ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নতুন বছরে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা আরও কমলো

নতুন বছরে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা আরও কমলো
×

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৪৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

নতুন বছরের প্রথম দিন থেকে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার কমাল সরকার। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে কেনা সঞ্চয়পত্রে মেয়াদপূর্তিতে মুনাফা মিলবে প্রায় সাড়ে ১০ শতাংশ। এতদিন যা ১২ শতাংশের কাছাকাছি ছিল। আগামী ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) যারা কিনবেন, তাদের জন্য নতুন হার কার্যকর হবে। পুরোনো সঞ্চয়পত্রে আগের মতোই মুনাফা পাবেন গ্রাহকরা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এসব সিদ্ধান্ত জানিয়ে বৃহস্পতিবার একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমায় মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিশেষত অবসরে যাওয়া ব্যক্তিরা চাপে পড়বেন বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। 

গত বছরের জানুয়ারি থেকে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা হার সরকারি ট্রেজারি বন্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে। বর্তমানে দুই বছর এবং পাঁচ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের গড় সুদহার (সর্বশেষ ছয় মাসের নিলামের ভিত্তিতে) অনুয়ায়ী সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার নির্ধারিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার কমায় সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানো হয়েছে। ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন কেনা সঞ্চয়পত্রে নতুন এ হার কার্যকর হবে। এর আগে গত জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের জন্যও মুনাফার হার সামান্য কমেছিল।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত বছরের জানুয়ারিতে প্রথম সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার সরকারি ট্রেজারি বন্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে নির্ধারণ করা হয়। তখন এক থেকে দেড় শতাংশ বাড়ে। এর পর থেকেই প্রতি ছয় মাসের জন্য ট্রেজারি বন্ডের গড় সুদহারের ভিত্তিতে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা হার নির্ধারিত হয়ে আসছে। বর্তমানে ট্রেজারি বন্ডের সুদহার কম হওয়ায় সঞ্চয়পত্রের হারও কমেছে। 
বর্তমানে চার ধরনের সঞ্চয়পত্র এবং পোস্ট অফিস ফিক্সড ডিপোজিট নামে একটি সঞ্চয় স্কিম রয়েছে। প্রতি ক্ষেত্রে সাড়ে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে মুনাফার হার তুলনামূলক বেশি। একজন ব্যক্তির সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কেনার সুযোগ রয়েছে। সঞ্চয়পত্রের বাইরে ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক সাধারণ হিসাব এবং প্রবাসীদের জন্য তিন ধরনের বন্ডে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে মুনাফার হার অপরির্তিত রাখা হয়েছে।

নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী এখন থেকে কেনা পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে সাড়ে সাত লাখ টাকা বা এর কম বিনিয়োগকারীরা মেয়াদপূর্তিতে ১০ দশমিক ৪৪ শতাংশ হারে মুনাফা পাবেন। গত জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে যা ছিল ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এর বেশি অঙ্কের বিনিয়োগে মুনাফার হার ১০ দশমিক ৪১ শতাংশে নেমেছে; আগে যা ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ ছিল।
তিন বছর মেয়াদি তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে সাড়ে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে মুনাফার হার নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ দশমিক ৪৮ শতাংশ। আগে যা ছিল ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ। সাড়ে সাত লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মুনাফা পাওয়া যাবে ১০ দশমিক ৪৩ শতাংশ। আগে যা ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ ছিল।

পাঁচ বছর মেয়াদি পেনশনার সঞ্চয়পত্রে সাড়ে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ মুনাফার হার কমিয়ে ১০ দশমিক ৫৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। আগে যা ছিল ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ। আর সাড়ে সাত লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মুনাফা হবে ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ। আগে যা ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ ছিল। পাঁচ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্রে সাড়ে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ মুনাফা দেওয়া হবে ১০ দশমিক ৫৪ শতাংশ। আগে যা ছিল ১১ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এর বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফা হবে ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ। আগে যা ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ ছিল।

তিন বছর মেয়াদি পোস্ট অফিস ফিক্সড ডিপোজিট হিসাবের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে মুনাফা পাওয়া যাবে ১০ দশমিক ৪৮ শতাংশ। আগে যা ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ ছিল। এর বেশি বিনিয়োগে মুনাফা হবে ১০ দশমিক ৪৩ শতাংশ। আগে যা ছিল ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ। প্রতি ক্ষেত্রে মেয়াদপূর্তির আগে ভাঙানো হলে মুনাফা আরও কম পাওয়া যাবে।
সরকারের এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ ড. আনু মুহাম্মদ সমকালকে বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে থাকে। সরকারেরও দায়িত্ব নাগরিকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তাই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় সঞ্চয়পত্রে সুদহার কমানো উচিত নয়। তিনি আরও বলেন, অনেক দিন ধরে আইএমএফ সরকারের বাড়তি ব্যয়ের কথা উল্লেখ করে সঞ্চয়পত্রে সুদহার কমানোর কথা বলে আসছে। তবে আইএমএফের নীতিতে সাধারণ মানুষের স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয় না। সরকারকে সেই বিবেচনা করতে হয়। 

গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম সমকালকে বলেন, মধ্যবিত্তের পাশাপাশি ধনী ব্যক্তিরা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগও রয়েছে। স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য বিশেষ বিনিয়োগ খাত সঞ্চয়পত্রের মূল দর্শনে বিচ্যুতি ঘটেছে। তাই চিহ্নিত করে প্রাতিষ্ঠানিক ও ধনী ব্যক্তিদের এ খাত থেকে বাদ দিয়ে বিশেষ বিবেচনায় স্বল্প আয়ের মানুষদের জন্য সঞ্চয়পত্রে বাড়তি সুবিধা অব্যাহত রাখতে হবে।

আরও পড়ুন

×