ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সেমিনারে বক্তারা

স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা তৈরি হয়নি

জনবল ও সম্পদ বরাদ্দে সমন্বয়হীনতা

স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা তৈরি হয়নি
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৫৫ | আপডেট: ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:৪৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির মাত্র ১ শতাংশ বরাদ্দ, অপ্রতুল অবকাঠামো, আধুনিক প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার, দক্ষ জনবলের ঘাটতি এবং উচ্চ চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে সুনির্দিষ্ট দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কার্যকর হেলথ ফাইন্যান্সিং স্ট্র্যাটেজি এবং সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বয় বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

গতকাল শনিবার সকালে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে আস্থা বৃদ্ধি : মান নিয়ন্ত্রণে কৌশলগত কাঠামো নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব মতামত উঠে আসে।

বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব ডা. জাকির হোসেন বলেন, ২০১১ সালের পর থেকে দেশের স্বাস্থ্যনীতি আর হালনাগাদ হয়নি। একসময় আলাদা প্রকল্প, পরে সেক্টর প্রোগ্রাম এবং বর্তমানে আবার প্রকল্পভিত্তিক পরিকল্পনায় ফিরে যাওয়ার ফলে স্বাস্থ্য খাতে কোনো সুস্পষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা তৈরি হয়নি। কোন খাতে সরকার কাজ করবে, কোথায় বেসরকারি খাত এগিয়ে আসবে, কোন জেলায় কী ধরনের হাসপাতাল প্রয়োজন এবং সেই অনুযায়ী জনবল ও সম্পদ বরাদ্দ এ ধরনের সমন্বিত পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। তিনি আরও বলেন, সরকারি হাসপাতালে অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি থাকলেও পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ না থাকায় রোগীকে বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হয়, যা ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেয়। নিয়মিত ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে রোগীর আর্থিক চাপ কমানো সম্ভব। পাশাপাশি কার্যকর স্বাস্থ্য বীমা, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ও সুসংহত সরকারি সহায়তার অভাবে দেশের হেলথকেয়ার ফাইন্যান্সিং ব্যবস্থা এক ধরনের বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে।

ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, দেশে স্বাস্থ্য বীমা ব্যবস্থার কার্যকর প্রয়োগ না থাকায় মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৪ শতাংশই মানুষকে নিজস্ব পকেট থেকে বহন করতে হয়, যা নিম্ন ও মধ্য আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য বড় আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করছে। টেকসই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বিদেশি বিনিয়োগ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব, আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার সমন্বয় জরুরি। একই সঙ্গে একটি শক্তিশালী হেলথ রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক এ কে আজাদ খান বলেন, স্বাস্থ্য খাতে কিছু উল্লেখযোগ্য অর্জন থাকলেও সামগ্রিকভাবে কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত করা যায়নি। বাংলাদেশের পক্ষে পূর্ণাঙ্গ ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ বাস্তবায়ন কঠিন হলেও প্রাইমারি হেলথ কেয়ারের ওপর জোর দেওয়া জরুরি। ডিজিটাল হেলথ কেয়ারের মাধ্যমে গ্রামীণ পর্যায়ে সেবা সম্প্রসারণ, চিকিৎসা শিক্ষাক্রম আধুনিকায়ন এবং গবেষণার উপযোগী পরিবেশ তৈরির ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউনাইটেড হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মালিক তালহা ইসমাইল বারী। তিনি জানান, উন্নত চিকিৎসার আশায় প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক মানুষ বিদেশে চিকিৎসা নিতে যান, যার ফলে বছরে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে।

আলোচনায় গ্রিন লাইফ সেন্টারের প্রধান কনসালট্যান্ট অধ্যাপক সৈয়দ আতিকুল হক বলেন, দেশের অধিকাংশ মানুষ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়। তাই এসব হাসপাতালে মানোন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতের সব স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. শাফিউন নাহিন শিমুল বলেন, স্বাস্থ্য খাতে আস্থা বাড়াতে রোগী ও সেবা প্রদানকারীদের মধ্যে যোগাযোগ জোরদার করতে হবে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
আইসিডিডিআর,বির সংক্রামক রোগ বিভাগের সিনিয়র সায়েন্টিস্ট ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবছর প্রায় তিন লাখ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সেবা দেয়। আইসিডিডিআর,বির মডেল অনুসরণ করে দেশের অন্যান্য স্থানে সেবা সম্প্রসারণ সম্ভব। তিনি জানান, ক্যান্সার ডায়াগনস্টিক জেনোমিকস ও ডেঙ্গু ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। দুই বছরের মধ্যে ডেঙ্গু ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন

×