এনএসইউ’র সমাবর্তন
ডিগ্রি নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব পালনের বার্তা
রাজধানীর বসুন্ধরায় এনএসইউ ক্যাম্পাসে সমাবর্তন
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৬:২৩ | আপডেট: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৬:৩২
শিক্ষা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের সিঁড়ি নয়; এটি গণতন্ত্র রক্ষা, ন্যায়বোধ গঠন এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ নাগরিক তৈরির অন্যতম প্রধান মাধ্যম। এমন গভীর ও স্পষ্ট বার্তা উঠে এসেছে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির (এনএসইউ) ২৬তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে। বুধবার রাজধানীর বসুন্ধরায় এনএসইউ ক্যাম্পাসে আয়োজিত এই সমাবর্তনে মোট ৩ হাজার ৩২২ জন শিক্ষার্থীকে ডিগ্রি প্রদান করা হয়। এর মধ্যে ২ হাজার ৬৪৬ জন স্নাতক এবং ৬৭৬ জন স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী। উৎসবের আবহে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান পরিণত হয় দায়িত্ব, নৈতিকতা ও নাগরিকতার গভীর অনুশীলনের এক প্রতীকী মুহূর্তে।
সমাবর্তনে কনভোকেশন চেয়ার হিসেবে বক্তব্য দেন শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার। তিনি বলেন, আজকের দিনটি শুধু ডিগ্রি অর্জনের নয়; তোমরা ভবিষ্যতে সমাজ ও রাষ্ট্রকে কী দেবে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশ ও দেশের বাইরে এনএসইউ আজ অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটরা বিশ্বের বড় বড় শহরে নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছে।
জুলাই ২০২৪: নৈতিক নেতৃত্বের পরীক্ষার সময়
বক্তব্যে অধ্যাপক আবরার ২০২৪ সালের জুলাই মাসের নির্দলীয় ছাত্র আন্দোলনের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করেছে। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা সেখানে সাহসী ও দৃশ্যমান ভূমিকা রেখেছে। সমাবর্তনে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয় ওই আন্দোলনে নিহত ও আহতদের। বিশেষভাবে স্মরণ করা হয় এনএসইউর শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আবিরকে, যিনি আন্দোলনের সময় প্রাণ হারান। শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, আমরা আহতদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই এবং শহীদদের আত্মত্যাগ গর্বের সঙ্গে স্মরণ করি। আবিরের মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়—গণতন্ত্রের মূল্য মানবিক ও বাস্তব।
ডিগ্রি নয়, দায়িত্ব
শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, যদি তোমার শিক্ষা কেবল তোমার ব্যক্তিগত উন্নয়নে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সেটি আসলে ব্যবহৃতই হয়নি। শিক্ষা তোমাকে সুযোগ দিয়েছে, কিন্তু সেই সুযোগ সমাজকে এগিয়ে নিতে ব্যবহার করাই আসল দায়িত্ব।
পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাজন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইতোমধ্যে তাদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, উচ্চ ব্যয়ের কারণে বহু মেধাবী শিক্ষার্থী এখনও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকে যাচ্ছে। প্রবেশাধিকার বাড়াতে পারলে সামগ্রিক মেধা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতাও বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
বৈশ্বিক নেতৃত্বে এনএসইউ গ্র্যাজুয়েটরা
সমাবর্তন বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ। তিনি বলেন, এনএসইউ গ্র্যাজুয়েটরা আজ ঢাকা থেকে সিঙ্গাপুর, লন্ডন থেকে টরন্টো পর্যন্ত নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁরা নীতি প্রণয়ন করছেন, গবেষণা করছেন, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত।
নিজের ছাত্রজীবনের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, আমি যখন তরুণ ছিলাম, হয়তো তোমাদের মতো মেধাবী ছিলাম না। কিন্তু তোমরা শুধু মেধাবী নও, তোমরা জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে নাগরিক সাহসের উদাহরণ সৃষ্টি করেছ।
শিক্ষাব্যবস্থার দায় ও আত্মসমালোচনা
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ইউজিসি সদস্য (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, শিক্ষা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের হাতিয়ার হলেও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনও বেকারত্ব, পরিবেশ ধ্বংস ও সামাজিক অবক্ষয়ের মতো মৌলিক সমস্যার সমাধানে ব্যর্থ হচ্ছে। তিনি বলেন, ১৯৭১ ও ২০২৪-এর আত্মত্যাগের পরও আমরা এই ব্যর্থতা মেনে নিতে পারি না।
স্বর্ণপদক ও আনুষ্ঠানিকতা
অনুষ্ঠানে স্নাতক পর্যায়ে চ্যান্সেলর’স গোল্ড মেডেল প্রদান করা হয়- মাহিরা ইসলাম আসফি (ব্যাচেলর অব ফার্মেসি) এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ে এমবিএ প্রোগ্রামের মেহরুব মোবিন ভূঁইয়াকে। ভাইস-চ্যান্সেলর’স গোল্ড মেডেল দেওয়া হয় বিভিন্ন প্রোগ্রামের আটজন শিক্ষার্থীকে।
দায়িত্বের পথে যাত্রা
সমাবর্তনের শেষাংশে বক্তারা গ্র্যাজুয়েটদের উদ্দেশে বলেন, ডিগ্রি তাঁদের সুযোগ দিয়েছে, আর শিক্ষা দিয়েছে দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব সততা, সাহস ও মানবিকতার সঙ্গে পালনের আহ্বান জানানো হয়। উৎসবের আমেজে অনুষ্ঠান শেষ হলেও বার্তাটি ছিল স্পষ্ট ও গভীর— ডিগ্রি অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব পালনের কঠিন কিন্তু অপরিহার্য যাত্রা।
- বিষয় :
- শিক্ষা
- গণতন্ত্র
- সমাজ
- নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
- সমাবর্তন
