ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ পেতে কতদিন সময় লাগবে 

রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ পেতে কতদিন সময় লাগবে 
×

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ছবি-সংগৃহীত

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ | ১৪:০৭

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অবকাঠামো নির্মাণ ও কারিগরি প্রস্তুতির পর অবশেষে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের দোরগোড়ায় পৌঁছেছে বাংলাদেশ। পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর তীরে গড়ে ওঠা দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরের প্রথম ইউনিটে আজ শুরু হচ্ছে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম।

গত ১৬ এপ্রিল পারমাণবিক চুল্লিতে জ্বালানি প্রবেশের কমিশনিং লাইসেন্স পাওয়ার পর সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে আজ বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে এই ঐতিহাসিক কার্যক্রম।

তবে জ্বালানি লোডিং মানেই বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়। ফুয়েল বা জ্বালানি বলতে পারমাণবিক জ্বালানি অর্থাৎ ইউরেনিয়ামকে বোঝায়। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সাধারণত স্বল্পমাত্রায় পরিশোধিত ইউরেনিয়াম ব্যবহার করা হয়। ফুয়েল লোডিং একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ পর্যায় থেকে উৎপাদন পর্যায়ে উত্তরণেরই ইঙ্গিত।

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. শৌকত আকবর বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং একটি বড় মাইলফলক। এটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রথম ধাপ, যা নির্মাণ পর্যায় থেকে কার্যক্রম শুরুর দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

তিনি বলেন, ফুয়েল লোড করা মানেই বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, বরং এটি একটি সূক্ষ্ম ও দীর্ঘ কারিগরি প্রক্রিয়ার শুরু। জ্বালানি লোড করার পর রিঅ্যাক্টরের ভেতরে প্রথমবারের মতো নিয়ন্ত্রিত ও টেকসই চেইন রিঅ্যাকশন বা ‘ফিশন বিক্রিয়া’ শুরু করা হয়। একে বলা হয় ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি। শুরুতে রিঅ্যাক্টরকে তার পূর্ণ ক্ষমতার মাত্র ১ থেকে ৩ শতাংশ স্তরে রেখে নিউক্লিয়ার ফিজিকসের প্যারামিটারগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়।

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এর রিঅ্যাক্টর। এখানেই ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোড করা হবে। এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি মূলত ‘নিউক্লিয়ার ফিশন’ বা নিউক্লিয়াস বিভাজন প্রক্রিয়ায় কাজ করবে। পারমাণবিক চুল্লিতে ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াস বিভাজনের মাধ্যমে প্রচুর তাপশক্তি উৎপন্ন হয়। এ তাপশক্তি দিয়ে পানিকে উচ্চচাপে বাষ্পে পরিণত করে টারবাইন ঘোরানো হয়, যা থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। এটি একটি স্বয়ংক্রিয় ও নিয়ন্ত্রিত চেইন রিঅ্যাকশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চলে।

রিঅ্যাক্টরের ডিজাইন (ভিভিআর-১২০০) অনুযায়ী, ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি রিঅ্যাক্টর কোরে স্থাপন করতে হবে, যার জন্য সময় লাগবে ৩০ দিন। এ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুসরণ করে করতে হয় এবং বিশেষ মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি ধাপ পর্যবেক্ষণ করা হয়। 

জ্বালানি লোডিং শেষে শুরু হবে ফিজিক্যাল স্টার্টআপ। এ পর্যায়ে ডিজাইন অনুযায়ী নিউক্লিয়ার ফিশন রিঅ্যাকশন ঘটানো হয়। এ সময় প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে, যার জন্য প্রায় ৩৪ দিন সময় প্রয়োজন হয়। পরীক্ষা শেষে রিঅ্যাক্টরের সক্ষমতা ধীরে ধীরে বাড়িয়ে পর্যায়ক্রমে ৩%, ৫%, ১০%, ২০%, ৩০% এ উন্নীত করা হবে। এ প্রক্রিয়ায় সময় লাগবে ৪০ দিন। রিঅ্যাক্টরের পাওয়ার ৩০ শতাংশে উন্নীত হলেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। পরে ধাপে ধাপে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি চলবে নিরাপত্তাবিষয়ক নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সব মিলে জাতীয় গ্রিডে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পেতে সময় লাগবে প্রায় ১০ মাস।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট, ফুয়েল লোডিং কমিশনিং লাইসেন্স পাওয়ার মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালুর চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, ফুয়েল লোডিং এর মাধ্যমে রিঅ্যাক্টর বা চুল্লিতে পারমাণবিক জ্বালানি স্থাপন করা হয় এবং ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনই নয়, বরং সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াই এখন বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ। প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণযজ্ঞ শেষে এখন শুরু হচ্ছে এর কার্যকারিতার মূল ধাপ। 

পারমাণবিক শক্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক থাকলেও আধুনিক বাস্তবতায় এটি এখন পরিচ্ছন্ন জ্বালানি হিসেবে বিবেচিত। কার্বন নিঃসরণ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি হওয়ায় এটি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, কয়লা নির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় বছরে ২০ মিলিয়ন টন এবং গ্যাস নির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় ৮ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস নিঃসরণ থেকে পরিবেশকে রক্ষা করবে।

আরও পড়ুন

×