ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অমর একুশে আজ

আমি কি ভুলিতে পারি

আমি কি ভুলিতে পারি
×

ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সাজানো হয়েছে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। আশপাশের সড়কজুড়ে আলপনা আঁকেন শিক্ষার্থীরা। গতকাল বিকেলে তোলা -সমকাল

 সমকাল প্রতিবেদক 

প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৯:০৩ | আপডেট: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১০:২০

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘পাহাড়তলীর মরণ চূড়ায়/ঝাঁপ দিল যে অগ্নি,/ফেব্রুয়ারির শোকের বসন/পরলো তারই ভগ্নী।/প্রভাতফেরী, প্রভাতফেরী/ আমায় নেবে সঙ্গে,/ বাংলা আমার বচন, আমি/ জন্মেছি এই বঙ্গে। 
‘একুশের কবিতা’য় এভাবেই অমর একুশে ফেব্রুয়ারিকে তুলে ধরেছেন কবি আল মাহমুদ। কবিতার এই পঙ্‌ক্তিতে বর্ণিত প্রভাতফেরিতে শহীদদের প্রতি প্রাণের অর্ঘ্য নিবেদনের দিন আজ শনিবার। অগ্নিঝরা রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলনের স্মারক মহান শহীদ দিবস। একই সঙ্গে দিনটি আজ সারাবিশ্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবেও পালিত হবে। 

আজকের দিনটি বাঙালির ভাষা আন্দোলনসহ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অনন্য গৌরবের দিন। স্বজন হারানোর বেদনা-দীর্ণ শোকের দিন। পৃথিবীর ইতিহাসে মাতৃভাষার জন্য রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেওয়ার প্রথম নজির। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির রক্তস্নাত সেই ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশের সংগ্রামের সূচনা ঘটে। কালক্রমে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় পথ বেয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে তা চূড়ান্ত পরিণতি পায়। তাই কেবল মুক্তিযুদ্ধ নয়, পরবর্তী সব গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামেও একুশের চেতনা আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালিয়েছে। 

এবারের মহান শহীদ দিবস পালিত হবে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের দেড় বছর পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনের পর বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন একটি রাজনৈতিক সরকারের ক্ষমতায়ন ঘটেছে। এর মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্র ও মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা পাবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন একুশে ফেব্রুয়ারি ও এর চেতনা এবার আরও সমুজ্জ্বল, আরও প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে ফিরে এসেছে।       

একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির জাতীয় চেতনার সংগ্রামের উন্মেষের দিন হিসেবে স্বীকৃত। যার সূচনা ঘটে ১৯৪৮ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে সংগ্রামের সূচনার মধ্য দিয়ে। সে বছর বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত হয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। পরবর্তী চার বছরের দুর্বার ও অদম্য সেই সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রক্তের আখরে। 

সেদিন বিকেল সাড়ে ৩টায় অনুষ্ঠেয় প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশনকে ঘিরে সকাল থেকে উত্তাল ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। রাষ্ট্রভাষার দাবিতে প্রাদেশিক পরিষদ ভবনের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় জড় হন ছাত্ররা। তারা সমবেত হন মেডিকেল কলেজ হোস্টেল গেটের সামনেও। আর ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ ঠেকাতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ১৪৪ ধারা জারি করে। 

তবে একুশের সেই সকালে আমতলার সভা থেকে ডাক আসামাত্র ১৪৪ ধারা ভাঙতে একের পর এক ছাত্রদের ১০ জনের মিছিল বের হতে থাকে বিশ্ববিদ্যালয় গেট থেকে। পুলিশ বাধা দিতে শুরু হয় ছাত্র-জনতার সঙ্গে রক্তাক্ত সংঘর্ষ। একপর্যায়ে পুলিশ হঠাৎ মেডিকেল হোস্টেল গেটের সামনে ও বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠে জড়ো হওয়া ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালায়। এতে ঘটনাস্থলে শহীদ হন আবুল বরকত, রফিকউদ্দিন আহমদ ও আবদুল জব্বার। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে শহীদ হন সফিউর রহমান, রিকশাচালক আবদুল আউয়াল ও অহিউল্লাহসহ বেশ কয়েকজন অজ্ঞাত পরিচয় মানুষ। এ ছাড়া ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত আবদুস সালাম মারা যান ৭ এপ্রিল। সেই থেকে একুশে ফেব্রুয়ারির দিনটি মহান শহীদ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। 

এদিকে ভাষার জন্য রাজপথের এই আত্মবলিদান গোটা দেশেই দাবানলের মতো আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। গণআন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানি সামরিক শাসকরা নতিস্বীকারে বাধ্য হয়। ওই বছরের ২৯ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি গণপরিষদ গৃহীত সংবিধানের মাধ্যমে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে বাঙালির আন্দোলনের বিজয় সাধিত হয়।  

আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বীজ বপনও হয়েছিল বায়ান্নর আত্মত্যাগের মধ্যেই। একুশের এই চেতনা তৎকালীন পাকিস্তানে বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের ঐতিহাসিক নির্বাচন এবং সবশেষে ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে বাঙালিকে দুর্জয় সাহস জুগিয়েছিল। ‘একুশ মানে মাথানত না করা’– চিরকালের এই স্লোগান তাই আজও সমহিমায় সমুজ্জ্বল। একুশ মানে জুলুম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, যাবতীয় পশ্চাৎপদতা, তুচ্ছতা, গোঁড়ামি আর সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে শুভবোধের অঙ্গীকার।

ভাষার জন্য বাঙালির বিরল এ আত্মত্যাগ আজ কেবল এই ভূখণ্ডের সীমানায়ই আবদ্ধ নয়। বিশ্বের সব জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার সংগ্রামেও এক অভূতপূর্ব প্রেরণা। কালের পরিক্রমায় ২১ ফেব্রুয়ারি তাই আন্তর্জাতিক মর্যাদায় মহীয়ান হয়েছে। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা (ইউনেস্কো) ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর তাদের ২০তম সম্মেলনে ২৮টি দেশের সমর্থনে দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। যা ২০০০ সাল থেকে বিশ্বের ১৮৮টিরও বেশি দেশে একযোগে পালিত হচ্ছে। 
মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণীতে ভাষার জন্য বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। 
রাষ্ট্রপতি বলেন, ভাষা একটি জাতির অস্তিত্ব, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রধান ধারক ও বাহক। অনেক ত্যাগ ও শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলা ভাষার যথাযথ চর্চা ও মান সংরক্ষণে তাই আমাদের আরও যত্নবান হতে হবে।

বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, জনগণের অধিকার ও সমতা প্রতিষ্ঠাই ছিল একুশের মূল চেতনা। এ চেতনাকে ধারণ করে দীর্ঘ লড়াই সংগ্রাম পার হয়ে দেশে আজ গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গণতন্ত্রের এই অগ্রযাত্রাকে সুসংহত করতে বর্তমান সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

দেশে আজ সরকারি ছুটি। বাংলাদেশ ও সারাবিশ্ব আজ মৃত্যুঞ্জয়ী বীর ভাষাশহীদদের প্রতি জানাবে তাদের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা। একুশের প্রথম প্রহর তথা গতকাল শুক্রবার মধ্যরাত ১২টা ১ মিনিটে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে শহীদ দিবসের কর্মসূচি। 

আজকের কর্মসূচি
ভাষাশহীদদের স্মরণে আজ ভোরে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত ও কালো পতাকা উত্তোলন করা হবে। এদিন বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারসহ সব বেসরকারি টেলিভিশন ও রেডিও  বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার এবং সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র ও নিবন্ধ প্রকাশ করবে। ভাষাশহীদদের আত্মার শান্তি কামনায় বাদ আসর দেশের সব মসজিদে এবং সুবিধাজনক সময়ে অন্য ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে বিশেষ মোনাজাত বা প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে।  
ভোর থেকেই ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক দল ও সংগঠন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার অভিমুখে মৌন মিছিল ও প্রভাতফেরি করবে। সারাদেশের শহীদ মিনারসহ নিভৃত গ্রামগঞ্জে প্রাণের অর্ঘ্যে গড়ে তোলা মিনার ও স্মৃতিস্তম্ভও সাজবে ফুলে ফুলে। বিশ্বের নানা ভাষা, নানা বর্ণ ও নানা সংস্কৃতির মানুষের কণ্ঠেও উচ্চারিত হবে অমর একুশের কালজয়ী গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো, একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি...’। 

 

আরও পড়ুন

×