ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর

উৎকণ্ঠায় ৫৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী

উৎকণ্ঠায় ৫৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী
×

 তবিবুর রহমান 

প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:০৬ | আপডেট: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৩:৫৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর বিলুপ্ত হচ্ছে। গঠিত হতে যাচ্ছে ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর’। প্রস্তাবিত এই অধিদপ্তরের একটি শাখার অধীনে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম যুক্ত করার উদ্যোগে উৎকণ্ঠায় রয়েছেন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের শঙ্কা, এতে মাঠপর্যায়ে সেবা কার্যক্রমে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘদিনের অর্জন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আলোচনা বা অংশীজনের মতামত ছাড়াই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে অধিদপ্তরের প্রায় ৫৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ১৪ সেপ্টেম্বর অধিদপ্তরের এক বৈঠকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সুপারিশ তুলে ধরেন। সেখানে জানানো হয়, বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, গবেষণাসহ স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনাকারী সাতটি প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত করে তিনটি অধিদপ্তর গঠন করা হবে। এর মধ্যে প্রাথমিক চিকিৎসা, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা ও জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমের জন্য আলাদা একটি অধিদপ্তর গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর পর থেকেই পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (পরিবার পরিকল্পনা) অ্যাসোসিয়েশনসহ একাধিক কর্মী সংগঠন দুই দফায় স্মারকলিপি দিয়েছে। তবে এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তরফে এখনও স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে–পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মহাপরিচালক। প্রতিষ্ঠানটি বিলুপ্ত হলে অতিরিক্ত মহাপরিচালক দিয়ে সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অধীনে চলে যাবে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে এটি স্বাস্থ্য শিক্ষা পরিবার কল্যাণ বিভাগের অধীনে রয়েছে।

কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, ১৯৬৫ সাল থেকে পরিচালিত পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, মাতৃ ও শিশুমৃত্যু হ্রাস স্বাস্থ্য উন্নয়নে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সাফল্য অর্জন করেছে। অথচ কোনো সমীক্ষা বা পরামর্শ ছাড়াই ফের একীভূতকরণের উদ্যোগ নেওয়া হলে তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তারা স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত উপজেলা ও তদনিম্ন পর্যায়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ একীভূত করা হয়েছিল। সে সময় প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা, সেবার মানের অবনতি এবং মাঠপর্যায়ে সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ২০০৪ সালের ১ জানুয়ারি দুটি বিভাগ আবার আলাদা করা হয়, যা তখন কার্যকর সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।

মাঠপর্যায়ের সেবায় প্রভাব পড়ার শঙ্কা
বর্তমানে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অধীনে প্রায় ৫৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। এই জনবলের মধ্যে ২৩ হাজার ৫০০ পরিবার কল্যাণ সহকারী, চার হাজার ৫০০ পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক, ছয় হাজারের বেশি পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা এবং প্রায় আড়াই হাজার উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল কর্মকর্তা রয়েছেন। এই মাঠকর্মীরাই বাড়ি বাড়ি গিয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিতরণ, গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সেবা, কিশোর-কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা, টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই), স্যাটেলাইট ক্লিনিক পরিচালনা এবং বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। তাদের কাজের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ মাতৃ ও শিশুমৃত্যু হ্রাসে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রোল মডেল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর বিলুপ্ত হলে সেবায় প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর আলাদা রাখার কারণে সমন্বয়হীনতা ও কাজের পুনরাবৃত্তি বেড়েছে। তাঁর মতে, দুই ভাগে বিভক্ত থাকায় কার্যকারিতা কমেছে। তাই স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ একীভূত করাই যুক্তিযুক্ত। তবে আগে কাজের পরিধি ঠিক করে নেওয়া ভালে।

তবে মাঠপর্যায়ের কর্মীরা এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক সমিতির আহ্বায়ক মো. সোহেল হোসেন বলেন, ‘পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর আলাদা রেখেও সমন্বয়ের মাধ্যমে কার্যক্রম চালানো সম্ভব। আমাদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, যা অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।’

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (পরিবার পরিকল্পনা) অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম বলেন, পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির ফলে দেশে একসময় মোট প্রজনন হার ৬ দশমিক ৫ থেকে নেমে ২০২৪ সালে ২ দশমিক ৩-এ আসে। তবে সামগ্রী সংকটের কারণে ২০২৫ সালে তা বেড়ে ২ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তাঁর মতে, অধিদপ্তর একীভূত হলে মাঠপর্যায়ের সেবা আরও ব্যাহত হবে।

তিনি আরও জানান, পরিবার পরিকল্পনা সংশ্লিষ্টদের শঙ্কা, অধিদপ্তর বিলুপ্ত বা কার্যত দুর্বল হলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। এতে মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার বাড়ার পাশাপাশি নারীর স্বাস্থ্য ও ক্ষমতায়ন বাধাগ্রস্ত হবে। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, অধিদপ্তর একীভূতকরণের মূল লক্ষ্য হলো প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে সেবা কার্যক্রম একসঙ্গে পরিচালনা করা। এক কথায় কার্যক্রমে সমন্বয় নিশ্চিত করা।
 

আরও পড়ুন

×