বিমানে নিয়োগে অনিয়ম
বিতর্কিত নিয়োগের পাইলটরা বহাল, ‘ যোগ্যরা’ অপেক্ষায়
আদালতের নির্দেশের পরও নিয়োগ হয়নি
ফাইল ছবি-সংগৃহীত
ইন্দ্রজিৎ সরকার
প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:১৪ | আপডেট: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ | ১০:২১
| প্রিন্ট সংস্করণ
আট বছর আগে ৩০ জন ক্যাডেট পাইলট নিয়োগ দেয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। পরে প্রশ্ন উঠলে মন্ত্রণালয় তদন্ত করে। এতে অনেক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়। নিয়োগগুলো বাতিলের সুপারিশ করে কমিটি। এ-সংক্রান্ত মামলায় দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়। এর পরও সেই নিয়োগ বাতিল হয়নি। আবার এর বিপরীতে উচ্চ আদালতের নির্দেশের পরও দুজন যোগ্য প্রার্থীকে নিয়োগ দেয়নি কর্তৃপক্ষ। পুনর্মূল্যায়ন অনুযায়ী মেধাতালিকায় স্থান পাওয়া ওই দুই পাইলট নিয়োগের অপেক্ষায় আট বছর ধরে অপেক্ষা করছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ২০১৮ সালের ১৮ ও ১৯ সেপ্টেম্বর বি-৭৩৭ ও ড্যাশ-৮ বিমানের পাইলট সংকট নিরসনে ক্যাডেট পাইলট নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ৯ অক্টোবর শিক্ষাগত যোগ্যতা সংশোধন করে বিজ্ঞপ্তি জারি হলেও আগের আবেদনগুলোও বহাল রাখা হয়। এ প্রক্রিয়ায় ১২০ জনের আবেদন বৈধ বিবেচিত হয়। ওই বছরের ২২ ডিসেম্বর বিমান বাহিনীর মাধ্যমে নেওয়া এমসিকিউ ও লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ৭৬ জন। সাইকোমেট্রিক পরীক্ষা ও মৌখিক পরীক্ষা শেষে ৫৪ জনের সমন্বিত তালিকা প্রকাশ করা হয়। পরে চূড়ান্তভাবে ৩২ জনকে নির্বাচিত ও ২২ জনকে অপেক্ষমাণ তালিকাভুক্ত করা হয়।
তদন্তে দেখা যায়, সঠিক নিয়মে মূল্যায়ন করা হলে অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকা নূর মোহাম্মদ জুয়েলসহ দুই প্রার্থী (অপরজন নাম প্রকাশ করতে চাননি) মেধাতালিকায় স্থান পান। এদিকে নির্বাচিত ৩২ জনের মধ্যে ৩০ জন যোগ দেওয়ায় দুটি পদ শূন্য থেকে যায়। তারপরও বঞ্চিত দুজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিয়ম লঙ্ঘন করে অপেক্ষমাণ তালিকাও প্রকাশ করেনি বিমান।
তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ
নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ২০১৯ সালের ২ এপ্রিল দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, নিয়োগের ক্ষেত্রে অপারেশনস ম্যানুয়াল পার্ট-এ লঙ্ঘন করা হয়েছে। ৭৫ নম্বরের লিখিত ও ২৫ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষার নিয়ম না মেনে উভয় পরীক্ষায় ১০০ নম্বর রাখার ব্যতিক্রমী পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। এর মাধ্যমে মৌখিক পরীক্ষায় কিছু প্রার্থীকে বেশি নম্বর দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়। ম্যানুয়াল অনুযায়ী নম্বর পুনর্গণনা করলে অন্তত পাঁচজন প্রার্থীর অবস্থান পরিবর্তিত হয়। অর্থাৎ তালিকায় থাকা পাঁচজন বাদ পড়েন এবং মেধাক্রমে ৩৩ থেকে ৩৭ পর্যন্ত থাকা পাঁচজন সুযোগ পান। সেই অনুযায়ী দেখা যায়, বঞ্চিত দুই প্রার্থীও ৩২ জনের নির্বাচিত তালিকার মধ্যে থাকতেন।
দুদকের চার্জশিট, চারজন চাকরিচ্যুত
তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন আইনে মামলা করা হয়। তদন্ত শেষে বিমানের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল মুনীম মোসাদ্দিক আহমদ, পরিচালক (ফ্লাইট অপারেশনস) ক্যাপ্টেন ফারহাত হাসান জামিল, পরিচালক (প্রশাসন) পার্থ কুমার পণ্ডিত, ব্যবস্থাপক (নিয়োগ) ফখরুল হোসেন চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয় দুদক। এরপর এই চার কর্মকর্তা চাকরি হারান।
বঞ্চিত দুই প্রার্থীর অপেক্ষা
নিয়োগে অনিয়ম প্রমাণিত হলেও প্রতিকার না পেয়ে বঞ্চিত দুই প্রার্থী হাইকোর্টে রিট করেন। আদালত প্রথমে রুল জারি করেন কেন তাদের নিয়োগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত বেআইনি ঘোষণা এবং তাদের মূল ব্যাচের জ্যেষ্ঠতাসহ নিয়োগ দিতে নির্দেশ দেওয়া হবে না। পরে ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর আদালত নির্দেশ দেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত দুটি পদ সংরক্ষণ করতে হবে। গত ২১ জুলাই আদালত নির্দেশ দেন, ৩০ দিনের মধ্যে দুটি শূন্য পদে তাদের নিয়োগ দিতে হবে। আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতা ছিল।
তবে আদালতের চূড়ান্ত রায়ের পরও এখনও তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়নি। রুল চলমান অবস্থায় দুটি পদ সংরক্ষণের নির্দেশ বলবৎ থাকলেও তা বাস্তবায়নে বিলম্ব হচ্ছে। দুই প্রার্থী বলছেন, অনিয়ম প্রমাণিত, মামলা হয়েছে, আদালতের রায় হয়েছে– কিন্তু যারা অনিয়মের সুবিধাভোগী, তারা এখনও বহাল। আর বৈধভাবে উত্তীর্ণ হয়েও আমরা নিয়োগ পাইনি।
নথিপত্র অনুযায়ী, বঞ্চিত প্রার্থীদের একজন বেসামরিক বিমান চলাচলে দেড় হাজার ও অপরজন তিন হাজার ৭৬০ ঘণ্টার বেশি উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। উভয়েরই ‘বোয়িং ৭৩৭ এনজি’-এ টাইপ রেটিংসহ অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তারপরও আট বছর ধরে নিয়োগের অপেক্ষায় থেকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে তাদের।
তাদের আইনজীবী তাহসিন মোক্তার নিশান বলেন, হাইকোর্টে প্রমাণিত হওয়ার পরও আদেশ বাস্তবায়ন না হলে তা আইনের শাসনের জন্য উদ্বেগজনক। তাছাড়া আদালতে অনেকবার আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পেয়েও সন্তোষজনক কোনো যুক্তি দিতে পারেনি বিমান।
১৩ প্রার্থী নিয়ে প্রশ্ন
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, যদি অপারেশনস ম্যানুয়াল যথাযথভাবে অনুসরণ করা হতো, তাহলে প্রার্থীদের অন্তত ১৩ জন নির্বাচিত তালিকায় স্থান পেতেন না। কারণ সংশোধিত বিজ্ঞপ্তির পরও তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত পূরণ হয়নি। তাদের পাঁচজনের লিখিত পরীক্ষার নম্বর মেধাতালিকায় স্থান পাওয়ার মতো ছিল না।
আবার তাদের লাইসেন্স নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সিএআর-৮৪ বিধিমালা অনুযায়ী কমার্শিয়াল পাইলট লাইসেন্স ইস্যুর জন্য নির্দিষ্ট যোগ্যতা প্রয়োজন। কিন্তু অন্তত দুজনের শিক্ষা সনদ অনুযায়ী সেই যোগ্যতা নেই। সে ক্ষেত্রে তাদের লাইসেন্স ইস্যু কীভাবে হয়েছে, সেটি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। আবার যোগ্যতার ঘাটতি নিয়ে পাইলট হলে সেটি ফ্লাইট নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলেও মনে করেন কেউ কেউ।
বিমান যা বলছে
বিমানের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম সমকালকে বলেন, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে বিমান। সেটি চলমান। তাই এখনই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করার সুযোগ নেই।
নিয়োগ বঞ্চিত প্রার্থী নূর মোহাম্মদ জুয়েল বলেন, প্রথমত, রায়ের ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হয়। তারা সেই সময় পার হওয়ার পর গত বছরের ডিসেম্বরে আপিল আবেদন করেন, যা এখনও আদালতে উত্থাপন হয়নি। এ বিষয়ে আমরা বিমানকে আইনি নোটিশ দিয়েছি। দ্বিতীয়ত, একটি ন্যায়সংগত আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করতে হবে কেন? এর আগে হাইকোর্টের নির্দেশের পরই এক পাইলটকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তখন কিন্তু আপিল করা হয়নি। আরেক ঘটনায় তো প্রার্থী আপিল বিভাগেও হেরে যান; কিন্তু বিমান তাকে নিয়োগ দিয়েছে। তাহলে শুধু আমাদের সঙ্গে এমন আচরণ কেন– প্রশ্ন এই পাইলটের।
