ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সুদানে ৬ শান্তিরক্ষী নিহত

হামলার নেপথ্যে কারা

হামলার নেপথ্যে কারা
×

সুদানে শহীদ ৬ শান্তিরক্ষী। ছবি: আইএসপিআর

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১১:১৫

ছয় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহতে সরকারবিরোধী আধা সামরিক র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসকে (আরএসএফ) দায়ী করেছে সুদানের সেনা সমর্থিত সরকার। শুধু এই হামলা কেন, সেখানে জাতিগত নিধনের অভিযোগ আছে এই বাহিনীর বিরুদ্ধে। সাম্প্রতিক হামলার পর থেকে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, আরএসএফ কারা? কেন তারা হামলা চালাচ্ছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিবিসির অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে দুই জেনারেলের দ্বন্দ্বের কথা। জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান (সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান) এবং জেনারেল মোহাম্মদ হামদান দাগালো বা হেমেদতি (আরএসএফ নেতা)। দুজনই ক্ষমতা ও প্রভাব ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। তাদের দ্বন্দ্বে বেসামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা অসম্ভব হয়ে ওঠে। আরএসএফের এক লাখ সদস্যকে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি।

শনিবার বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, সুদানের কোরদোফানের কাদুগলি এলাকায় জাতিসংঘের একটি ভবনে হামলায় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী হতাহতের ঘটনা ঘটে। এর আগে আলজাজিরার খবরে বলা হয়, আরএসএফ গত সপ্তাহে কোরদোফানের পাশে হেগলিগ তেলক্ষেত্র দখলে নিয়েছে। এখানে দিনে ৮০ হাজার থেকে এক লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এর আগে দারফুরের রাজধানী এল-ফাশের এবং পশ্চিম কোরদোফানের বাবনুসা আরএসএফের হাতে চলে গেছে।

ঘটনার শুরু ২০১৯ সালে। সে বছর প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। তিনি ১৯৮৯ সালে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিলেন। অনেক প্রতিবাদের পর সেনাবাহিনী অভ্যুত্থান করে। এর পর থেকে উত্তেজনা চলছিল। নাগরিকরা গণতন্ত্র চাচ্ছিল। একটি সামরিক-বেসামরিক যৌথ সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০২১ সালের অক্টোবরে ওই দুই জেনারেল আরেকটি অভ্যুত্থান ঘটান। এই দুই নেতাই বর্তমান সংঘাতের কেন্দ্রে। তারা বেসামরিক শাসন এবং আরএসএফকে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে একমত হতে পারেননি।

২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি শুরু হয়। সেনাবাহিনী এটিকে হুমকি হিসেবে দেখার পর আরএসএফ দেশের বিভিন্ন স্থানে সদস্য মোতায়েন করে। আরএসএফ খার্তুমের একাংশ দখল করে। প্রায় দুই বছর পর ২০২৫ সালের মার্চে সেনাবাহিনী তা পুনরুদ্ধার করে।

সুদানের গৃহযুদ্ধ ও সংকট

২০২৩ সালের এপ্রিলে সুদানে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। সেনাবাহিনীর সঙ্গে শক্তিশালী আধা সামরিক গোষ্ঠী আরএসএফের সংঘাত চলে। এই সংঘাতের সময় দারফুর অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ এবং গণহত্যার অভিযোগ ওঠে। সম্প্রতি আরএসএফ এল-ফাশের শহর দখল করায় সেখানকার বাসিন্দাদের জন্য নতুন করে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জাতিসংঘ এটিকে বিশ্বের বৃহত্তম মানবিক সংকট বলেছে। এই সংঘাতে দেশে দেড় লাখের বেশি মানুষ মারা গেছে। প্রায় এক কোটি ২০ লাখ মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে।

আরএসএফের কুখ্যাতি

আরএসএফ ২০১৩ সালে গঠিত। এর উৎপত্তি কুখ্যাত জানজাবিদ মিলিশিয়া থেকে। তাদের বিরুদ্ধে দারফুরে গণহত্যা ও জাতিগত নির্মূলের অভিযোগ আছে।

আরএসএফ নেতা জেনারেল দাগালো শক্তিশালী বাহিনী গড়ে তুলেছেন। এই বাহিনী ইয়েমেন ও লিবিয়ার সংঘাতে হস্তক্ষেপ করেছে। তিনি সুদানের সোনার খনি নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁর বিরুদ্ধে সংযুক্ত আরব আমিরাতে স্বর্ণ পাচারের অভিযোগ আছে।

গত জুনে আরএসএফ লিবিয়া ও মিসরের সঙ্গে সুদানের সীমান্ত বরাবর অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেয়। অক্টোবর শেষে এল-ফাশের দখলের পর তারা দারফুরের প্রায় সব অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। আরএসএফ একটি প্রতিদ্বন্দ্বী সরকার গঠনের পথে রয়েছে। এটি সম্ভব হলে সুদান দ্বিতীয়বারের মতো বিভক্ত হতে পারে।

সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষয়ক্ষতি

সামরিক বাহিনী বেশির ভাগ উত্তর এবং পূর্ব অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে। এদের সমর্থন দিচ্ছে মিসর। জেনারেল বুরহান লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত পোর্ট সুদানকে তাঁর সদরদপ্তর বানিয়েছেন। আরএসএফ সেখানে ড্রোন হামলা করেছে।

সেনাবাহিনী খার্তুম পুনরুদ্ধার করলেও শহরটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো ধ্বংস হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অক্টোবরে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য আবার খোলা হয়। সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ গেজিরা রাজ্যের প্রায় সব নিয়ন্ত্রণও ফিরে পেয়েছে।

গণহত্যা ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

দারফুরের অনেক মানুষ বিশ্বাস করে, আরএসএফ জাতিগতভাবে মিশ্র অঞ্চলটিকে আরব-প্রধান অঞ্চলে রূপান্তর করতে যুদ্ধ চালাচ্ছে।

২০২৪ সালের মার্চে জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) শিশু ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ভয়াবহ বিবরণ দেয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) এবং যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, আরএসএফ গণহত্যা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র জেনারেল দাগালোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে আরএসএফকে অর্থায়ন ও অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ আছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এই মামলা শুনতে অস্বীকার করেছে। আরএসএফ বিবিসির কাছে গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

শান্তি আলোচনার সব পর্ব ব্যর্থ হয়েছে। নভেম্বরের শুরুতে আরএসএফ একটি মানবিক যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়। কিন্তু সেনাবাহিনী আরএসএফকে যুদ্ধবিরতি না মানার জন্য অভিযুক্ত করে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) বলছে, দেশটির দুই কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষ খাদ্যের তীব্র নিরাপত্তাহীনতার মুখে আছে। মানবিক সাহায্য কমে যাওয়ায় এই সংঘাতকে বিস্মৃত যুদ্ধ বলা হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও অস্ত্র পাচার হচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, চীন, রাশিয়া, ইরানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে।

আরও পড়ুন

×