ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিবর্তন

মানুষ খাবার না দিলে ঠোঁট পাল্টায় পাখি

মানুষ খাবার না দিলে ঠোঁট পাল্টায় পাখি
×

কালো চোখের জুনকো ঠোঁটের আকৃতি ও রং বদলে ফেলতে পারে। ছবি: দ্য আর্থ

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১২:২৯

কভিড-১৯ মহামারি চলাকালে যখন লস অ্যাঞ্জেলেসে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার ক্যাম্পাস বন্ধ ছিল, তখন একটি অদ্ভুত বিষয় সামনে আসে। তখন শ্রেণিকক্ষগুলো খালি। হাঁটার পথে নীরবতা। আর যেসব বাক্সে খাবারের উচ্ছিষ্ট ছিল, সেগুলোও শূন্য। সেখানে নেই আধখাওয়া খাবার, বিস্কুটের টুকরো। এসব পরিবর্তন ক্যাম্পাসের পাখিদের জীবনও বদলে দিচ্ছিল। বিস্ময়করভাবে তাদের চঞ্চু বদলে গেছে। বিশেষ করে জুনকো নামের ছোট্ট পাখিদের ক্ষেত্রে এমনটা দেখা যায়।  

শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনুপস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে জুনকোর সংখ্যা কমতে শুরু করে। তারা অন্যত্র চলে যাচ্ছিল। মাত্র কয়েক বছরে তাদের ঠোঁটের আকৃতি পরিবর্তিত হয়। তারপর তারা যখন আবার ক্যাম্পাসে ফিরল, তখন আবার আগের অবস্থায় পৌঁছায়। এ পাখিদের প্রজাতি একই। কিন্তু অঞ্চল, বসবাস ও খাবারের ধরন তাদের ঠোঁটের আকৃতি ও রঙে প্রভাব ফেলেছে।

এটাকে সামান্য ঘটনা হিসেবে দেখছেন না বিজ্ঞানীরা। তারা এ পরিবর্তনকে মানুষের আচরণের প্রতিক্রিয়ায় দৈনন্দিন বিবর্তনের একটি বিরল ও বাস্তব উদাহরণ বলে বর্ণনা করছেন। ঘটনাটি এটাই দেখায়– পরিবেশ হঠাৎ পরিবর্তিত হলে বন্যপ্রাণী কত দ্রুত তা মানিয়ে নিতে পারে।

বিবর্তন সম্পর্কে মানুষের যে ধারণা, তা দূর অতীতে আটকে আছে। এর সঙ্গে জীবাশ্ম বা এ ধরনের শব্দ যুক্ত থাকে। পাঠ্যপুস্তকে এ নিয়ে থাকে বিস্তর আলোচনা। কিন্তু বিবর্তন যে আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও দৃশ্যমান হতে পারে, এমনটা কেউ ভাবেন না। যখন পরিবেশের পরিবর্তন হয়, তখন যেসব প্রাণী সেই পরিবর্তনকে ভালোভাবে সামলাতে পারে, তারা আরও বেশি সন্তান জন্মদানে বংশ বৃদ্ধিতেও সক্ষম হয়। 

এ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে কালো চোখের জুনকো (জুনকো হাইমালিস), ছোট চড়ুই পাখিদের জীবন অনুসরণ করা হয়েছিল। এসব পাখির যেগুলো সাধারণত পাহাড়ি বনে থাকে, তাদের করা হয় বিষয়বস্তু। তারাই কখনও দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার শহর অথবা শহরতলিতে চলে আসে। আংশিকভাবে এর কারণ জলবায়ু পরিবর্তন হলেও মূলত অভ্যস্ত আবাসস্থল সংকুচিত হওয়াকে দায়ী করা হয়।

ইউসিএলএ ক্যাম্পাসে এ জুনকোরা শহরে বসবাসের একটি কৌশল নিয়েছিল। তারা প্রকৃতি থেকে বিভিন্ন উদ্ভিদের বীজ খাওয়ার পরিবর্তে লোকজন যা ফেলে দেয় বা উচ্ছিষ্ট, তা খেয়ে বেঁচে থাকত। ইউসিএলএর জীববিজ্ঞানীরা ক্যাম্পাসের পাখিদের এমন আচরণের ওপর ঘনিষ্ঠভাবে নজর রাখছিলেন। পাখিদের বেঁধে আচরণ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন; ওজন পরিমাপ করেছিলেন এবং রক্তের নমুনা নিয়েছিলেন, যাতে দেখা যায়, শহরের জীবন কীভাবে তাদের গঠন করছে।

দীর্ঘদিন ধরে চলা এ প্রচেষ্টার মধ্যেই আসে করোনা মহামারি। ফলে সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়। জীববিজ্ঞানীরা তুলনা করার মতো স্পষ্ট সুযোগ পেয়ে যান। তারা লক্ষ্য করেন– কেবল মানুষের জীবনই পরিবর্তিত হয়নি, মানুষের সঙ্গে অভ্যস্ত প্রাণীদেরও পরিবর্তন হয়েছে। গবেষণায় তারা দেখেন, ক্যাম্পাস বন্ধের সময় জুনকোর ঠোঁট বনের পাখিদের ঠোঁটের মতো আকৃতিতে স্থানান্তরিত হয়েছে। শাটডাউনের আগে গবেষকরা পাখির ঠোঁট ছোট ও শক্ত দেখতে পেয়েছিলেন। কিন্তু প্রায় দুই বছর বনে জুনকো বাবা-মা তাদের ছানাদের ঠোঁট লম্বা ও সরু করে লালন-পালন করে।

গবেষণার লেখক অধ্যাপক পামেলা ইয়ে বলেন, ‘আমাদের বিবর্তনের ধারণাটি ধীর। কারণ, বিবর্তনের সময়টাও ধীরগতির।’ গবেষণার আরেক লেখক এলিনর ডায়াম্যান্ট বলেন, ‘সত্যি বলতে কি, আমরা যখন দেখলাম পরিবর্তন কতটা শক্তিশালী, তখন বেশ হতবাক হই। এটি সম্ভবত ঘটেছে মানুষের উচ্ছিষ্ট না পেয়ে।’

আরও পড়ুন

×