সুদানে ৬ শান্তিরক্ষী নিহত
‘বাবা মাসুদ, একবার মা বলে ডাক’
করপোরাল মো. মাসুদ রানা। ছবি: আইএসপিআর
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১০:০৫ | আপডেট: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১০:১২
সুদানে নিহত ছয় শান্তিরক্ষীর একজন নাটোরের লালপুর উপজেলার বোয়ালিয়াপাড়া গ্রামের মৃত সাহার মালিথার ছেলে করপোরাল মাসুদ রানা। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে মাসুদ সবার বড়। তাদের তিন ভাই-ই সেনাসদস্য।
পরিবারের সদস্যরা জানান, শনিবার রাত ১১টার দিকে মাসুদের খবর শোনার পর থেকে তাঁর মা, স্ত্রী-সন্তানসহ স্বজনের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে গোটা বাড়ি। মাসুদ রানার মা মর্জিনা বেগম কিছুক্ষণ পরপর বিলাপ করে বলছেন, ‘ও বাবা মাসুদ, একবার মা বলে ডাক। আমাকে ভালো থাকতে বলে ছেলে নিজেই চলে গেল!’ চিৎকার করতে করতে মূর্ছা যাচ্ছেন তিনি।
শোকে পাথর মাসুদের স্ত্রী আঁখি খাতুন। কারও সঙ্গে কথা বলছে ৮ বছরের একমাত্র কন্যা মাগফিরাতুল মাওয়া আমিনা। স্বজনরা দ্রুত করপোরাল মাসুদ রানার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন।
সুদানের আবেই এলাকায় জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনের ঘাঁটিতে সন্ত্রাসীদের ড্রোন হামলায় হতাহত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষীদের নাম-পরিচয় জানা গেছে। আহত আটজনের একজন নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন; বাকিরা শঙ্কামুক্ত। গতকাল রোববার এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায় আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)।
এদিকে সুদানে ড্রোন হামলায় ছয় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীর মৃত্যুতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ফোন করে শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর জানিয়েছে, রোববার সন্ধ্যা ৭টায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলেন জাতিসংঘ মহাসচিব।
ফোনালাপে গুতেরেস বলেন, আমি আমার গভীর শোক ও সমবেদনা জানাতে ফোন করেছি। আমি গভীরভাবে মর্মাহত। বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের ওপর হামলায় আমি শঙ্কিত। এ ঘটনায় শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন জাতিসংঘ মহাসচিব।
প্রধান উপদেষ্টা আহত শান্তিরক্ষীদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা সুবিধাসম্পন্ন হাসপাতালে স্থানান্তর এবং সেনাদের মরদেহ দ্রুত প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রতি আহ্বান জানান।
গুতেরেস ড. ইউনূসকে বলেন, আহত শান্তিরক্ষীদের প্রাথমিক চিকিৎসা সুদানের একটি স্থানীয় হাসপাতালে দেওয়া হয়েছে এবং গুরুতর আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য সুসজ্জিত হাসপাতালে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। বাংলাদেশি সেনাসদস্যদের চিকিৎসা ও নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ায় মহাসচিবকে ধন্যবাদ জানান প্রধান উপদেষ্টা।
মরদেহ দ্রুত দেশে আনার আকুতি
সুদানে নিহত সৈনিক শান্ত মণ্ডলের গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছাট মাধাই গ্রামে। বাবা মৃত সাবেক সেনাসদস্য নুর ইসলাম মণ্ডল ও মা সাহেরা বেগমের ছোট ছেলে শান্ত। তাঁর এমন মৃত্যুতে ছাট মাধাই গ্রামের বাড়িতে চলছে কান্নার রোল।
গতকাল বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, কান্নায় ভেঙে পড়েছেন শান্তর মা ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। শান্তর বড় ভাই সোহাগ মণ্ডলও সেনাবাহিনীর সদস্য।
পরিবারের সদস্যরা জানান, গত মাসেই শান্তি মিশনে সুদান যান শান্ত। তাঁর স্ত্রী দিলরুবা আক্তার বৃষ্টি পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তাঁর মরদেহ দ্রুত দেশে ফেরাতে সরকারের প্রতি আকুতি জানিয়েছেন তারা।
একই মিশনে কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার পান্ডুল ইউনিয়নের উত্তর পান্ডুল গ্রামের সৈনিক মমিনুল ইসলামও নিহত হয়েছেন। দুই কন্যাসন্তানের জনক মমিনের চাকরির বয়স ১৭ বছর পাঁচ মাস। তিনিও নভেম্বরে সুদান যান। মমিনের মৃত্যুর খবর শুনে ভেঙে পড়েছেন তাঁর বাবা আব্দুল করিম, মা মনোয়ারা বেগম ও স্ত্রী মুন্নি বেগম। দুই মেয়ে মাঈসা জাহান মিমি (১৪) ও মোনতাসিনা মারিয়া মণি (৬) বাবাকে হারিয়ে নির্বাক। তারাও বাবার মরদেহ দ্রুত দেশে আনার আকুতি জানান।
‘আমার সোনা আর কথা কয়না রে’
‘ওরে, আমার বাজান রে, আমার আব্বারে। আমার কত সুন্দর সোনারে! আমার সব শেষ হয়ে গেছে। আমার ছেলে দেড় বছর আগে বিয়ে করেছে। এখনও কোনো সন্তান হয়নি। কত স্বপ্ন ছিল ছেলেকে নিয়ে! ছেলে বলেছিল, এবার ফিরে তার বোনকে বিয়ে দেবে। বোনের জন্য অনেক কিছু নিয়ে আসবে। আমার সোনা আর কথা কয়না রে ...!’
ছেলের শোকে এভাবেই গতকাল বিলাপ করছিলেন সুদানে নিহত শান্তিরক্ষী সৈনিক শামীম রেজার বাবা আলমগীর ফকির। একদিকে ছেলের শোক, অন্যদিকে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষমকে হারিয়ে দিশেহারা পরিবারের সবাই। শামীম রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মৃগী ইউনিয়নের হোগলাডাঙ্গি গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর মৃত্যুতে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। 
গতকাল সৈনিক শামীমের বাড়ি গিয়ে দেখা যায় কান্নায় ভেঙে পড়েছেন তাঁর মা, স্ত্রী ও বাবা। উঠানজুড়ে স্বজন ও প্রতিবেশীর ভিড়। তারা দ্রুত সৈনিক শামীম রেজার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
৩ বছরের ইরফান জানে না– বাবা নেই
সুদানে জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে মাত্র মাসখানেক আগে গিয়েছিলেন কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের তারাকান্দি গ্রামের সন্তান সৈনিক মেস ওয়েটার জাহাঙ্গীর আলম (৩০)। স্ত্রী রুবাইয়া আক্তার ও ৩ বছরের ছেলে মো. ইরফানকে রেখে শান্তি মিশনে সুদান গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আর জীবিত ফিরতে পারলেন না। জাহাঙ্গীরের বাড়িতে এখন চলছে মাতম। অবুঝ ইরফান এখনও জানে না– তার বাবা আর ফিরবে না।
জাহাঙ্গীরের শ্যালক মো. অলিউল্লাহ জানান, রোববার সকালে রংপুর সেনানিবাস থেকে ইমরান নামে একজন ক্যাপ্টেন ফোন করে জাহাঙ্গীরের মৃত্যু সংবাদ দেন। এর পর থেকেই বাড়িতে কান্নার রোল। জাহাঙ্গীরের বাবা হযরত আলী, মা হালিমা আক্তার এবং স্ত্রী রুবাইয়া আক্তার বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। বাড়িতে গ্রামের মানুষ ছুটে আসছেন সমবেদনা জানাতে।
কান্না থামছে না সবুজের বৃদ্ধ মায়ের
কান্না যেন থামছেই না সুদানে নিহত শান্তিরক্ষী লন্ড্রি কর্মচারী সবুজ মিয়ার (২৮) মা সখিনা বেগমের। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে বারবার বিলাপ করছেন তিনি। গতকাল গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার মহদীপুর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ছোট ভগবানপুর পূর্বপাড়ায় নিহত সবুজ মিয়ার গ্রামের বাড়ি গিয়ে দেখা যায় মাতম। সবুজ ছোট ভগবানপুর পূর্বপাড়ার মৃত হাবিদুল ইসলামের ছেলে।
কাঁদতে কাঁদতে সত্তরোর্ধ্ব সখিনা বেগম বলেন, ‘সবুজের বয়স যখন ২ বছর, তখন আমি স্বামী হারাই। অভাবের সংসারে অনেক কষ্ট করে দুই সন্তানকে বড় করি। সে কারণে কম বয়সেই সবুজ সেনাবাহিনীর চাকরিতে গিয়েছিল। সন্তানকে হারিয়ে আমি নিঃস্ব হয়ে গেলাম।’
চাচাতো ভাই ফিরোজ মিয়া বলেন, সবুজ ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম। তার মৃত্যুতে পরিবারের বড় ক্ষতি হয়ে গেল।
সবুজের স্ত্রী নূপুর আক্তার বলেন, ‘মাত্র দেড় বছর আগে বিয়ে হয় আমাদের। সংসার ভালোমতো শুরুর আগেই স্বামীকে হারালাম। আমি সরকারের প্রতি আবেদন জানাই, যাতে দ্রুত স্বামীর লাশ দেশে ফেরত আনার ব্যবস্থা করে।’
আইএসপিআরের বিবৃতি
আইএসপিআরের বিবৃতিতে বলা হয়, সুদানের আবেই এলাকায় জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনের আওতাধীন কাদুগলি লজিস্টিকস বেসে গত শনিবার স্থানীয় সময় বেলা ৩টা ৪০ মিনিট থেকে ৩টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী ড্রোন হামলা চালায়। হামলায় দায়িত্বরত ছয় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী শহীদ হন; আহত হন আটজন।
শহীদ শান্তিরক্ষীরা হলেন– করপোরাল মো. মাসুদ রানা, সৈনিক মো. মমিনুল ইসলাম, শামীম রেজা, শান্ত মণ্ডল, মেস ওয়েটার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ও লন্ড্রি কর্মচারী মো. সবুজ মিয়া।
আহত শান্তিরক্ষীরা হলেন– কুষ্টিয়ার বাসিন্দা লেফটেন্যান্ট কর্নেল খোন্দকার খালেকুজ্জামান, দিনাজপুরের সার্জেন্ট মো. মোস্তাকিম হোসেন, ঢাকার করপোরাল আফরোজা পারভিন ইতি, বরগুনার ল্যান্স করপোরাল মহিবুল ইসলাম, কুড়িগ্রামের সৈনিক মো. মেজবাউল কবির, রংপুরের সৈনিক মোসা. উম্মে হানি আক্তার, মানিকগঞ্জের সৈনিক চুমকি আক্তার ও নোয়াখালীর বাসিন্দা সৈনিক মো. মানাজির আহসান।
আহত আট শান্তিরক্ষীকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাদের মধ্যে মেজবাউল কবিরের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাঁর সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে তিনি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। অন্য আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টারে স্থানান্তর করা হয়েছে। তারা শঙ্কামুক্ত।
নৃশংস এ সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। বিবৃতিতে বলা হয়, শহীদ শান্তিরক্ষীদের আত্মত্যাগ বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অঙ্গীকারের এক উজ্জ্বল ও গৌরবময় নিদর্শন হয়ে থাকবে। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে শহীদদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হচ্ছে। আহত ব্যক্তিদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করা হচ্ছে।
ছয় শান্তিরক্ষী নিহত ও আটজন আহত হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। গতকাল এক বিবৃতিতে সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন শহীদ সেনাসদস্যদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। সেই সঙ্গে শহীদ পরিবার, স্বজন ও সেনাবাহিনীর শোকাহত সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন তারা।
(প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার সমকাল প্রতিনিধিরা)
- বিষয় :
- সুদান
- নিহত
- শান্তিরক্ষী বাহিনী
