খরচ বাড়লেও বাড়েনি ধানের দাম লোকসানের শঙ্কায় কৃষক
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
ডিজেলের দাম বৃদ্ধি, সেচ খরচ, সার-বীজ ও শ্রমিক মজুরি মিলিয়ে চলতি বোরো মৌসুমে ধানের উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি সরকারি সংগ্রহ মূল্য। ফলে লোকসানের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন দেশের প্রান্তিক কৃষকরা।
নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চরক্লার্ক এলাকার চাষি অজি উল্যাহ বলেন, ‘এবারের মৌসুমে উৎপাদন খরচ ২০-৩০ শতাংশ বেড়েছে। বর্গাচাষ করলে প্রতি কেজি ধানের উৎপাদন খরচ দাঁড়াচ্ছে সাড়ে ৩৭ টাকার বেশি। অথচ সরকার ধান কিনতে চাচ্ছে ৩৬ টাকা দরে। এই দরে ধান বিক্রি করলে আমাদের লোকসান হবেই।’
এমন উদ্বেগ শুধু অজি উল্যাহর নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের মধ্যেই একই শঙ্কা। বিশেষ করে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পড়েছে সেচ, যান্ত্রিক চাষাবাদ এবং ধান কাটা-মাড়াইয়ের ওপর।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সেচযন্ত্র চালাতে ডিজেল এবং বিদ্যুতের খরচ
বেড়েছে। পাশাপাশি সার, কীটনাশক ও বীজের দামও ঊর্ধ্বমুখী। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রমিক সংকট ও বাড়তি মজুরি। সব মিলিয়ে ধান উৎপাদনের ব্যয় গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার কৃষক আবদুর রহমান বলেন, গত বছর এক বিঘা জমিতে বোরো ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছিল প্রায়
১২ হাজার ৫০০ টাকা। এবার সেই খরচ
বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার টাকার বেশি। অর্থাৎ, প্রতি বিঘায় অতিরিক্ত খরচ হয়েছে প্রায় ছয় হাজার টাকা।
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার কৃষক জুলহাস মিয়া বলেন, এক মণ ধানের দামে এখন এক দিনের শ্রমিকের মজুরিও ওঠে না। ধান উৎপাদনে খরচ পড়ে এক হাজার ৩০০ টাকার বেশি, সরকার দাম দিয়েছে এক হাজার ৪৪০ টাকা। এতে লাভ তো দূরের কথা, খরচই ঠিকমতো ওঠে না।
হাওরাঞ্চলেও একই চিত্র। সেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মূল্য সংকট। স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, চলতি মৌসুমে অতিবৃষ্টিতে প্রায় ৩০ শতাংশ জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক এলাকায় ধান কাটা ও পরিবহনে চরম ভোগান্তি হচ্ছে। তেলের দাম বৃদ্ধি এবং শ্রমিক সংকটের কারণে ধান কাটার খরচও বেড়েছে কয়েক গুণ।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়ানোর ফলে কৃষি খাতে অতিরিক্ত ব্যয় বেড়েছে প্রায় এক হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা। আগে যেখানে বছরে ডিজেলে খরচ হতো প্রায় ১০ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ছয় কোটি টাকা।
এমন পরিস্থিতিতে গতকাল বুধবার সরকার চলতি বোরো মৌসুমে ধান-চাল সংগ্রহের মূল্য আগের মতোই প্রতি কেজি ৩৬ টাকা নির্ধারণ করেছে। তবে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে পাঁচ লাখ টন করা হয়েছে। গত বছর বোরো মৌসুমে ৩৬ টাকা কেজি দরে তিন লাখ ৭৬ হাজার ৯৪২ টন ধান সংগ্রহ করে সরকার। যা লক্ষ্যমাত্রা তিন লাখ ৫০ হাজার টনের বেশি ছিল।
এবার সেদ্ধ চাল ৪৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, গত বছরও একই দাম ছিল। আতপ চাল নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৮ টাকা এবং গম ৩৬ টাকা দরে সংগ্রহ করা হবে। এবার ১৩ লাখ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে সরকার।
গত বছর সেদ্ধ চাল সংগ্রহ করা হয়েছে ১৪ লাখ ছয় হাজার ৫৩৩ টন, যা লক্ষ্যমাত্রা
১৪ লাখ টনের তুলনায় বেশি ছিল। ওই বছর সরকার আতপ চাল সংগ্রহ করেছে ৫১ হাজার ৩০৭ টন, যা লক্ষ্যমাত্রা ৫০ হাজার টনের তুলনায় বেশি ছিল।
গতকাল বুধবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ‘খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটি’র সভায় ধান-চালের মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আগামী ৩ মে থেকে ধান ও গম এবং ১৫ মে থেকে চাল সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হবে, চলবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত।
সভা শেষে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন
কক্ষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে সরকারি গুদামে ১৭ থেকে ১৮ লাখ টন চাল মজুত আছে। জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারি পর্যায়ে ১৩ লাখ টন চালের ‘নিরাপত্তা মজুত’ বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। তবে সরকার প্রয়োজনে এই মজুত ২৪-২৫ লাখ টনে উন্নীত করার সক্ষমতা রাখে এবং পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রকিউরমেন্ট লক্ষ্যমাত্রা পরিবর্তনের ফ্লেক্সিবিলিটি রাখা হয়েছে।
দেশে বার্ষিক চালের চাহিদা প্রায় চার কোটি ২৪ লাখ টন। চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বাম্পার ফলনের আশা করা হচ্ছে, যা জাতীয় চাহিদা পূরণে সক্ষম বলে মনে করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, চাল আমদানির আপাতত কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। তবে গমের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (৮-১০ লাখ টন) চাহিদার তুলনায় কম হওয়ায় এটি মূলত আমদানিনির্ভর। দেশে গমের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৮০ লাখ টন।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ না করলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং দীর্ঘ মেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
- বিষয় :
- ধান ক্রয়
