ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বর্ষবরণ

চারুকলায় প্রাণের স্পন্দন

চারুকলায় প্রাণের স্পন্দন
×

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা প্রাঙ্গণে চলছে বর্ষবরণের প্রস্তুতি। সোমবার তোলা সমকাল

 দ্রোহী তারা

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৫৬ | আপডেট: ০৭ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:১০

| প্রিন্ট সংস্করণ

চৈত্রের তপ্ত দুপুরে সবাই ব্যস্ত। কেউ গভীর মনোযোগে মাটির সরায় আলপনা আঁকছেন। কারও তুলির ছোঁয়ায় লাল, সাদা, হলুদ আর নীল রং মিশে ফুটে উঠছে বাংলার চিরচেনা দৃশ্য। যেখানে ধানক্ষেত, নদী, নৌকার সঙ্গে বিমূর্ত রেখায় প্রাণ পাচ্ছে সময়ের গল্প।

এই ব্যস্ততা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা প্রাঙ্গণে। মাত্র এক সপ্তাহ পরই বাঙালির ঐতিহ্য ও গর্বের পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষের দিন এই চারুকলা থেকেই শুরু হবে বর্ণিল শোভাযাত্রা। তার প্রস্তুতি হিসেবে রাত-দিন এক করে কাজ করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এবারের শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্য ‘নববর্ষের ঐক্য, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’।

গতকাল সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় গিয়ে দেখা যায়, সারি করে রাখা হয়েছে নানা রকমের রঙিন সরা। একটু এগোতেই চোখে পড়ে কাগজে আঁকা ছোট ছোট জলরঙের পেইন্টিং। তাতে গ্রামবাংলার দৃশ্য, শান্ত প্রকৃতি যেন স্নিগ্ধ হয়ে ধরা দেয়। জয়নুল গ্যালারির ভেতরে আরেক জগৎ। সেখানে তৈরি হচ্ছে মুখোশ। বাঘ, রাজা, প্যাঁচা কিংবা কল্পনার অদ্ভুত সব চরিত্র। 

চারুকলার খোলা প্রাঙ্গণে ত্রিপলের নিচে তৈরি হচ্ছে বিশালাকৃতির কাঠামো-মোরগ, কাঠের হাতি, পায়রা। বাঁশের কঞ্চি ও কাঠ দিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে এই প্রতীকী অবয়বগুলো। কোথাও শিক্ষক নিজ হাতে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন, আবার কোথাও শিক্ষার্থীরাই খুঁজে নিচ্ছেন নতুন শিল্পভাষা। এই সম্মিলিত প্রয়াসে গড়ে উঠছে উৎসবের রূপকল্প।

পুরো পরিবেশে ধরা দিয়েছে এক অদৃশ্য ছন্দ। প্রাঙ্গণের কোথাও বাজছে বাংলা গানের সুর, কোথাও হাসির ফোয়ারা। চারুকলার সবচেয়ে নবীন শিক্ষার্থী পলক হালদারকে দেখা গেল গভীর মনোযোগে কাগজে নকশা আঁকতে। তিনি বলেন, ‘আমাদের বিষয় তো কোনো গৎবাঁধা রুটিনে হয় না। তাই সারা বছর কোনো ক্লান্তি লাগে না। তবুও এই শোভাযাত্রার প্রস্তুতিটা একেবারে ভিন্ন। একটা আলাদা অনুভূতি কাজ করে। মনে হয়, নিজের হাতে বছরের প্রথম সকাল সাজাচ্ছি।’

সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের এই সম্মিলিত প্রচেষ্টায় চারুকলা যেন পরিণত হয়েছে এক মিলন মেলায়। কাজ দেখতে সাধারণ মানুষের আনাগোনাও চোখে পড়ে চারুকলায়। গৃহিণী মারুফা হাসান তাঁর ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, এত নির্ভেজাল আনন্দ তো অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। তাই মেয়েকে নিয়ে এসেছি। 
এবার চারুকলার শোভাযাত্রার নামকরণ হয়েছে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। এই শোভাযাত্রায় কী কী মোটিফ থাকছে সে বিষয়ে চারুকলা অনুষদের ডিন শেখ আজহারুল ইসলাম চঞ্চল সমকালকে জানান, এবারের আয়োজনের প্রতিটি মোটিফেই রয়েছে প্রতীকী অর্থ ও গভীর তাৎপর্য। 

তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করেছি এমন কিছু উপাদান তুলে ধরতে, যা একদিকে আমাদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত, অন্যদিকে বর্তমান সময়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বার্তাও বহন করে। এবারের শোভাযাত্রার প্রধান আকর্ষণ হিসেবে রাখা হয়েছে একটি বৃহৎ মোরগের প্রতিকৃতি। ভোরের আলোয় মোরগের ডাক যেমন নতুন দিনের সূচনা ঘোষণা করে, তেমনি এই মোটিফ নতুন বছর, নতুন সূর্য এবং জাগরণের প্রতীক হিসেবে উঠে আসবে। কৃষিনির্ভর বাংলার জীবনযাত্রায় মোরগের ডাক যে সময়চিহ্ন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ, সেই ঐতিহ্যই এখানে নতুনভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে।’

লোকজ ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় সোনারগাঁয়ের কাঠের হাতিও পেয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। চার চাকার এই ঐতিহ্যবাহী কাঠের হাতি বাংলার লোকশিল্পের এক পরিচিত প্রতীক। এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে বাউল শিল্পীদের অবমূল্যায়নের প্রসঙ্গ সামনে রেখে সংগীতের প্রতীক হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে দোতারা। শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা তুলে ধরতে শোভাযাত্রায় রাখা হয়েছে পায়রার মোটিফ। একইসঙ্গে কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী পোড়ামাটির টেপা ঘোড়াও এবারের আয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছে। 

আরও পড়ুন

×