জলাবদ্ধতায় শতবর্ষী সলঙ্গা হাট
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সাক্ষী ঐতিহাসিক সলঙ্গা হাটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতে ডোবায় পরিণত হয়। সম্প্রতি তোলা। ছবি: সমকাল
সিরাজগঞ্জ ও উল্লাপাড়া প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:০৩
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সাক্ষী ঐতিহাসিক সলঙ্গা হাট এখন প্রশাসনিক অবহেলার শিকার। ড্রেনেজ সংকটে বর্ষা মৌসুমে কাদার ডোবায় পরিণত হচ্ছে হাটটি। ঐতিহ্যবাহী এই ব্যবসাকেন্দ্রে প্রতিবছর কোটি টাকার ওপর রাজস্ব আদায় হলেও ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও স্থায়ী শেড নির্মাণ হয়নি। ফলে কাদা ও পানির মধ্যেই ঝুঁকি নিয়ে কেনাবেচা করতে বাধ্য হচ্ছেন হাজার হাজার ক্রেতা-বিক্রেতা।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সূতিকাগার ছিল এই সলঙ্গা হাট। ১৯২২ সালের ২৭ জানুয়ারি মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশের নেতৃত্বে এই হাটে বিলেতি পণ্য বর্জন আন্দোলন করতে গিয়ে ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতে সাড়ে চার হাজার মানুষ হতাহত হয়েছিলেন। বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই হাটের এক পাশে বিশাল গরুর হাট, অন্য পাশে ধান ও পাটের পাইকারি বাজার এবং বাকি অংশে বিস্তৃত কাঁচাবাজার ও মাছের পট্টি। তবে ধানের হাট ও কাঁচাবাজারের অংশটি তুলনামূলক নিচু হওয়ায় জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুরো বর্ষা মৌসুমে এলাকাটি স্থায়ী জলাবদ্ধতায় বন্দি হয়ে পড়ে।
বৃষ্টি হলে হাটে হাঁটুপানি জমে থাকে এবং টানা দুই-তিন দিন বৃষ্টি না হলেও পুরো এলাকা রূপ নেয় স্যাঁতসেঁতে কাদার ভাগাড়ে। বাধ্য হয়ে হাটে আসা হাজারো মানুষকে জুতা-চটি হাতে নিয়ে কাদা মাড়িয়ে কেনাবেচা করতে হয়।
স্কুলশিক্ষক আব্দুস সালাম আক্ষেপ করে জানান, প্রতিবছর কোটি টাকার ওপরে ইজারা ডাকা হলেও সলঙ্গা হাটে আজ পর্যন্ত আধুনিক উন্নয়নের কোনো ছোঁয়া লাগেনি। হাটে পানি নিষ্কাশনের ড্রেন নেই; নেই কোনো মাথার ওপর শেড বা পর্যাপ্ত শৌচাগারের ব্যবস্থা। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় লোকজন প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের দুয়ারে ধরনা দিয়ে এলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
স্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। ঘুগাট গ্রামের সবজি বিক্রেতা ওয়ালেমান জানান, বিক্রির উদ্দেশ্যে পটোল, কাঁচামরিচ ও কচু নিয়ে হাটে এসেছিলেন। কিন্তু হাঁটুপানি জমে থাকায় পলিথিন ও ঝুলিতে রাখা পণ্যের সিংহভাগই পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। বিগত দুটি হাটে তাঁর অন্তত দুই হাজার টাকার মালামাল পচে নষ্ট হয়।
জলাবদ্ধতার জন্য ইজারাদারদের দায়িত্বহীনতাকে দুষছেন সলঙ্গা বাজার বণিক সমিতির সভাপতি আনজির খোন্দকার। তিনি জানান, প্রতিবছর সলঙ্গা হাট থেকে যে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব অর্জিত হয়, তার সামান্য অংশ সঠিকভাবে ব্যয় করা হলে অনেক আগেই আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হতো। কিন্তু বছরের পর বছর ইজারা নেওয়া ব্যক্তিরা হাটের উন্নয়নে এক পয়সাও বিনিয়োগ করেননি। বর্ষা মৌসুমে পুরো হাটে হাঁটুপানি জমে থাকে। তাঁর হিসাবমতে, বৃষ্টিপাত হলে প্রতিটি হাটের দিনে গড়ে এক থেকে দেড় লাখ টাকার পণ্যসামগ্রী নষ্ট হচ্ছে। প্রতিকার চেয়ে স্থানীয়রা একাধিকবার আবেদন করলেও প্রশাসনিক কোনো উদ্যোগ মেলেনি।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সলঙ্গা হাটের বর্তমান ইজারাদার রোকনুজ্জামান লেলিন। তিনি বলেন, তিনি এ বছর রেকর্ড ১ কোটি ৩০ লাখ টাকায় হাটের ইজারা ধরেছেন। কিন্তু এর আগে যারা হাটের দায়িত্বে ছিলেন, তারা শুধু ইজারার টাকাই তুলেছেন, হাটের অবকাঠামোগত কষ্টের দিকে মোটেও দৃষ্টি দেননি। তিনি ইতোমধ্যে ড্রেন তৈরি ও জলাবদ্ধতা নিরসনে রায়গঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদন জমা দিয়েছেন এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপজেলা প্রকৌশলী ফজলুর রহমান তালুকদার জানান, দ্রুতই হাটের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ও স্থায়ী উন্নয়নের ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে পরামর্শ করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল খালেক পাটোয়ারী জানান, প্রারম্ভিক পদক্ষেপ হিসেবে হাটের জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুগগতিতে ড্রেন নির্মাণের পরিকল্পনা হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে শেড নির্মাণসহ সার্বিক সংস্কারকাজ সম্পন্ন করা হবে।
- বিষয় :
- সিরাজগঞ্জ