বিশেষ লেখা
রাষ্ট্র যেন সব মানুষের, সব ধর্মের হয়
আবুল কাসেম ফজলুল হক
আবুল কাসেম ফজলুল হক
প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৪৮ | আপডেট: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৯:৫৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
দৈনিক আজাদ নামে একটি পত্রিকা ছিল। সম্পাদক মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ। পাকিস্তান আন্দোলনে আজাদের বড় ভূমিকা ছিল। আজ প্রমাণিত হয়েছে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় আজাদের অবস্থান সংগত ছিল না। তবু তার ভূমিকাকে উপেক্ষা করা যায় না। উপসম্পাদকীয় পাতায় নিজ অবস্থান পরিষ্কার করত। দৈনিক আজাদের প্রতি দ্ব্যর্থহীন সমর্থন জানানোর সুযোগ নেই। তবু এর কিছু গুণের কথা অস্বীকার করা যায় না। বর্তমানে এমন পত্রিকা নেই বললে চলে। আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সংকটে গণমানুষের পাশে দাঁড়াবে, যথাযথ সংবাদ পরিবেশন করবে এবং উপসম্পাদকীয় বিভাগে নিজেদের আদর্শকে ভিত দান করবে, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্রভাবমুক্ত থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকবে– এমন মুখপত্র চাই, যেন রাষ্ট্রের বিপরীতে মানুষ কণ্ঠহীন হয়ে না পড়ে। নতুন বছরে অনেক চাওয়ার ভেতর এটি অন্যতম প্রধান।
দেশে ইতিহাসের নানারকম ব্যাখ্যা থাকবে, কিন্তু উপাত্তগুলো স্বীকার করে নিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সংঘটন ও এর প্রয়োজনীয়তাকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্বীকার করে না নিলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় সংকট দেখা দেবে। যে কোনো কাঠামোকে দৃঢ় ভিতের ওপর দাঁড় না করালে তার স্থায়িত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এ ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের ভিতের ওপর রাষ্ট্র কাঠামোকে দাঁড় করাতে হবে। রাষ্ট্র যেন সব ধর্মের, সব সম্প্রদায় ও নৃগোষ্ঠীর হয়, মানুষ যেন ভীতিহীন সামাজিক পরিবেশ পায়, বিচারহীনতার সুযোগে মানুষের ভেতরকার সহিংসতা ও মানুষকে অবমূল্যায়নের পাশবিক ঝোঁক যেন না জেগে ওঠে, সে বিষয়ে রাষ্ট্রকে সজাগ থাকতে হবে।
ফেব্রুয়ারিতে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার ব্যাপারে আমি আশাবাদী। এরপর নবগঠিত সরকার যেন বহিঃশক্তির সঙ্গে স্বচ্ছ বোঝাপড়ায় আসে ও তা প্রকাশ করে, অভ্যন্তরীণ সম্প্রীতি ও শৃঙ্খলা রক্ষা করে এবং কল্যাণ রাষ্ট্রীয় নীতিগুলো প্রতিষ্ঠা করার দিকে মন দেয়। বিগত সরকারের সময় সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তাদের চাহিদার কথা জানিয়ে বারবার সতর্কবার্তা পাঠিয়েছিল। বলেছিল, বিশেষ কিছু দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক দূরত্ব রক্ষা করতে। এ ধরনের সংকট বড় ধরনের রাষ্ট্রীয় সংকট। এমন সংকটে দেশের অভ্যন্তরীণ শক্তিগুলোর ভেতর ঐক্য দরকার হয়। কিন্তু বিগত সরকার দেশের অভ্যন্তরে সেই ঐক্য রক্ষা করেনি। বরং বিনষ্ট করেছে। সেই সরকারের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান সফল হওয়ার একাধিক বড় কারণের ভেতর এটি একটি। যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, তারা যেন এ থেকে শিক্ষা নেয়। রাজনৈতিক মতদ্বৈততা থাকবে, কিন্তু সংকটে অভ্যন্তরীণ ঐক্য যেন বজায় থাকে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
আমাদের দেশ এখন একটি কালো অধ্যায় অতিক্রম করছে। মানুষের আচরণে মধ্যযুগীয় নৃশংসতার প্রকাশ লক্ষণীয়। বিচারহীনতার সুযোগ নিচ্ছে অপরাধী চক্র। দেশের চিরায়ত কৃষ্টি, বহুত্ববাদী সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ, সর্বোপরি রাষ্ট্রের ইহজাগতিক আদর্শ রক্ষায় সরকারকে যত্নশীল হতে হবে। সাম্প্রতিক সরকার এ ক্ষেত্রে অনেকটাই ব্যর্থ। আমরা দেখতে পারছি না। ভবিষ্যৎ সরকারের কাছ থেকে এই ভূমিকা আমরা আশা করি।
ফরাসি বিপ্লবের পর প্রায় ৩০ বছর ‘রেইন অব টেরর’ বজায় থেকেছে। এই ৩০ বছরে অনেকেই ক্ষমতায় এসেছিল। তারা কেউ টিকে থাকতে পারেনি। সহিংস পন্থায় তাদের উৎখাত করা হয়েছে।
বারবার ক্ষমতার আসন শূন্য হয়েছে। নীতিহীনতা ও সহিংসতা চক্র বহুকাল কেউ ভাঙতে পারেনি। নেপোলিয়ন ক্ষমতা নেওয়ার পর এর অবসান ঘটে। আমাদের ‘রেইন অব টেরর’ শেষ হচ্ছে না। এটি বিগত সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে থেকেই ক্রিয়াশীল। দেশের জন্মলগ্ন থেকেই এটি চলছে। কোনো কোনো সময় এটি শিথিল হয়েছে; কিন্তু পুরোপুরি কখনও যায়নি। এই সময়কালে আমরা দেখতে পাই, দেশের স্বাধীনতার নায়করাও অল্পকাল ক্ষমতায় ছিল এবং তাদের বিরুদ্ধে নির্মম সহিংসতা সংঘটিত হয়েছে। চব্বিশের রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের পর আশাবাদী হয়ে ওঠা সংগত ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে খোলামেলা রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে, মৃত কিংবা অচেতন মানবদেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার দৃশ্য সাধারণ মানুষ অবলীলায় দেখছে ও চিত্রধারণ করে চলেছে, পত্রিকা অফিসে আগুন দেওয়া হচ্ছে– ভেতরে আটকে পড়া কর্মীদের আর্তনাদ, মতাদর্শিক বিরোধ জন্ম দিচ্ছে ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতার। অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে, কারখানা অচল, অসংখ্য শ্রমিক চাকরিচ্যুত, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্মারক ও ব্যক্তিত্বদের সম্মান রক্ষায় রাষ্ট্র ভূমিকাহীন এবং সিংহভাগ বুদ্ধিজীবীদের ভেতর বুদ্ধিবৃত্তিক পবিত্রতা আর অবশিষ্ট নেই। আমাদের আশাবাদ হুমকির মুখে।
একটা সময় ছিল শিল্পী-সাহিত্যিকদের ভেতর জীবনের অর্থহীনতার দর্শন অধিক গ্রহণযোগ্য ছিল। মনে করা হতো, জীবন অর্থহীন এবং এটি যাপন করার মানে নেই। মনে করা হতো, জীবনে বিবিধ নিষ্ঠুরতার চক্র ও অনিঃশেষ অসাম্যের বাইরে আর কী আছে? সব মিলিয়ে চরম নৈরাশ্যবাদ ছিল। বোদলেয়ারের লেখা বুদ্ধদেব বসুর হাতে অনূদিত হয়ে এ দেশে পঠিত হতে থাকলে এই নৈরাশ্যবাদ ছড়িয়ে পড়ে। তরুণদের ভেতর বুদ্ধদেব বসুর প্রভাব ছিল।
আমি মনে করি, এই নৈরাশ্যবাদের রাশ টেনে ধরেন যারা, তাদের ভেতর অন্যতম প্রধান আবু সয়ীদ আইয়ুব। আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ, পান্থজনের সখা, পথের শেষ কোথায়, পোয়েট্রি অ্যান্ড ট্রুথ প্রভৃতি গ্রন্থের লেখক আবু সয়ীদ আইয়ুব। তিনি নৈরাশ্যবাদ ও নেতিবাদের গ্রাস থেকে মানবপ্রজাতিকে রক্ষা করার আর মঙ্গলবোধ মর্তপ্রীতি ও সৃষ্টিশক্তির সাধনা করে গেছেন। আমি বিশ্বাস করি, আবু সয়ীদ আইয়ুবের রচনা যদি নবীন বুদ্ধিজীবীরা পাঠ করেন, সমৃদ্ধ হবেন। তাদের মনে নতুন আশার সঞ্চার হতে পারে।
আমিও বিশ্বাস করি, মানবজীবন অর্থহীন নয়। জীবনের সৎ ও বৃহৎ উদ্দেশ্য আছে। মানবতার অবমাননার কাল সাময়িক।
একটি সতর্কবাণী উচ্চারণ করতে পারি। মানুষ যেন যার যার মতাদর্শকে ধর্ম বানিয়ে না ফেলে। যখনই কোনো মতাদর্শের বহমানতা ও বিবর্তনকে অস্বীকার করা হবে, তখনই সহিংসতা, অশান্তি ও অসাম্যের জন্ম হবে। ধর্ম বানিয়ে ফেলার কারণে মার্কসবাদের মতো উৎকৃষ্ট মতবাদও অতীতে বিদেশে ও স্বদেশে অনেকাংশে ব্যর্থ হয়েছে। কোনো সামাজিক, সম্প্রদায়ভিত্তিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক গোষ্ঠী যদি নিজেদের মতাদর্শকে বহমানতা দান না করে, তাহলে ধীরে ধীরে তা পীড়নযন্ত্রে রূপ নিয়ে সেই মতাদর্শীদের সব অতীত ত্যাগ ও অবদান মিথ্যে করে দিয়ে ব্যর্থ হয়।
লেখকের শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁর অনুমোদনক্রমে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলাপের ভিত্তিতে অনুলিখিত। অনুলিখনে হামিম কামাল।
- বিষয় :
- আবুল কাসেম ফজলুল হক
