‘কালো ধান’ নিয়ে হতাশ কৃষক
কিনতে নারাজ ব্যবসায়ী ও খাদ্যগুদাম
সিলেটের নলুয়ার হাওর থেকে ডুবে যাওয়া ধান সংগ্রহ করে ফিরছেন কৃষক। সম্প্রতি তোলা। ছবি: সমকাল
জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:৫৮ | আপডেট: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:৫৮
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার বোরো চাষিরা ধানের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে অর্থ সংকটে পড়েছেন। বৈরী আবহাওয়া ও জলাবদ্ধতায় ভিজে কালো হয়ে যাওয়া ধান বাজারে বিক্রি না হওয়ায় তাদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।
কৃষকরা বলছেন, পানির নিচ থেকে আপ্রাণ যুদ্ধ করে ফসল তুলতে হয়েছে, তার ওপর বাজারে ক্রেতা নেই। এভাবে ঘরে ধান রেখে অভাবে মরতে হচ্ছে তাদের। বহু কৃষকের জীবনে নেমে এসেছে দুর্দিন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা ও সংসারের সব ব্যয় নির্বাহ হয় একমাত্র বোরো ধান বিক্রির ওপর। ছেলেমেয়ের পড়াশোনা, ঘর মেরামত, চিকিৎসা, পারিবারিক বিয়ে থেকে শুরু করে বিগত মৌসুমের চাষাবাদের দেনা শোধ এবং আগামী মৌসুমের খরচের সবকিছু এই আয়ের ওপর নির্ভরশীল।
এ বছর বোরো ফসল তোলার শুরুতে অব্যাহত বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতায় হাওরের অনেক ফসল তলিয়ে যায়। বর্গাচাষিসহ ক্ষুদ্র কৃষকরা পানিতে ডুবে থাকা ধান প্রাণপণ চেষ্টা করে তুললেও তা বিক্রি করতে পারছেন না। দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকায় এবং ভিজে যাওয়ার কারণে ধানের রং কালো বর্ণ ধারণ করেছে, যা বাজারে সম্পূর্ণ অবিক্রীত পড়ে রয়েছে।
উপজেলার মেঘারকান্দি গ্রামের কৃষক দ্বিজেশ দাস জানান, তিনি ১৫০ মণ ধান তুলেছেন। আবাদ থেকে শুরু করে কাটা পর্যন্ত প্রতি মণে অন্তত ৮০০ টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু বাজারে ভালো ধানের দাম ৭০০ টাকা এবং কালো রঙের ধান মাত্র সাড়ে ৪০০ টাকা মণ হাঁকছেন ক্রেতারা। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সরকারি খাদ্যগুদামে ধান বিক্রি করা তাদের জন্য স্বপ্ন। বিভিন্ন অজুহাতে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এমন অবস্থা চলতে থাকলে অনেক কৃষক আগামীতে বোরো আবাদ করতে পারবেন কিনা, তা নিয়েও সন্দেহ পোষণ করেছেন।
দাসনোওয়াগাঁও গ্রামের কৃষক সারদা চরণ দাস বলেন, এক হালি জমি আবাদ করেও এক ছটাক ধান তুলতে পারিনি। সরকার যে তিন মাসের নগদ অর্থ ও চাল দিয়ে সহায়তা দিয়েছে, তা পর্যাপ্ত নয়। আগামী বোরো মৌসুমের ফসল ওঠার আগ পর্যন্ত এ সহায়তা চালিয়ে যাওয়া দরকার ছিল। এ ছাড়া কৃষকদের টিকে থাকার কোনো সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়ন, বরাদ্দ বিতরণ ও প্রাপ্তিতে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন অনেকে। এ নিয়ে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
হাওর বাঁচাও আন্দোলন সংগঠনের জগন্নাথপুর উপজেলা কমিটির সদস্য সচিব আমিনুল হক সিপন বলেন, প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে ফসল ফলানোর পর কৃষক ন্যায্যমূল্য না পেলে চাষাবাদে আগ্রহ হারাবেন। ধান নষ্টের দায় কৃষকের নয়। এমন পরিস্থিতি কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষায় কৃষকদের উদ্ধারে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
জগন্নাথপুর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এবার ২০ হাজার ৪২৩ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়। এক লাখ ২৮ হাজার ৫০৯ টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও উৎপাদন হয়েছে এক লাখ ২৫ হাজার টন। প্রাথমিকভাবে আট হাজার কৃষককে ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হলেও শেষ পর্যন্ত মূল ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্য থেকে তিন হাজার ৬০৩ জন কৃষক সরকারি সহায়তা পেয়েছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাওসার আহমেদ বলেন, কৃষকরা বিভিন্ন সংকটে থাকলেও তাদের সরকারি প্রণোদনা দিয়ে সহযোগিতা করা হচ্ছে। চাষাবাদের ক্ষেত্রেও তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা দেওয়া হয়। বোরো মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলেও আউশ আবাদে তা পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
উপজেলা ভারপ্রাপ্ত খাদ্য কর্মকর্তা (এলএসডি) শিবু ভূষণ পাল জানান, চলতি মৌসুমে ৩ মে থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এক হাজার ৯৮২ টন ধান ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। তবে ৯ আগস্ট হঠাৎ সরকার ধান ক্রয় বন্ধ করে দেওয়ায় এক হাজার ১১৪ টন ধান সংগ্রহ করে কার্যক্রম সমাপ্ত ঘোষণা করতে হয়।
- বিষয় :
- সুনামগঞ্জ