ঢাকা সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বরগুনায় চিকিৎসকের মঞ্জুর পদ ২৯৩টি, আছেন মাত্র ৭৭ জন

বরগুনায় চিকিৎসকের মঞ্জুর পদ ২৯৩টি, আছেন মাত্র ৭৭ জন
×

আবু জাফর সালেহ্, বরগুনা

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:৪৩

চিকিৎসক সংকটে উপকূলীয় জেলা বরগুনায় স্বাস্থ্যসেবা দীর্ঘদিন ধরেই বেহাল। দফায় দফায় আন্দোলন-সংগ্রামের পরও এ খাতে লাগেনি পরিবর্তনের ছোঁয়া। মাঝেমধ্যে কিছু চিকিৎসককে মন্ত্রণালয় থেকে পদায়ন করা হয়। তবে তাদের অনেকেই কর্মস্থলে যোগ দেন না। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ উপেক্ষা করে নানা মহলে তদবির করে থেকে যান আগের জায়গায়। জবাবদিহি না থাকায় এমন নৈরাজ্য চলছে বলে মনে করে স্থানীয় সচেতন মহল।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অনুমতি ছাড়াই জেলার বিভিন্ন কর্মস্থলে দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত চিকিৎসকের সংখ্যা ১৪। এদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হলেও তারা গুরুত্ব দেননি। অনুপস্থিত থাকার জন্য অসুস্থতা, কর্মস্থলে পরিবেশ না থাকা, পরিবার-পরিজন নিয়ে ঢাকায় অবস্থানসহ নানা অজুহাত দিয়েছেন। 

বরগুনা জেলার বিভিন্ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মঞ্জুর করা চিকিৎসকের পদ ২৯৩টি। এর বিপরীতে কাগজ-কলমে কর্মরত ৭৭ জন। শূন্য পদের সংখ্যা ২১৬টি, যা কর্মরত চিকিৎসক সংখ্যার প্রায় তিনগুণ। জেলার পাথরঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অ্যানেসথেসিয়া) হিসেবে পদায়িত ডা. মো. মাশফিকুর রহমান। ২০২২ সালের ৭ জুলাই থেকে তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত। এ কারণে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বিভাগীয় মামলা (২৩১/২০২৫) হয়েছে। তারপরও কর্মস্থলে যোগ দেননি মাশফিকুর।

গত ১৯ আগস্ট ডা. মাশফিকুর রহমান মোবাইল ফোনে বলেন, ‘মা ঢাকায় অসুস্থ থাকার কারণে প্রথমে ১০ মাসের ছুটি নিয়ে এসেছিলাম। এ ছাড়া আমার যোগ্যতা অনুযায়ী পাথরঘাটার কর্মস্থলে কোনো কাজ ছিল না। হাসপাতালে একটি ওটি পর্যন্ত ছিল না। ফলে আমি মানুষকে কোনো উপকার করতে পারিনি।’ এমতাবস্থায় তাঁর অভিজ্ঞতা আস্তে আস্তে নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল দাবি করে তিনি বলেন, ‘যেখানে কাজ আছে, সেখানে আমাকে বদলি করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার বলেছি। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা হয়নি। পরে ইস্তফাপত্র দাখিল করে চলে এসেছি।’

অনুমোদন ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত ৮ চিকিৎসকের তালিকা চলতি বছরের ৭ এপ্রিল বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) বরাবর পাঠান বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ্। এখানে নাম রয়েছে ডা. মাশফিকুর রহমানের। একই তালিকায় রয়েছেন আমতলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জুনিয়র কনসালট্যান্ট (সার্জারি) ডা. উৎপল নাগ। চলতি বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩ দিনের নৈমিত্তিক ছুটি নিয়ে কর্মস্থল ছাড়েন তিনি। এরপর আর যোগ দেননি। ডা. উৎপল নাগের বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে জানিয়েছেন, তিনি অনুমোদন ছাড়া অনুপস্থিত থাকার পাশাপাশি মোবাইল ফোনও রিসিভ করেন না। তাই তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। 

ডা. উৎপল নাগ মোবাইল ফোনে গত ১৯ আগস্ট বলেন, ‘আমার মা মারা যান। এরপর আমি নিজে অসুস্থ থাকায় যাতায়াতে সমস্যার কারণে কর্মস্থলে যাওয়া সম্ভব হয়নি।’ তিনি বদলি হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে জানান। গত সপ্তাহে তাঁকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ওএসডি হিসেবে বদলি করা হয়েছে। 

তালতলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার মো. মোজাম্মেল ২০২৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর থেকে অনুপস্থিত। তাঁর স্থায়ী ঠিকানায় চিঠি পাঠিয়েও উত্তর পাননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সম্প্রতি তিনি মোবাইল ফোনে বলেন, ‘আমার পরিবার ঢাকায় থাকে। তাই এত দূরে গিয়ে চাকরি করা সম্ভব না। চেষ্টা করছি ওখান থেকে বদলি হওয়ার জন্য।’

যাদের বিরুদ্ধে মামলা

২০২৩ সালের ৭ আগস্ট থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত বেতাগী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. সিগমা ওয়ালিন। একই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্যাথলজিস্ট ডা. শায়ন্তা ঘোষ, বামনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. এস এম সাদিকুর রহমান ২০২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে অনুপস্থিত। ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর থেকে অনুপস্থিত আমতলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরএমও ডা. ফাইজুর রহমানের বিরুদ্ধে। পাথরঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডা. মো. রুবাইয়াত আলী ২০২৩ সালের ২৫ অক্টোবর ৫ দিনের নৈমিত্তিক ছুটি নিয়ে আর যোগ দেননি। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে। অপরদিকে বরগুনা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক (কার্ডিওলজি) ডা. মো. মাসদুর রহমানও বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত। এ কারণে গত ২৪ আগস্ট তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ওএসডি করে সহকারী সার্জন ডা. মো. মেহেদী হাসান ও ডা. গোলাম আহমেদ ফাহিমকে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে বদলি করা হয়েছিল। তারা যোগদান না করায় এ বিষয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। 

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরগুনা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফা কাদেরের অভিযোগ, চিকিৎসকদের বড় একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। যে কারণে তারা প্রশাসনিক কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করেন না।

সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ্‌ এ বিষয়ে বলেন, পদায়ন হওয়ার পরও দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার সুযোগ নেই। যে কারণে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন।

আরও পড়ুন

×