ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকাল এক্সপ্লেইনার

ছায়া মন্ত্রিসভা কী, কেন ‘বিকল্প সরকার’ বলা হয়

সরকারের মন্ত্রিসভার বিপরীতে বিরোধী দল অনেক সময় ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ গঠন করে।

ছায়া মন্ত্রিসভা কী, কেন ‘বিকল্প সরকার’ বলা হয়
×

রোববার ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের কথা বলেছেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। ছবি: এএফপি/ ইলাস্ট্রেশন: সমকাল

সাদিকুর রহমান

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৯:০৫ | আপডেট: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৫:০৫

নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের সম্ভাব্য মন্ত্রিসভা নিয়ে নানা আলোচনাও চলছে। এর মধ্যেই নির্বাচনে ৬টি আসন পাওয়া দল এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া বলেছেন, তারা ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ বা  ‘শ্যাডো ক্যাবিনেট’ গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

আসিফ মাহমুদ কিছুদিন আগেও অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার, যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা ছিলেন। রোববার তিনি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং সার্বিক কার্যক্রমে ওয়াচডগ হিসেবে কাজ করবে ছায়া মন্ত্রিসভা।’

সাবেক এই উপদেষ্টা তাঁর পোস্টে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের বিস্তারিত উল্লেখ করেননি। তবে তাঁর পোস্টের কমেন্টে অনেকেই বিষয়টির নানাভাবে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। আসলেই ছায়া মন্ত্রিসভা কী, কারা থাকেন এবং সরকারের মন্ত্রিসভার বিপরীতে কীভাবে কাজ করে- অন্যান্য দেশের উদাহরণের আলোকে সেটির একটি ব্যাখ্যা দেওয়া যাক।

ছায়া মন্ত্রিসভা কী
যে দেশটির ছায়া মন্ত্রিসভা নিয়ে বেশি আলোচনা হয় সেটি হলো- যুক্তরাজ্য। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ওয়েবসাইটে এর একটি ধারণা দেওয়া হয়েছে। ছায়া মন্ত্রিসভা হলো- প্রধান বিরোধীদলীয় নেতার দ্বারা মনোনীত জ্যেষ্ঠ মুখপাত্রদের একটি দল। যেটি সরকারের মূল মন্ত্রিসভার ‘আয়না’ হিসেবে কাজ করে। 

ছায়া মন্ত্রিসভার প্রতিটি সদস্যকে তাদের দলের পক্ষ থেকে একটি নির্দিষ্ট নীতি বা বিষয়ের (যেমন; অর্থ, স্বাস্থ্য বা পররাষ্ট্র) দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কাজগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনে প্রশ্ন বা চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। এভাবে সংসদীয় বিরোধী দল নিজেদের একটি বিকল্প সরকার হিসেবে জনগণের সামনে উপস্থাপনের চেষ্টা চালায়।

আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার ফেসবুক পোস্ট। স্ক্রিনশট

বিষয়টি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যাক। নির্বাচনে এনসিপি ছিল জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সঙ্গী। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭৭টি আসন জেতায় এই জোট সংসদের প্রধান বিরোধী দল হবে। এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপি যদি মন্ত্রিসভায় ‘ক’ নামের কাউকে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়, তাহলে প্রধান বিরোধী দল বা জোট নিজেদের কোনো জ্যেষ্ঠ নেতাকে ছায়া অর্থমন্ত্রী বানাবে। 

এনসিপি এককভাবে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করবে নাকি জোটের সঙ্গে মিলে- আসিফ মাহমুদের পোস্টে বিষয়টি স্পষ্ট নয়। তিনি লিখেছেন, ‘আমরা ছায়া মন্ত্রীসভা গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছি।’ (বানান অপরিবর্তিত)। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে রোববার বিকেলে মোবাইল ফোনে আসিফ মাহমুদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে সমকাল। তবে তিনি কল ধরেননি। দলটির পক্ষ থেকে মন্তব্য জানতে মিডিয়া সেলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তাৎক্ষণিক সাড়া পাওয়া যায়নি।

ছায়া মন্ত্রিসভায় কারা থাকেন, কী কাজ
যুক্তরাজ্যের সরকারনীতি বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট ফর গভর্নমেন্ট (আইএফজি)’। তাদের একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে, সরকারের মন্ত্রিসভার প্রতিটি পদের বিপরীতেই ছায়া মন্ত্রী থাকেন না। 

অর্থ্যাৎ, বিএনপি যদি ৩০ জনের মন্ত্রিসভা গঠন করে, বিরোধী দলও একই সংখ্যক ছায়া মন্ত্রী বানাবে বিষয়টা এমন নয়। আইএফজি বলছে, অনেক সময় বিরোধী দল কোনো নির্দিষ্ট নীতি বা বিষয়ের জন্য ছায়া মন্ত্রী নিয়োগ করে। 

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে ‘শ্যাডো মিনিস্টার’ ছিলেন কিয়ার স্টারমার। ছবি: লেবার পার্টির সৌজন্যে

অর্থ্যাৎ, বিরোধী দল যে খাতকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে সেটিতে ছায়া মন্ত্রী রাখে। এতে দুটি বিষয় বোঝা যায়; প্রথমত, বিরোধীদলের আগ্রহের ক্ষেত্র। দ্বিতীয়ত, চ্যালেঞ্জের মুখে সরকারের দুর্বলতা ও বিরোধীদের সক্ষমতা।

ধরুন, বিএনপি ‘খ’ নামের কাউকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বানিয়েছে। সংসদের বিরোধী দল পররাষ্ট্রনীতিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করলে, তারাও একজন ছায়া মন্ত্রী নিয়োগ দেবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রধানত সরকারিভাবে বিদেশ নীতি নির্ধারণ, বাস্তবায়ন, কূটনৈতিক আলোচনা, বৈঠক, আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষর, জাতিসংঘ কিংবা অন্যান্য ফোরামে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে।

ধরা যাক, সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইউক্রেন যুদ্ধে সামরিক বা মানবিক সহায়তা ঘোষণা করছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেই নীতি ঘোষণা করবেন, আন্তর্জাতিক সমন্বয় করবেন, বাজেট অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় অংশ নেবেন।

বিপরীতে, বিরোধী দলের ছায়া মন্ত্রী এই নীতির সমালোচনা, বিকল্প নীতি প্রস্তাব করা, সংসদে প্রশ্ন তোলা, কৌশলগত ভুলের বিষয়গুলো যুক্তি দিয়ে স্পষ্ট করবেন।

ভবিষ্যতে সরকার পরিবর্তন হয়ে বিরোধী দল ক্ষমতায় গেলে, সাধারণত এই ছায়া মন্ত্রীরাই নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় জায়গা পান। যেমন, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে বিরোধী দল ছিল লেবার পার্টি। তখন কিয়ার স্টারমার একটি ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করেছিলেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে লেবার পার্টি জিতলে তাদের ছায়া মন্ত্রিসভার সদস্যরা পরে নিজ নিজ দায়িত্বে বহাল থাকেন। স্টারমার প্রধানমন্ত্রী হন।

বাংলাদেশের সংবিধানে কী আছে?
যুক্তরাজ্যের ছায়া মন্ত্রিসভা কোনো সাংবিধানিক বিষয় নয়। এটি বহু বছর ধরে চলে আসা একটি প্রথা। বাংলাদেশের সংবিধানের চতুর্থ ভাগের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা সংক্রান্ত বিষয়ের বর্ণনা আছে। তাতে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। 

দেশের রাজনীতিতে বিরোধী দলকে সাধারণত সংসদে বিভিন্ন বিলের বিরোধীতা করতে দেখা যায়। এ ছাড়া, সরকারের গৃহীত কোনো পদক্ষেপের বিরুদ্ধেও রাজপথে আন্দোলন হয়। কোনো নীতির সমালোচনায় তথ্যভিত্তিক যুক্তি তুলে ধরার প্রবণতা কমই দেখা গেছে। রাজনৈতিকভাবে যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি উন্নত দেশে ছায়া মন্ত্রিসভা আছে। সেখানে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা হয়। বাংলাদেশেও কোনো দল এমন উদ্যোগ নিলে ও তা কার্যকর রাখলে; সরকারের জবাবদিহিতা অনেকাংশে নিশ্চিত হতে পারে।

আরও পড়ুন

×