ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিশ্লেষণ

ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতার আয়না মশা

নিয়ন্ত্রণহীন কিউলেক্স, ফিরছে এডিস

ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতার আয়না মশা
×

কবিরুল বাশার

অধ্যাপক কবিরুল বাশার

প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকায় মশার সমস্যা কেবল অস্বস্তি বা দৈনন্দিন বিরক্তির বিষয় নয়; এটি এখন জনস্বাস্থ্য, নগর ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার একটি জটিল পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক মশা সার্ভিলেন্স তথ্য পরিস্থিতির গভীরতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে। 

রাজধানীতে কিউলেক্স মশার আধিক্য প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। অন্যদিকে এডিস মশার ঘনত্বও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ঈদুল ফিতরের আগের বৃষ্টিপাতের ফলে বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় পানির আধার তৈরি হওয়ায় এডিসের প্রজনন আরও ত্বরান্বিত হয়েছে।

মার্চের শেষ সপ্তাহের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় সংগৃহীত প্রাপ্তবয়স্ক মশার প্রায় ৮৮ শতাংশই কিউলেক্স প্রজাতির। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার সরাসরি প্রতিফলন। অপরিচ্ছন্ন ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, জলাবদ্ধ বেজমেন্ট এবং আবর্জনায় ভরা পরিবেশ– সব মিলিয়ে শহরটি কিউলেক্সের জন্য একটি আদর্শ প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

সমাজে একটি ভ্রান্ত ধারণা আছে, কিউলেক্স মশা তেমন কোনো মারাত্মক রোগ বহন করে না। বাস্তবে কিউলেক্সই ফাইলেরিয়া রোগের প্রধান বাহক, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব শারীরিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুতর। পাশাপাশি এর অতিরিক্ত উপস্থিতি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে– রাতের ঘুম নষ্ট হয়, শিশু ও বয়স্করা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এমনকি হাসপাতালেও রোগীরা মশার উৎপাত থেকে রেহাই পান না। ফলে এটি শুধু স্বাস্থ্য নয়, মানসিক চাপ ও উৎপাদনশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

অন্যদিকে, এডিস মশার ঘনত্বও দ্রুত বাড়ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা তথ্য অনুযায়ী, মার্চের প্রথম সপ্তাহের তুলনায় এডিস মশার ঘনত্বও এর ব্রুটো ইনডেক্স প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এটি নির্দেশ করে, নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতা, জনসচেতনতার ঘাটতি এবং মৌসুমি পরিবর্তন একসঙ্গে কাজ করছে। নগরের ছাদ, বেজমেন্ট, নির্মাণাধীন ভবন, পানির ট্যাঙ্ক ও প্লাস্টিকের পাত্র– সব জায়গাতে এডিসের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। বর্ষা মৌসুম শুরু হলে সামান্য অবহেলায় পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

কিউলেক্স নিয়ন্ত্রণের মূল চ্যালেঞ্জ নগর অবকাঠামোর দুর্বলতা। ড্রেনেজ ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যত অসম্ভব। অনেক ড্রেন দীর্ঘদিন পরিষ্কার না হওয়ায় সেখানে পানি ও জৈব বর্জ্য জমে থাকে, যা মশার প্রজননের আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। সাময়িক পরিষ্কার বা কীটনাশক প্রয়োগ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়; বরং প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কার্যকর পানি প্রবাহ নিশ্চিতকরণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ। বেজমেন্ট ও পার্কিং এলাকায় জমে থাকা পানিও এডিস বিস্তারের একটি বড় উৎস।

আধুনিক নগরায়ণের সঙ্গে বহুতল ভবনের সংখ্যা বাড়লেও এসব স্থানে কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ঘাটতি স্পষ্ট। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে তা সহজেই মশার প্রজননস্থলে পরিণত হয়। তাই নতুন ও পুরোনো উভয় ধরনের ভবনের ক্ষেত্রেই এই বিষয়টি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে হবে এবং প্রয়োজনে জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

এ ছাড়া নগরের লেক, খাল ও জলাশয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে কিউলেক্স প্রজননে। অপরিচ্ছন্ন ও বর্জ্যে ভরা এসব জলাশয়ে নির্বিচারে কীটনাশক প্রয়োগ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এবং দীর্ঘমেয়াদে অকার্যকর। এর পরিবর্তে নিয়মিত পরিষ্কার এবং পরিবেশবান্ধব লার্ভা নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করা প্রয়োজন, যাতে প্রতিবেশ ব্যবস্থা অক্ষুণ্ন থাকে।

এডিস নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ কিছুটা ভিন্ন। এটি মূলত মানুষের বাসস্থানঘন এলাকায় জন্মায়, ফলে প্রতিটি বাড়ি ও নির্মাণাধীন স্থানই সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই শুধু সচেতনতা নয়, কার্যকর নজরদারি এবং কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। যেখানে নিয়ম লঙ্ঘন হবে, সেখানে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা না নিলে এডিস নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

বৈজ্ঞানিকভাবে বায়ো-লার্ভিসাইড (বিটিআই) এবং ইনসেক্ট গ্রোথ রেগুলেটর ব্যবহার এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর হতে পারে। এগুলো লার্ভার বিকাশ প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। তবে এ ক্ষেত্রে সঠিক প্রয়োগ, স্থান নির্বাচন এবং নিয়মিত মনিটরিং অপরিহার্য।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এডিস বা কিউলেক্স নিয়ন্ত্রণকে মৌসুমি কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। সারা বছর নিয়মিত সার্ভিলেন্স, তথ্য বিশ্লেষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণের মাধ্যমে একটি ধারাবাহিক কর্মসূচি গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় প্রতিবছরই একই সংকট পুনরাবৃত্তি হবে।
নাগরিক অংশগ্রহণ ছাড়া এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। প্রশাসনের পাশাপাশি নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। বাড়ির ছাদে জমে থাকা পানি, খোলা ট্যাঙ্ক বা অব্যবহৃত পাত্র, এসব ছোট অবহেলাই বড় ঝুঁকিতে রূপ নেয়। 

সার্বিকভাবে, ঢাকার মশা সমস্যা একটি কাঠামোগত ব্যর্থতার ফল। কিউলেক্সের বিস্তার নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা তুলে ধরে, আর এডিসের বৃদ্ধি ভবিষ্যৎ জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়। তাই এ বছর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মশা নিয়ন্ত্রণকে একটি দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত এবং বিজ্ঞানভিত্তিক কর্মসূচিতে রূপ দেওয়; যেখানে ড্রেনেজ সংস্কার, জলাবদ্ধতা নিরসন, কঠোর তদারকি, পরিবেশসম্মত নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিক অংশগ্রহণ সমানভাবে গুরুত্ব পাবে।

অধ্যাপক ড. করিরুল বাশার; কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ


 

আরও পড়ুন

×