলেন রক্তকাঞ্চন। এগুলো শীতজুড়ে ফুটতে থাকে। হেমন্তে রমনায় গিয়ে দেবকাঞ্চন ও অর্কিড কাঞ্চন দুটোরই দেখা পেলাম।
শীতের পর আসে বসন্ত, মানে ফাল্গুনে ফোটা সেই সুরভিত সাদা রঙের ফুলগুলোও অর্কিড কাঞ্চন (Bauhinia variegata), তবে রংটা সাদা। তার মানে দাঁড়াল, শরতে কাঞ্চনের শুরু হয় শ্বেতকাঞ্চন দিয়ে, সে পরিক্রমায় হেমন্তে যোগ হয় দেবকাঞ্চন, অর্কিড কাঞ্চন ও রক্তকাঞ্চন, আর বসন্তে গিয়ে শেষ হয় সাদা কাঞ্চনে। সময় পরিক্রমায় আমরা প্রকৃতিতে এই চার কাঞ্চনের দেখা পাই। সৌভাগ্য যে, রমনা উদ্যানে চার রকম কাঞ্চন গাছই রয়েছে। বছরে চার ঋতু ধরে পাওয়া যায় কাঞ্চন ফুল। এমনকি গ্রীষ্মেও মাঝে মাঝে দেখা মেলে দেবকাঞ্চন ও শ্বেতকাঞ্চনের।
অগ্রহায়ণের মাঝামাঝি রমনা উদ্যানে হাঁটতে গিয়ে চারদিকে চোখ যখন ফুলের সন্ধান করে, তখন চোখে পড়ে স্বল্প কিছু ফুল–শিউলি, ক্যালিয়েন্ড্রা, ব্রুনফেলসিয়া, রাধাচূড়া, রঙ্গন, নাগেশ্বর ও ইয়েলো ট্রামপিট। হেমন্ত ঋতুর পুষ্পদীনতাকে রাজসিক রঙে রাঙিয়ে দেয় দেবকাঞ্চন গাছগুলো।
অন্যান্য কাঞ্চনের মতো দেবকাঞ্চনও সিসালপিনিয়েসি গোত্রের। ফুল ছাড়া শুধু গাছ ও পাতা দেখে এই চার রকমের কাঞ্চনকে সঠিকভাবে চেনা মুশকিল। শ্বেতকাঞ্চনের গাছ ছোট গুল্ম প্রকৃতির বলে তাকে অন্য সব কাঞ্চন থেকে আলাদাভাবে হয়তো চেনা যায়, তাছাড়া পাতার যে দুটি খণ্ড থাকে সে ফলকের অগ্রভাগ কিছুটা সুচাল। কিন্তু অন্য কাঞ্চনগুলোর পাতা উটের খুরের মতো প্রায় একই আকৃতির, পাতার অগ্রভাগ ভোঁতা, পাতার দুটি খণ্ড ডানা মেলে থাকা প্রজাপতির মতো। এগুলোর মধ্যে দেবকাঞ্চনের পাতা সবচেয়ে বড়।
দেবকাঞ্চন মাঝারি আকারের আধা-চিরসবুজ প্রকৃতির গাছ, গাছের উচ্চতা ৫ থেকে ৭ মিটার, বেশ ঝোপাল। দোলায়মান ডালের আগায় পুষ্পমঞ্জরিতে কয়েকটা করে ফুল ফোটে। কাঞ্চনগুলোর মধ্যে দেবকাঞ্চন ফুলের পাপড়ি পাঁচটি তুলনামূলকভাবে সরু, সাদাটে বা হালকা গোলাপি, অসমান ও লম্বাটে। মৌসুমে প্রচুর ফুল ফোটে। ফুল ফোটা শেষ হলে চ্যাপ্টা শিমের মতো ফল হয়। ফল শুকিয়ে গেলে ফেটে ভেতর থেকে বীজ ছড়িয়ে পড়ে। বীজ থেকে চারা হয়।
বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ডে এ গাছ আছে। ঢাকা শহরে দেবকাঞ্চনের গাছ আছে রমনা উদ্যানে, ধানমন্ডি লেকের পাড়ের উদ্যানে, জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে, শেরেবাংলা নগরে। পার্বত্য চট্টগ্রামের অরণ্যেও আছে এ গাছ। উদ্যানে ও পথের ধারে লাগানোর মতো গাছ। সুখের কথা দেবকাঞ্চন দুর্লভ গাছ না, আপাতত বিলুপ্তির শঙ্কা নেই।
লেখক : কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ
