ঢাকা রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে বোরো ধান

এল নিনোর প্রভাব শ্রীলঙ্কায়, ঝুঁকিতে বাংলাদেশের কৃষি

বাড়বে সেচের চাপ, কমতে পারে ফলন

এল নিনোর প্রভাব শ্রীলঙ্কায়, ঝুঁকিতে বাংলাদেশের কৃষি
×

জাহিদুর রহমান

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪৮ | আপডেট: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:০১

| প্রিন্ট সংস্করণ

এল নিনোর প্রভাবে শ্রীলঙ্কায় তীব্র শুষ্ক আবহাওয়া বিরাজ করছে। দেশটির সাত জেলায় ইতোমধ্যে এক লাখ ১৫ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। সংকটে পড়া ৩৪ হাজার ৬০৮ পরিবারের এক লাখ ১৩ হাজার ৩৫৪ জনকে খাবার পানি সরবরাহ করছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে আট হাজার থেকে সাড়ে আট হাজার একর চাষের জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দিতে শ্রীলঙ্কা সরকার প্রায় ৩০০ কোটি রুপি বরাদ্দ করেছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় এল নিনোর প্রভাবের এমন চিত্র বাংলাদেশের জন্যও সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখছেন কৃষি ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা। কারণ, এল নিনোর প্রভাব একেক অঞ্চলে একেকভাবে প্রকাশ পায়। কোথাও খরা ও পানির সংকট বাড়তে পারে, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। চলতি বছর বাংলাদেশে আবহাওয়ার ধরন ইতোমধ্যে অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ শুষ্ক সময়ের পর হঠাৎ অতিবৃষ্টি, বর্ষায় বৃষ্টির ঘাটতি, তাপপ্রবাহ এবং স্বল্প সময়ে অস্বাভাবিক বেশি বৃষ্টিপাত কৃষির প্রচলিত মৌসুমি ছন্দে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো। 

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) পূর্বাভাস অনুযায়ী, এল নিনো আরও শক্তিশালী হতে পারে এবং আগামী বছরের শুরুর দিক পর্যন্ত এর প্রভাব অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে বাংলাদেশের সামনে খরা, তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা এবং সেচের পানির সংকটের মতো একাধিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের কেন্দ্রে এখন চলতি আমন মৌসুমের শেষ ভাগ, শীতকালীন ফসল এবং সবচেয়ে বেশি বোরো মৌসুম। কারণ, বোরো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ধান উৎপাদন মৌসুম এবং শুষ্ক মৌসুমের এই ফসল সেচের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগ কোথায়
আবহাওয়াবিদদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে চলতি বছরের মার্চের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত খুব কম হয়েছে। এর পর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। মার্চে স্বাভাবিকের চেয়ে ৩৮ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়। এপ্রিলে ৭৮ শতাংশ এবং মে মাসে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু বর্ষার মাস জুনে স্বাভাবিকের চেয়ে ৩০ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। জুলাইয়ে বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের চেয়ে ৩৭ শতাংশ বেশি হলেও এর বড় অংশ অল্প সময়ের মধ্যে নেমেছে। চট্টগ্রামে পরিস্থিতির অস্বাভাবিকতা আরও স্পষ্ট। ওই অঞ্চলে বছরে গড়ে প্রায় দুই হাজার ৯১৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু ৫ থেকে ১২ জুলাই মাত্র আট দিনে সেখানে এক হাজার ৪৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ, আট দিনেই বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের প্রায় অর্ধেক পরিমাণ পানি নেমেছে।

গত আগস্ট মাসে বাংলাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি সেপ্টেম্বর মাসে দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত হতে পারে। এই মাসে দুই থেকে তিনটি মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ এবং দেশের কিছু এলাকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

২১ আগস্ট প্রকাশিত বিবিসি ওয়েদারের প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমান এল নিনো ‘জীবিত মানুষের স্মৃতিতে সবচেয়ে শক্তিশালী’ এল নিনোতে পরিণত হতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ইতোমধ্যে স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি এবং তা ৩ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। ২০২৭ সাল হতে পারে বিশ্বব্যাপী রেকর্ড উষ্ণতম বছর।

বাংলাদেশে এখন উদ্বেগের বড় জায়গা আমন ধানের শেষ ভাগ, শীতকালীন ফসল এবং পরবর্তী বোরো মৌসুম। দক্ষিণ এশিয়ায় এল নিনোর কারণে মৌসুমি বৃষ্টিপাত কমে গেলে আমন ধানের চারা রোপণ ও বেড়ে ওঠায় পানির সংকট দেখা দিতে পারে। আবার বেশি তাপমাত্রায় মাটির আর্দ্রতা দ্রুত কমে গেলে সেচের প্রয়োজন বাড়বে। এতে আলু, পেঁয়াজ, গম, ভুট্টা, সরিষা ও শীতকালীন সবজি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। উষ্ণ শীত এসব শীতকালীন ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করতে পারে।

এর পরের ধাপ বোরো। দেশের সবচেয়ে বড় ধান উৎপাদন মৌসুম বোরো। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে এ ধানের চারা রোপণ করা হয় এবং এপ্রিল-মে মাসে কাটা হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে মোট ধান উৎপাদন হয়েছে ২ কোটি ১৩ লাখ টন। এর প্রায় ৫৫ শতাংশ এসেছে বোরো থেকে। বোরো শুষ্ক মৌসুমের ফসল হওয়ায় এটি সেচের ওপর অনেক নির্ভরশীল। তাপমাত্রা বেড়ে গেলে এবং বৃষ্টিপাত কমে গেলে একদিকে সেচের পানির চাহিদা বাড়বে, অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়বে।

আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশ কার্যালয়ের ক্রপিং সিস্টেমস এগ্রোনমিস্ট শরীফ আহমেদ বলেন, বোরো ধানের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো ফুল আসার সময়ের তাপপ্রবাহ। বিশেষ করে এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে ঝুঁকি বাড়ে। দিনের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি এবং রাতের তাপমাত্রা ২৮ ডিগ্রির বেশি হলে ধানের ফুল বন্ধ্যা হয়ে যেতে পারে। দীর্ঘ সময় এ ধরনের তাপ থাকলে ফুল আসা ও দানা গঠনের প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। ফলে শিষে অনেক দানা ফাঁকা বা অপূর্ণ থেকে যায়।

শরীফ আহমেদ আরও বলেন, তাপমাত্রা বাড়লে সেচের পানির চাহিদাও বাড়বে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগের, কারণ ওই অঞ্চলে ভূগর্ভ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে এবং বৃষ্টিপাতের ধরনও বদলেছে।

এ বছরই বড় ক্ষতির অভিজ্ঞতা
এল নিনোর নতুন ঝুঁকির কথা এমন সময়ে বলা হচ্ছে, যখন চলতি বছরেই বাংলাদেশের কৃষি আবহাওয়াজনিত বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে। গত ২৬ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত টানা বৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পানি ও বন্যায় হাওর এলাকার সাত জেলায় ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ৪৯ হাজার ৭৩ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। প্রায় ২ লাখ ১৩ হাজার টন বোরো ধান নষ্ট হয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রায় ২ লাখ ৩৬ হাজার কৃষক। তবে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের হিসাবে, হাওর অঞ্চলে প্রায় ৩ লাখ ৩৯ হাজার টন ধান নষ্ট হয়েছে। সরকারি হিসাবের চেয়ে এ পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার টন বেশি। এরপর জুলাইয়ের বন্যায়ও কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের বন্যায় প্রায় ৮২ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫৩ হাজার হেক্টর আউশ ধান, ৯ হাজার হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ২০ হাজার হেক্টরের বেশি সবজি রয়েছে।

অস্বাভাবিক আবহাওয়া কীভাবে মাঠ থেকে খাদ্যবাজারে প্রভাব ফেলতে পারে, তার সাম্প্রতিক উদাহরণ বাংলাদেশে রয়েছে। ২০২৩-২৪ সালে শীতকালে বৃষ্টি, দীর্ঘ সময় ঘন কুয়াশা, দীর্ঘ সময় তাপপ্রবাহ এবং রোগ-পচনের কারণে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়।

ডব্লিউএমওর মতে, ২০২৩-২৪ সালের এল নিনো ছিল রেকর্ডের পাঁচটি শক্তিশালী এল নিনোর একটি। ওই সময় বাংলাদেশে দীর্ঘস্থায়ী তাপ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও অস্বাভাবিক শীতকালীন আবহাওয়া দেখা যায়।

আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ বলেন, এল নিনো তৈরি হওয়ার পর ২০২৪ সালে বাংলাদেশে টানা ৩৫ দিন তাপপ্রবাহের পরিস্থিতি ছিল। শীতকালে বৃষ্টি ও দীর্ঘস্থায়ী ঠান্ডার কারণেও ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

দরকার সমন্বিত প্রস্তুতি
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহমেদ বলেন, আগের এল নিনোর অভিজ্ঞতা বর্তমান পরিস্থিতির জন্য সতর্কবার্তা। ২০২৩-২৪ সালে এল নিনো ও লা নিনার প্রভাব দেখা গেছে। এবার আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো আরও শক্তিশালী প্রভাবের পূর্বাভাস দিচ্ছে। কিন্তু সেই মাত্রায় সরকারের প্রস্তুতি নেই। অঞ্চলভেদে রোপণের সময় পরিবর্তন, স্বল্পমেয়াদি ও তাপসহনশীল জাত ব্যবহার, সময়মতো সেচ, অল্টারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং বা এডব্লিউডি পদ্ধতি এবং ফসলের গুরুত্বপূর্ণ বৃদ্ধিপর্যায়ের সঙ্গে তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস সমন্বয়ের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জামাল উদ্দিন বলেন, দুর্যোগের পর ক্ষতিপূরণ দেওয়ার চেয়ে দুর্যোগের আগে ক্ষতি কমানোর ব্যবস্থা নেওয়াই বেশি কার্যকর। বাংলাদেশেও কৃষিতে এই ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, সারা পৃথিবীতে এল নিনো নিয়ে প্রস্তুতি চললেও বাংলাদেশে এ নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হচ্ছে না। অধিকাংশ কৃষক এল নিনো কী, তা জানেন না কিন্তু এর প্রভাব তাদেরই বহন করতে হবে।

অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম আরও বলেন, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মধ্যে আরও শক্তিশালী সমন্বয় প্রয়োজন। কৃষকদের শুধু ‘এল নিনো আসছে’ বললে হবে না, তাদের বলতে হবে– কোন এলাকায় কতটা বৃষ্টি হতে পারে, কোন ফসল ঝুঁকিতে, কখন সেচ দিতে হবে, কখন বীজ বুনতে হবে এবং কখন ফসল কেটে ঘরে তুলতে হবে। বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে উপকূলীয়, খরাপ্রবণ ও বন্যাপ্রবণ এলাকাকে। 

অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবদুর রহিম বলেন, ‘জলবায়ুর ওপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আমরা যা করার চেষ্টা করছি, তা হলো ক্ষয়ক্ষতি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা। বন্যাপ্রবণ হাওর এলাকার কৃষকদের ব্রি ধান-১১৮ চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এটি আগাম পরিপক্ব জাত, যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ১০ থেকে ১৫ দিন আগে কাটা যায়। দুর্যোগের আশঙ্কা দেখা দিলে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’

আরও পড়ুন

×