ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সেমিনারে বক্তারা

নির্বাচন নিয়ে সংখ্যালঘুরা ভয় বৈষম্য ও অনিশ্চয়তায়

নির্বাচন নিয়ে সংখ্যালঘুরা ভয় বৈষম্য ও অনিশ্চয়তায়
×

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৫২ | আপডেট: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ | ১০:২১

| প্রিন্ট সংস্করণ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা, ভোটাধিকার, বিচারপ্রাপ্তি ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তারা বলেছেন, নির্বাচন এলেই সবার অধিকারের কথা বলা হয়, বাস্তবে সংখ্যালঘুরা ভয়, বৈষম্য ও অনিশ্চয়তার মধ্যেই বসবাস করছে। 

‘আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নির্বাচনী ভাবনা ও অংশগ্রহণ’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন বক্তারা। গতকাল শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে এ সেমিনারের আয়োজন করে ডেমোক্রেটিক বাংলাদেশ ও একতার বাংলাদেশ।

সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ডেমোক্রেটিক বাংলাদেশের তাজরিয়ান আকরাম হুসেইন। সভাপতিত্ব করেন একতার বাংলাদেশের আহ্বায়ক প্লাবন তারিক। বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন জাতীয় হিন্দু মহাজোটের সভাপতি অ্যাডভোকেট দীনবন্ধু রায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি অ্যান্ড বুড্ডিস্ট স্টাডিজের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শান্টু বড়ুয়া দত্ত, অতীশ দীপংকর মেমোরিয়াল কমপ্লেক্সের অধ্যক্ষ ভদন্ত করুণানন্দ থের, ফাদার লিন্টু ফ্রান্সিস ডি কস্তা, টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিহা তাবাসসুম, ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য সর্ব মিত্র চাকমা প্রমুখ। 

কি-নোট বক্তব্যে লেখক নেসার আমিন বলেন, দেশে বিনা বিচারে হত্যা, সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা ও দখলের ঘটনার পরও ভুক্তভোগীরা প্রকাশ্যে কথা বলতে পারছে না। রাস্তাঘাটে চলাচল করতেও ভয় কাজ করে। তাঁর মতে, মানসিক এই ভয়ের দেয়াল না ভাঙলে সমতার কথা বাস্তবে রূপ পাবে না। 

আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তারা বলেন, সংখ্যালঘুদের ওপর সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের ঘটনায় বিচার প্রায় অনুপস্থিত। দিপু দাস হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে বলা হয়, এমন ঘটনার পরও পর্যাপ্ত সামাজিক ও নাগরিক প্রতিবাদ দেখা যায় না। নির্বাচন এলে ভোটের কথা বলা হলেও নির্বাচন শেষে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়ে।

অ্যাডভোকেট দীনবন্ধু রায় বলেন, নির্বাচন আসার আগে ও পরে সংখ্যালঘুদের ভয়ের মধ্যে থাকতে হয়। বিচারব্যবস্থায় সংখ্যালঘুদের ন্যায্যতা নিশ্চিত হচ্ছে না। হিন্দু পুরোহিতদের মাসিক ভাতা মাত্র ৬০০ টাকা, যা রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের স্পষ্ট উদাহরণ। বরাদ্দ কম, অথচ মুখে মুখে সমতার কথা বলা হয়। হিন্দুদের ওপর সংঘটিত অন্যায়ের বিচার নিশ্চিত হয় না বললেই চলে।

তিনি বলেন, সরকারি চাকরি কমিশন, উচ্চ আদালতসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে সংখ্যালঘুদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। এতে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের কণ্ঠ প্রতিফলিত হয় না। হিংসা দিয়ে দেশের কল্যাণ সম্ভব নয়। সংখ্যালঘুদের দখল হওয়া জমি ফেরত দেওয়া, নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনের আগে ও পরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হতে পারে আস্থার প্রথম ধাপ।

শান্টু বড়ুয়া বলেন, বড়ুয়ারা সংখ্যায় কম। বৌদ্ধ হলেও তাদের প্রতিযোগিতা করতে হয় সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের সঙ্গে। তাদের সাম্যতার জন্য বিশেষ সুযোগ দরকার। নির্বাচন এলে ভয়ে থাকতে হয়। সংখ্যালঘু মেয়েরা বেশি বিপদে আছে। তারা দেশে নিরাপদ বোধ করছে না। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন দরকার।

তাজরিয়ান আকরাম বলেন, ভোটার হিসেবে সংখ্যালঘুদের অধিকার যথাযথভাবে নিশ্চিত করা জরুরি। নির্বাচন শুধু একটি দিনের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িত আছে নিরাপত্তা, বিচার ও মর্যাদার প্রশ্ন। ভোটের মাধ্যমেই একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হতে পারে– তবে সেই ভোট হতে হবে ভয়মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। 

তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর যে বাংলাদেশ প্রত্যাশা করা হয়েছিল, বাস্তবে তা পাওয়া যায়নি। সংসদে সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব ক্রমেই কমছে। গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তগুলো গণতান্ত্রিক আলোচনা ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে নেওয়া হচ্ছে না।

গত ৬ জানুয়ারি বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ এক বিবৃতিতে জানায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্ভয়ে, নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়া নিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় শঙ্কিত হয়ে পড়েছে। বিবৃতিতে সংগঠনটি জানায়, সংসদ নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই সাম্প্রদায়িক সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। এসব ঘটনায় সারাদেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী ভবিষ্যতের অজানা আশঙ্কায় ভীত হয়ে পড়েছে। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের দাবি, গত বছরের ডিসেম্বর মাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর কমপক্ষে ৫১টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে হত্যা ১০টি, চুরি ও ডাকাতি ১০টি, বাড়িঘর-ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান-মন্দির ও জমিজমা দখল, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ ২৩টি।

আরও পড়ুন

×