ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রদর্শনী

যেখানে ছবি কথা বলে কবিতার ভাষায়

যেখানে ছবি কথা বলে কবিতার ভাষায়
×

ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে গতকাল শুক্রবার শুরু হয়েছে প্রখ্যাত আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুনের একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী। উদ্বোধনের পর অতিথিদের প্রদর্শনী ঘুরিয়ে দেখান তিনি -সমকাল

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:৩৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

একেক কবির কবিতার দর্শন একেক রকম। কেউ শহুরে জীবন পছন্দ করেন, আবার কেউ গ্রামের প্রকৃতিকে করেন কবিতার উপজীব্য। শামসুর রাহমান তাঁর নগরজীবনের বোধ, মানবিকতা ও প্রতিরোধকে ভাষা দিয়েছেন শব্দে। অন্যদিকে আল মাহমুদ খুঁজেছেন মাটি, মানুষ ও আধ্যাত্মিকতার ভেতর কবিতার সুর। 

আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন– সেই দুটি ধারাকেই ধরতে চেয়েছেন আলো-ছায়ার ফ্রেমে, শব্দহীন এক স্থিরদৃশ্যের ভাষায়। এ তিন সত্তার মিলনেই তৈরি হয়েছে এক অনন্য শিল্প প্রর্দশনী– ‘ফটোজিয়াম: লাইফ অব পোয়েট্রি’।

রাজধানীর আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার লা গ্যালারিতে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় শুরু হওয়া এ প্রদর্শনী কেবল আলোকচিত্রের আয়োজন নয়, এটি সময়, স্মৃতি ও কবিতার এক অন্তর্গত সংলাপ। এখানে এসে বোঝা যায়– প্রতিকৃতি মানে কেবল মুখ নয়, বরং একটি জীবন, চিন্তা ও নীরব ইতিহাস। এটি নাসির আলী মামুনের ৬৬তম একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী। এ প্রদর্শনী তিনি উৎসর্গ করেছেন আলোকচিত্রের ২০০ বছর পূর্তিকে।

আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশে ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লে। উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী মনিরুল ইসলামও।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে মতিউর রহমান বলেন, বাংলা কবিতার দুই ভিন্নধারার গুরুত্বপূর্ণ কবি শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ। তাদের সৃজনভুবন গড়ে উঠেছে ভিন্ন অভিজ্ঞতা ও জীবনবাস্তবতার আলোকে। শামসুর রাহমান বেড়ে উঠেছেন নগরজীবনের ভেতর। ফলে তাঁর কবিতায় নাগরিক চেতনা, আধুনিকতা ও নান্দনিক সংবেদন বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। অন্যদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গ্রাম থেকে উঠে আসা আল মাহমুদের কবিতায় গ্রামীণ প্রকৃতি, লোকজ জীবন ও প্রকৃতিনির্ভর মানবজীবনের মহিমা শক্তিশালীভাবে উপস্থিত। 

মতিউর রহমান বলেন, আল মাহমুদ তাঁর সৃষ্টির শুরুতে প্রগতিশীল রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী থাকলেও পরবর্তীতে ধর্মীয় আধ্যাত্মিকতার প্রতি আস্থাশীল হয়ে ওঠেন। বিপরীতে শামসুর রাহমান জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতা ও আন্তর্জাতিকতাবাদের মতো মতাদর্শকে ধারণ করে তাঁর কাব্যভুবন নির্মাণ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও চেতনা– দুই কবিই নিজস্ব ভঙ্গিতে তাদের কবিতায় তুলে ধরেছেন।

রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লে বলেন, ‘নাসির আলী মামুনের মতো একজন আলোকচিত্রীর হাতে আলোকচিত্র কেবল শিল্পচর্চার মাধ্যম নয়, বরং সাংস্কৃতিক সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস হয়ে ওঠে। তাঁর সাদাকালো প্রতিকৃতিগুলো আলো ও ছায়ার অপূর্ব ব্যবহারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এগুলো শুধু ছবি নয়, এগুলো নীরব, অথচ শক্তিশালী প্রতিফলনের মুহূর্ত।’ 

জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লে বলেন, বিষয়টি বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর দুজন বিশিষ্ট কবি– শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদের প্রতিকৃতিতে। তাঁর লেন্সের মাধ্যমে তারা কেবল সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেই নন, বরং গভীরভাবে চিন্তাশীল, সংবেদনশীল এবং আত্মমগ্ন রূপে প্রকাশিত হয়েছেন।

শিল্পী মনিরুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি ধারণ করে আসছেন আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন, যা নিছক একটি কারিগরি কাজ নয়, বরং গভীর শিল্পসাধনার বিষয়। তাঁর ভাষায়, পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফি মানে শুধু ক্যামেরার শাটারে চাপ দেওয়া নয়, বরং আলোকচিত্রের মাধ্যমে একজন মানুষের অন্তর্গত ব্যক্তিত্বকে উন্মোচন করাই এর প্রকৃত সার্থকতা। এ ক্ষেত্রে নাসির আলী মামুন অসাধারণ সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সাঁজোয়া শম্ভো। তিনি জানান, ‘এ বছর বিশ্বজুড়ে আলোকচিত্রের ২০০ বছর পূর্তি উদযাপিত হচ্ছে। এমন এক তাৎপর্যপূর্ণ সময়ে বাংলাদেশের দুই প্রধান কবিকে কেন্দ্র করে একটি ব্যতিক্রমী আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করতে পেরে তারা বিশেষভাবে আনন্দিত।’
এ প্রদর্শনীর বিষয়বস্তু বাংলা সাহিত্যের দুই ভিন্ন মেরুর কবি শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ। শামসুর রাহমানের আলোকচিত্রগুলোতে এক ধরনের নীরব গভীরতা আছে। অন্যদিকে আল মাহমুদের ছবিতে দেখা যায় এক ভিন্ন টানাপোড়েন। তাঁর চোখে কখনও ক্লান্তি, কখনও দৃঢ়তা, কখনও এক ধরনের একাকিত্ব।

দীর্ঘদিন মতাদর্শগত দূরত্বে থাকা দুই কবির একটি বিরল সাক্ষাৎ হয় ২০০৪ সালের ৩১ মে। ওই সাক্ষাৎ সম্ভব হয়েছিল নাসির আলী মামুনের উদ্যোগে। ঢাকার শ্যামলীতে শামসুর রাহমানের বাসায় বসেছিল সেই আলাপ। কথোপকথনের ফাঁকে ফাঁকে ক্যামেরা ক্লিক করেছেন তিনি। লেন্সবন্দি করেছেন এক ইতিহাস। পরে যা প্রকাশিত হয় প্রথম আলোয়।

এ প্রদর্শনীজুড়ে ৫৮টি আলোকচিত্র ও ভিডিওচিত্র স্থান পেয়েছে, যার প্রায় সবটিই সাদাকালো। নাসির আলী মামুনের কাজের একটি বড় শক্তি–তিনি মানুষকে আলোকচিত্রের ‘বিষয়’ বানান না, বরং তাদের সঙ্গে এক ধরনের সম্পর্ক গড়ে তোলেন। সেই সম্পর্কের ভেতর থেকেই জন্ম নেয় তাঁর তোলা ছবি। তাই সৈয়দ শামসুল হক, আহমেদ ছফা, এসএম সুলতান কিংবা অ্যালেন গিন্সবার্গসহ আরও যাদের আলোকচিত্র তিনি তুলেছেন, তারা হয়ে উঠেছেন সেই সময়ের জীবন্ত দলিল।

প্রদর্শনীতে থাকা প্রতিটি আলোকচিত্র দেখে মনে হয়– কবিতাকে শুধু পড়া যায় না, দেখা যায়। একটি মুখের ভাঁজে, চোখের চাহনিতে, একটি নীরব বিরতিতে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য অপ্রকাশিত পঙ্‌ক্তি। এ প্রদর্শনী চলবে আগামী ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত। বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সবার জন্য খোলা থাকবে।

আরও পড়ুন

×