ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বেসরকারি কলেজে এমপিওভুক্তির আওতা বাড়ছে

বেসরকারি কলেজে এমপিওভুক্তির আওতা বাড়ছে
×

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১১:৫২

বেসরকারি কলেজে এমপিওর (মান্থলি পে অর্ডার) আওতা বাড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। স্নাতক (অনার্স) ও স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) স্তর পর্যন্ত এমপিও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে, যা এতদিন ডিগ্রি পর্যন্ত ছিল। নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্যও রয়েছে বড় সুখবর। এমপিওভুক্তির শর্তাবলি শিথিল করা হয়েছে। চলতি মাসেই নতুন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তির আবেদন নেওয়া শুরু করা হবে।

এসব বিধান রেখে বেসরকারি স্কুল ও কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য প্রণীত ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৫’ গতকাল রোববার রাতে প্রকাশ করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে নীতিমালাটি প্রকাশ করা হয়।

নতুন নীতিমালায় উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের ‘জ্যেষ্ঠ প্রভাষক’ পদ বিলুপ্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদের নিয়োগ যোগ্যতায় আনা হয়েছে পরিবর্তন।

নীতিমালা অনুযায়ী, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে দুই বছরসহ মোট ১৩ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা এবং সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে দুই থেকে তিন বছরসহ মোট ১৫ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকলে তারা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ পদে নিয়োগের জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন।

এ ছাড়া বিনা অনুমতিতে কোনো শিক্ষক ৬০ দিন বা তার বেশি সময় অনুপস্থিত থাকলে তাঁকে এমপিওভুক্তির জন্য আর বিবেচনা করা হবে না। সে ক্ষেত্রে ৬০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট পদটি শূন্য ঘোষণা করে বিধি অনুযায়ী নতুন নিয়োগের ব্যবস্থা নিতে হবে।

নতুন জনবল কাঠামো অনুযায়ী, কোনো বেসরকারি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ খুলতে হলে প্রতি বিভাগে ন্যূনতম ৩৫ জন শিক্ষার্থী থাকতে হবে। বিজ্ঞান বিভাগে নতুন শাখা খোলার ক্ষেত্রে ন্যূনতম শিক্ষার্থী সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ জন।

মফস্বল এলাকায় মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখার জন্য ন্যূনতম ৩০ জন এবং বিজ্ঞান বিভাগের জন্য ন্যূনতম ২০ জন শিক্ষার্থী থাকার শর্ত যুক্ত হয়েছে।

নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তিতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার নন-এমপিও স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসাগুলোকে এমপিওভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা। গতকাল জারি করার পর এখন নীতিমালার আলোকে শিগগিরই নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন আহ্বান করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে।

আবেদনকৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা যাচাই-বাছাই শেষে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা অনুযায়ী নির্দিষ্টসংখ্যক প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করা হবে বলে জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০২২ সালের জুলাইয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অধীন ২ হাজার ৭১৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়। পরে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আরও ২৫৫টি এবং একই বছরের অক্টোবরে অতিরিক্ত ৯১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়।

তবে অভিযোগ রয়েছে, সে সময় রাজনৈতিক বিবেচনায় ক্ষমতাসীন দলের এমপি-মন্ত্রীদের তদবিরে এমপিওভুক্তি প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়েছিল, যা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এর ফলে যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও প্রায় তিন হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির বাইরে থেকে যায়।

উল্লেখ্য, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারের পক্ষ থেকে বেতনের মূল অংশ ও নির্ধারিত ভাতা পেয়ে থাকেন। ফলে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এমপিওভুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।

নীতিমালায় আরও নতুনত্ব

এবারের এমপিওভুক্তি নীতিমালায় কাম্য শিক্ষার্থী সংখ্যা, একাডেমিক স্বীকৃতির সময়কালসহ বিভিন্ন সূচকে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রথমবারের মতো বেসরকারি অনার্স ও মাস্টার্স কলেজগুলোকে এমপিওভুক্তির সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও যুক্ত করা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার এ উদ্যোগ নেওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে এমপিওভুক্তির বাইরে থাকা শিক্ষকরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন।

শিক্ষা উপদেষ্টা ড. সি আর আবরার সম্প্রতি নন-এমপিও ঐক্য পরিষদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানান, সারাদেশে সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষাসহ ২ হাজার ৬০০টির বেশি এমপিওভুক্তির উপযোগী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিও কার্যক্রম চূড়ান্ত করে যাবে অন্তর্বর্তী সরকার।

এ বিষয়ে বেসরকারি কলেজ মাস্টার্স শিক্ষক ফেডারেশনের সভাপতি নেকবর হোসেন রোববার রাতে সমকালকে বলেন, সরকারের এ সিদ্ধান্তে নন-এমপিও স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা এমপিওভুক্ত হলে শিক্ষার গুণগত মান বাড়বে। যোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এমপিওভুক্তির আওতায় এলে শিক্ষকদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে এবং তারা শিক্ষার্থীদের আরও মানসম্মত শিক্ষা দিতে আগ্রহী হবেন।
এর আগে গত ৪ নভেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীনের সভাপতিত্বে ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্কুল-কলেজ জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা চূড়ান্তকরণ’ শীর্ষক সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সভায় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহ, অতিরিক্ত সচিব মিজানুর রহমান, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবদুল হান্নানসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

এ ব্যাপারে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের মাধ্যমিক-২ শাখার অতিরিক্ত সচিব মিজানুর রহমান সমকালকে বলেন, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরের শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে।

সূত্র জানায়, নতুন নীতিমালায় শুধু স্নাতক কোর্স চালু থাকা কলেজে সর্বোচ্চ পাঁচ এবং স্নাতক-স্নাতকোত্তর কোর্স চালু থাকা কলেজে সর্বোচ্চ সাত শিক্ষক এমপিওভুক্ত হবেন। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে সারাদেশের ৪৯৪টি স্নাতক-স্নাতকোত্তর কলেজের প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিক্ষক ও ৫০০ কর্মচারী এমপিও সুবিধার আওতায় আসবেন। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১০ লাখ শিক্ষার্থী রয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এমপিওভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের আবেদন শিগগির অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এখন এমপিওভুক্তির কার্যক্রম শুরু করা হবে। প্রথম ধাপে প্রায় ১১২ কোটি টাকা বরাদ্দের মাধ্যমে তিন হাজার ৫০০ শিক্ষককে এমপিও সুবিধার আওতায় আনা হবে।

বাংলাদেশ বেসরকারি কলেজ অনার্স-মাস্টার্স শিক্ষক ফেডারেশনের সভাপতি নেকবর হোসেন সমকালকে আরও বলেন, ‘১৯৯২ সাল থেকে আমরা বেতন-ভাতা ছাড়াই শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছি। দীর্ঘ আন্দোলনের পর সরকার অবশেষে মানবিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

জানা যায়, এমপিওভুক্তির জনবল কাঠামোয় (অর্গানোগ্রাম) পদ না থাকা এবং অর্থ বিভাগের সম্মতি না মেলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরের এমপিওভুক্তি বারবার আটকে ছিল। ২০১৮ সালের জনবল কাঠামো এবং এমপিও নীতিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নিয়ে কয়েক দফা বৈঠকের পর স্নাতক-স্নাতকোত্তর স্তরের শিক্ষক পদ অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়। তবে গত বছরের অক্টোবরে ঢাকায় টানা আন্দোলনের পর বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে।

চলতি মাসেই এমপিও কার্যক্রম শুরু করার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকরা। বাংলাদেশ বেসরকারি কলেজ অনার্স-মাস্টার্স শিক্ষক ফেডারেশনের সহসভাপতি ও ঢাকা বিভাগের সমন্বয়ক জামির হোসেন বলেন, ‘আর কালক্ষেপণের সুযোগ নেই। ডিসেম্বরের মধ্যেই সব শর্ত শিথিল করে একযোগে এমপিও কার্যক্রম শুরু করতে হবে। দেরি হলে আমরা আবারও আন্দোলনে বাধ্য হব।’

শিক্ষকরা জানান, ১৯৯২ সালে বিএনপি সরকার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার পর থেকে বেসরকারি কলেজের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরের শিক্ষকরা কোনো বেতন-ভাতা পাননি। অথচ একই প্রতিষ্ঠানে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকরা এমপিওভুক্ত, এমনকি ডিগ্রি স্তরের তৃতীয় পদের শিক্ষকরাও এ সুবিধা ভোগ করছেন। আবার মাদ্রাসায় কামিল স্তরের শিক্ষকরা এমপিওভুক্ত হয়েছেন। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ৩০৩টি জাতীয়করণকৃত কলেজে স্নাতক-স্নাতকোত্তরের শিক্ষকরা আত্তীকৃত হয়েছেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, নিজস্ব আয় থেকে শিক্ষকদের বেতন দিতে হবে– এই শর্তে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৯৩ সালে কলেজগুলোকে স্নাতক-স্নাতকোত্তর কোর্স পরিচালনার অনুমতি দেয়। এ কারণে তাদের পদ কাঠামোয় স্থান পায়নি এবং এমপিওভুক্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন শিক্ষকরা।

নেকবর হোসেন বলেন, যে সরকার এসেছে, তারাই আমাদের বঞ্চিত করেছে। এবারও আন্দোলন করতে গিয়ে আমরা পুলিশের লাঠিপেটা খেয়েছি। অবশেষে সরকার এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করলে দীর্ঘ ৩২ বছরের বঞ্চনার অবসান হবে আশা করছি।

আরও পড়ুন

×