ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

উপদেষ্টাদের কার কত সম্পদ

উপদেষ্টাদের কার কত সম্পদ
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১২ | আপডেট: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৩৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের এক বছরে সম্পদ বেড়েছে এক কোটি ৬১ লাখ চার হাজার ৩৯২ টাকা। সঞ্চয়পত্র নগদায়ন, সঞ্চয়ী বা মেয়াদি আমানত বৃদ্ধি, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া শেয়ার ইত্যাদি কারণে এই সম্পদ বেড়েছে বলে জানা গেছে।

গতকাল মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করা হয়। এতে ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা এবং তাদের স্ত্রী-স্বামীর ২০২৪ সালের ৩০ জুন ও ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সম্পদের বিবরণী তুলে ধরা হয়।

গত ৩০ জুন পর্যন্ত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মোট পরিসম্পদ ছিল ১৫ কোটি ৬২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৫ টাকার। এক বছর আগে তা ছিল ১৪ কোটি এক লাখ ৩৯ হাজার ৬৭৩ টাকা। এর মধ্যে বিদেশে তাঁর সম্পদ আছে ৬৪ লাখ ৭৩ হাজার ৪১৪ টাকা। প্রধান উপদেষ্টার স্ত্রী আফরোজী ইউনূসের মোট পরিসম্পদ এক কোটি ২৭ লাখ ৬৩ হাজার ৩৬০ টাকা, যা আগের অর্থবছরে ছিল দুই কোটি ১১ লাখ ৭৭ হাজার ২৭৪ টাকা। সে হিসাবে এক বছরে তাঁর সম্পদ কমেছে ৮৪ লাখ ১৩ হাজার ৯১৪ টাকা। 
আয়কর আইন অনুযায়ী, একজন করদাতার মালিকানাধীন স্থাবর-অস্থাবর, আর্থিক ও মূলধনি সম্পত্তির সমষ্টি হলো পরিসম্পদ।

সম্পদ বেড়েছে দুই উপদেষ্টার
গত ৩০ জুন পর্যন্ত গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমানের মোট পরিসম্পদ ছিল দুই কোটি ৫২ লাখ ৯৯ হাজার ২৬৯ টাকা। এক বছর আগে তা ছিল ৯৮ লাখ ২২ হাজার ৭ টাকা। এক বছরে সম্পদ বেড়েছে এক কোটি ৫৪ লাখ ৭৭ হাজার ২৬২ টাকা। উত্তরাধিকারসূত্রে গৃহ সম্পত্তি ও কৃষি সম্পত্তি প্রাপ্ত হওয়ায় তাঁর নন-ফাইন্যান্সিয়াল সম্পদ বেড়েছে।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের গত ৩০ জুন পর্যন্ত মোট পরিসম্পদ ছিল ১৬ কোটি ২২ লাখ ৯৫ হাজার ৪৮৩ টাকার। এক বছর আগে তা ছিল ১৫ কোটি ৯ লাখ ১৩ হাজার ১০২ টাকা। এক বছরে তাঁর সম্পদ বেড়েছে এক কোটি ১৩ লাখ ৮২ হাজার ৩৮১ টাকা। ব্যাংক আমানত থেকে পাওয়া মুনাফা, ডেভেলপার কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি থেকে আয়ের কারণে মোট সম্পদের পরিবৃদ্ধি হয়েছে। 
গত ৩০ জুন পর্যন্ত শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরারের মোট পরিসম্পদের পরিমাণ সাত কোটি ৫৭ লাখ ৪৩ হাজার ৪২২ টাকা। উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দিয়েছেন ২০২৫ সালের ৫ মার্চ। ২০২৪ সালের ৩০ জুন অধ্যাপক আবরারের মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল সাত কোটি দুই লাখ এক হাজার ১৬৮ টাকা। সে হিসাবে শিক্ষা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর সম্পদ বেড়েছে ৫৫ লাখ ৪২ হাজার ২৫৪ টাকা।

সম্পদ বেশি বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনের
গত ৩০ জুন পর্যন্ত বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনের মোট পরিসম্পদ ছিল ৯১ কোটি ৬৫ লাখ ১০ হাজার ৮৯৫ টাকা। এক বছর আগে তা ছিল ৯১ কোটি ১০ লাখ ৯৮ হাজার ৮৪২ টাকা। তাঁর স্ত্রী ইফসিয়া মাহিনের মোট পরিসম্পদ আছে দুই কোটি ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৪৩০ টাকা। 

কম সম্পদ মাহফুজ আলমের  
সবচেয়ে কম সম্পদ দেখানো হয়েছে সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের। গত ৩০ জুন পর্যন্ত তাঁর সম্পদ ছিল ১২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৭৯ টাকা। এক বছর আগে তা ছিল চার লাখ ২০ হাজার টাকা। সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার গত ৩০ জুন পর্যন্ত সম্পদ দেখানো হয়েছে ১৫ লাখ ৩৪ হাজার ৭১৭ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তিনি আয়করে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। 

বিদেশে সম্পদ বেশি খলিলুর রহমানের    
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা সমস্যাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেনটেটিভ ড. খলিলুর রহমান ও তাঁর স্ত্রীর সম্পদের হিসাব একত্রে দাখিল করা হয়েছে। তাদের দুজনের মোট পরিসম্পদ ৪৬ লাখ ৩৫ হাজার ৮৫০ মার্কিন ডলার। বিদেশে অবস্থিত পরিসম্পদ, ইমারত, ফ্ল্যাট ও অন্যান্য অস্থাবর সম্পদ রয়েছে তাদের।  

অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের গত ৩০ জুন পর্যন্ত মোট পরিসম্পদ ছিল সাত কোটি ১৬ লাখ ১৫ হাজার ২৬ টাকার। এক বছর আগে তা ছিল সাত কোটি ১০ লাখ ৪৯ হাজার ৭১৮ টাকা। 
গত ৩০ জুন পর্যন্ত আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের মোট পরিসম্পদ ছিল এক কোটি ৬০ লাখ ৯৮ হাজার ৬১৩ টাকার। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের মোট পরিসম্পদ দুই কোটি ৯৩ লাখ ১১ হাজার ১৫৮ টাকার, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলমের দুই কোটি ৭৭ লাখ ২০ হাজার ৭৭৪ টাকার, আলী ইমাম মজুমদারের তিন কোটি ৮৮ লাখ ৯৭ হাজার টাকার, মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের ছয় কোটি ৭২ লাখ ৫৫ হাজার টাকার, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের এক কোটি ১২ লাখ ৭২ হাজার টাকার এবং ফারুক-ই-আজমের দুই কোটি দুই লাখ আট হাজার টাকার।
নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনের মোট সম্পদ ৩ কোটি ৫১ লাখের বেশি, যা আগের বছর ছিল ৩ কোটি ২৪ লাখ টাকার বেশি। 
স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের মোট সম্পদ ৬ কোটি ২৪ লাখ টাকার বেশি। আগের বছর ছিল ৬ কোটি ২০ লাখ টাকার বেশি। 

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দারের মোট সম্পদ ৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকার বেশি। আগের বছর ছিল ৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকার বেশি। 
২০২৪ সালে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতারের মোট সম্পদ ছিল ৮১ লাখ ২৮ হাজার ৯২৯ টাকার, যা বেড়ে ২০২৫ সালে হয়েছে ১ কোটি ২ লাখ ২৫ হাজার ৬০ টাকা। তাঁর কোনো ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক দায় নেই। 

২০২৪ সালে সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদের মোট সম্পদ ছিল ১০ কোটি ৬৫ লাখ ৯ হাজার ২৭৬ টাকার, যা ২০২৫ সালে এসে ১০ কোটি ৯৩ লাখ ৬৪ হাজার ৭১৯ টাকা হয়েছে। এক বছরে তাঁর ব্যক্তিগত দায় ২ কোটি ৮৬ লাখ ৪৯ হাজার ২০২ টাকা থেকে কমে ১ কোটি ৯১ লাখ ৩৭ হাজার ৯২৯ টাকায় নেমে এসেছে। 

ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেনের মোট সম্পদ ছিল ৮৮ লাখ ১৫ হাজার ৭৭৪ টাকার, যা ২০২৫ সালে ১ কোটি ১৩ লাখ ৯২ হাজার ১০২ টাকা হয়েছে। তাঁর কোনো আর্থিক দায় নেই। 
২০২৪ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমার মোট সম্পদ ১ কোটি ২৬ লাখ ৩৩ হাজার ১৪১ টাকা থাকলেও ২০২৫ সালে তা কমে ১ কোটি ৯ লাখ ৯৮ হাজার ৭৯৬ টাকায় দাঁড়িয়েছে। 
সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর আগের বছর মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকার, যা ২০২৫ সালে হয় ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকা। 

বিশেষ সহকারীদের সম্পদ
উপদেষ্টার পদমর্যাদায় নিয়োগ পাওয়া প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী জেনারেল (অব.) আবদুল হাফিজের মোট সম্পদ ২০২৪ সালে ছিল ১২ কোটি ৭২ লাখ ৮৭ হাজার ৭১১ টাকার, যা বেড়ে ১৩ কোটি ৫৭ লাখ ৪৯ হাজার ৫৩৯ টাকা হয়েছে। 
অধ্যাপক আলী রীয়াজ গত বছরের ১৩ নভেম্বর উপদেষ্টার পদমর্যাদায় যোগ দিয়েছেন। ফলে তাঁর তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। আরেক উপদেষ্টা লুৎফে সিদ্দিকী সরকারি সুবিধা গ্রহণ করেন না। তাঁর সম্পদের তথ্যও উল্লেখ করা হয়নি।

২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থানের কথা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেছিলেন, সব উপদেষ্টা দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করবেন। পর্যায়ক্রমে এটি সরকারি সব কর্মকর্তার ক্ষেত্রেও নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক করা হবে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদে প্রতিশ্রুত ন্যায়পাল নিয়োগে অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হবে বলেও তিনি ভাষণে উল্লেখ করেছিলেন।

ওই বছরের ১ অক্টোবর ‘অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের আয় ও সম্পদ বিবরণী প্রকাশের নীতিমালা, ২০২৪’ জারি করা হয়। নীতিমালায় বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি, যারা সরকার বা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত, তারা প্রতিবছর আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সর্বশেষ তারিখের পরবর্তী ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের আয় ও সম্পদের বিবরণী জমা দেবেন। স্ত্রী বা স্বামীর আলাদা আয় থাকলে সেটিও জমা দিতে হবে। এই বিবরণী প্রধান উপদেষ্টা নিজ বিবেচনায় উপযুক্ত পদ্ধতিতে প্রকাশ করবেন। কিন্তু এতদিনেও তা প্রকাশ না করায় সমালোচনা চলছিল। এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম গত সোমবার জানিয়েছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদের বিবরণী দু-এক দিনের মধ্যে প্রকাশ করা হবে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। পরে কয়েক দফায় নতুন উপদেষ্টা নিয়োগ দেওয়া হয়। সংযোজন-বিয়োজনের পর বর্তমানে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সংখ্যা প্রধান উপদেষ্টাসহ ২১। এ ছাড়া উপদেষ্টা পদমর্যাদায় বিশেষ সহকারী, বিশেষ দূত ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা চারজন। প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধান উপদেষ্টার চার বিশেষ সহকারী দায়িত্ব পালন করছেন।

 

আরও পড়ুন

×