অপরাধ কর্মকাণ্ডে রাউজানকে ছাড়িয়ে গেছে সীতাকুণ্ড
ছবি: সমকাল ইপেপার
সারোয়ার সুমন ও সেকান্দার হোসেইন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৫১ | আপডেট: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৪৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রামের রাউজান একসময় খুন, সংঘর্ষ ও সন্ত্রাসের কারণে ‘সন্ত্রাসের জনপদ’ হিসেবে পরিচিত ছিল। গত দুই বছরে সেখানে ৩৪ জন খুন হয়েছেন। একই সময়ে পাশের সীতাকুণ্ড উপজেলায় খুনের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫-এ।
অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই উপজেলায় রাজনৈতিক আধিপত্য, দলীয় কোন্দল, চাঁদাবাজি, ব্যবসা ও এলাকা নিয়ন্ত্রণ এবং জমি-সম্পত্তির বিরোধকে কেন্দ্র করে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে গত ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সীতাকুণ্ডে ৪৫টি হত্যাকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে ৩৮ জন এবং বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে সাতজন খুন হয়েছেন।
গত ১৯ জানুয়ারি সলিমপুরে খুন হওয়া র্যাবের ডিডি মোতালেবের ঘটনাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে প্রশাসন। এ মামলায় এজাহারভুক্ত ২৯ জন ও অজ্ঞাতনামা দেড় শতাধিক আসামি রয়েছেন। এর মধ্যে এজাহারভুক্ত পাঁচজনসহ ২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে এসব ঘটনার বিচার প্রক্রিয়া। থানার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৪৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৪১টি মামলা হয়েছে। আসামি পাঁচ শতাধিক। এর মধ্যে গ্রেপ্তার মাত্র ৪৮ জন। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বেশির ভাগ জামিনে আছেন। চারটি ঘটনায় স্বজনরা মামলা করেননি। অধিকাংশ মামলা এখনও রয়েছে তদন্ত পর্যায়ে।
সীতাকুণ্ডে প্রথম খুনের ঘটনা ঘটে ২০২৪ সালের ১০ আগস্ট। জমির বিরোধে মোহাম্মদ সুমন (৩৮) নামে এক ব্যক্তির ওপর হামলা হয়। পরে তিনি হাসপাতালে মারা যান। সর্বশেষ গত ২৫ আগস্ট মুরাদপুর ইউনিয়নে নুরুল ইসলাম ইরান নামে এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে ও গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়। এর তিন দিন আগে শামীম নামে আরেক ব্যক্তিকে কুপিয়ে ও রগ কেটে হত্যা করা হয়। এখানে দুই বছরে ধর্ষণের মামলা হয়েছে ২৫টি। এর মধ্যে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকে গত আগস্ট পর্যন্ত ধর্ষণের মামলা হয়েছে আটটি। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে এ সংখ্যা ছিল ১৭। দুই বছরে অপহরণের মামলা হয়েছে ২০টি। এর মধ্যে বিএনপির ছয় মাসে হয়েছে চারটি।
হত্যার বড় অংশ রাজনৈতিক ও আধিপত্যের দ্বন্দ্বে
সীতাকুণ্ডে গত দুই বছরে ১৫টি হত্যাকাণ্ডকে রাজনৈতিক খুন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আরও ১৫ জন খুন হয়েছেন পূর্বশত্রুতা ও সম্পত্তির বিরোধে। পারিবারিক কলহে পাঁচ নারী নিহত হয়েছেন। ধর্ষণচেষ্টার পর শিশুসহ দুজনকে হত্যা করা হয়েছে। চারজনকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়েছে। চারটি হত্যার কারণ পুলিশ নিশ্চিত করতে পারেনি।
রাজনৈতিক হত্যার ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর বড় অংশই কোনো আদর্শিক বিরোধের চেয়ে এলাকা নিয়ন্ত্রণ, দলীয় আধিপত্য এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ ঘিরে ঘটেছে।
বাড়বকুণ্ডে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক নাছির উদ্দিন নিজ দলের প্রতিপক্ষের হাতে খুন হন। এ ঘটনায় সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও তাদের বেশির ভাগ জামিনে আছেন। নিহতের স্ত্রী মোমেনা বেগমের অভিযোগ, মামলা করার পর দলীয় নেতাদের চাপে তাঁকে আসামিদের বিষয়ে আদালতে অনাপত্তি দিতে বাধ্য করা হয়।
জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরের পাহাড়ি এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়েও সংঘর্ষে প্রাণহানি ঘটেছে। দুই পক্ষের সংঘর্ষে মাঈন উদ্দিন ও খলিলুর রহমান কানু নিহত হন। ছোট দারোগারহাট এলাকায় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের দুই পক্ষের সংঘর্ষে যুবদলকর্মী কলিম উদ্দিন নিহত হন। ইট, বালু, কংক্রিটের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিএনপি নেতা মোহাম্মদ মাসুদ হত্যার অভিযোগ রয়েছে।
বালু উত্তোলনের দখলদারিত্ব নিয়েও ঘটেছে হত্যাকাণ্ড। কুমিরা থেকে নিখোঁজ হওয়ার চার দিন পর নিরাপত্তাকর্মী মো. সালাউদ্দিনের মরদেহ সাগর থেকে উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, বালু উত্তোলনের দখলদারিত্ব নিয়ে বিরোধের জেরে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।
উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ডা. কমল কদর বলেছেন, ‘বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের যেসব নেতাকর্মী ও সমর্থক হত্যার শিকার হয়েছেন; সেসব ঘটনায় যারা জড়িত, তাদের ব্যাপারে তদন্তপূর্বক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আহতদের দলীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’
ক্ষমতার পালাবদলেও বদলায়নি সহিংসতার ধরন
রাজনৈতিক পালাবদলের পর সীতাকুণ্ডে হত্যার ধরন নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত দুই বছরে নিহত যে ১৫ জনকে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী বা সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তাদের মধ্যে বিএনপির আটজন এবং আওয়ামী লীগের সাতজন রয়েছেন।
আওয়ামী লীগ নেতা শামীমকে মুরাদপুরে তুলে নিয়ে পিটিয়ে ও রগ কেটে হত্যা করা হয়। যুবলীগ নেতা মুসলিমকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হলেও ওই মামলায় কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। যুবলীগের নেতা ইউসুফ বেলাল অর্ণবকে এক্সক্যাভেটরে ঝুলিয়ে-পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। কৃষক লীগের আহ্বায়ক মীর ইউসুফকেও পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় দুই বিএনপি নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব ও পুলিশ।
অন্যদিকে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যেও দলীয় বিরোধ ও আধিপত্যের সংঘাতে প্রাণহানি ঘটেছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে স্থানীয় নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্বও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় জড়িতরা জানিয়েছেন।
সম্পত্তির বিরোধেও প্রাণ যাচ্ছে
সীতাকুণ্ডে হত্যাকাণ্ডের আরেক বড় কারণ পূর্বশত্রুতা ও সম্পত্তির বিরোধ। গত দুই বছরে এ ধরনের ঘটনায় ১৫ জন নিহত হয়েছেন। বাড়বকুণ্ডে সত্তরোর্ধ্ব নাবীউল হককে ইট দিয়ে শরীর থেঁতলে হত্যা করা হয়। তাঁর পরিবারের দাবি, বাড়ির সীমানা নিয়ে বিরোধের জেরে প্রতিবেশীরা তাঁকে হত্যা করেছেন। এ ঘটনায় একজন নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
জমি ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের পাশাপাশি বালু উত্তোলন, ইট, কংক্রিট ও অন্যান্য ব্যবসার নিয়ন্ত্রণও সংঘাতের উৎস হয়ে উঠেছে। বিক্রয়কর্মী নয়ন দেবনাথকে নির্যাতনের পর গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়। পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় কিছু সন্ত্রাসী তাঁর কাছে আড়াই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিল। দেড় লাখ টাকা ও সাড়ে তিন ভরি স্বর্ণ নেওয়ার পরও তাঁকে হত্যা করা হয়।
মামলা হচ্ছে, বিচার এগোচ্ছে ধীরে
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি। থানার তথ্য অনুযায়ী, ৪১টি হত্যা মামলায় পাঁচ শতাধিক আসামি করা হয়েছে। ছয়টি মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামির সংখ্যা আড়াই শতাধিক। নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয়েছে ২৪৩ জনকে।
এত বিপুলসংখ্যক আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন মাত্র ৪৮ জন। পুলিশ জানিয়েছে, ১৮টি হত্যা মামলায় এজাহারভুক্ত ৩৩ জন এবং অজ্ঞাতনামা ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মোট আসামির তুলনায় গ্রেপ্তারের হার প্রায় ১০ শতাংশ। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি বেশির ভাগই জামিনে রয়েছেন।
একটি মামলায় আদালতের রায় হয়েছে। ৮ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যার দায়ে বাবু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাঁকে অর্থদণ্ডের পাশাপাশি পৃথক ধারায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও দেওয়া হয়।
পুলিশের তথ্যেও তদন্তের ধীরগতির চিত্র পাওয়া যায়। সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মহিনুল ইসলাম জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে ৩৪টি হত্যা মামলার মধ্যে সাতটির তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে পাঠানো হয়েছে। তদন্তাধীন ২৭টি। ওই সময় ১৬টি অপহরণ মামলার ৯টির প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ১৭টি ধর্ষণ মামলার ১০টির তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। চলমান সাতটি।
শিল্পাঞ্চলে বাড়ছে উৎকণ্ঠা
সীতাকুণ্ড শুধু অপরাধপ্রবণ এলাকা নয়; দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যিক করিডোর। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে পণ্য পরিবহন, বড় শিল্পকারখানা, শিপব্রেকিং ইয়ার্ড ও অক্সিজেন প্লান্টের কারণে উপজেলার অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক। শতাধিক ভারী শিল্পকারখানা রয়েছে এ এলাকায়।
এমন এলাকায় চাঁদাবাজি ও আধিপত্যের অভিযোগ শিল্পমালিকদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনজন কারখানার মালিক জানিয়েছেন, বর্তমানে একাধিক পক্ষকে মাসে চাঁদা দিতে হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, দুই বছর আগেও চাঁদা দিতে হতো; তবে তখন একটি পক্ষ মাসে একবার চাঁদা নিত। এখন একাধিক পক্ষের চাপ তৈরি হয়েছে।
পাহাড়, রাজনীতি ও দুর্বল আইনশৃঙ্খলা
সীতাকুণ্ডের ভৌগোলিক অবস্থানও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বড় চ্যালেঞ্জ। উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরসহ পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘদিন অপরাধীদের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ‘সীতাকুণ্ডে রাজনৈতিক অস্থিরতা আছে। আবার এখানে সন্ত্রাসীদের পালিয়ে থাকার মতো পাহাড়ি এলাকাও রয়েছে। জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘসময় অপরাধীদের আস্থানা ছিল। আমরা পরিবর্তন এনেছি। এখন আস্তে আস্তে কমে আসবে অন্যান্য অপরাধও।’
- বিষয় :
- অপরাধ
- অপরাধ চক্র