সহজিয়া
জীবন্ত মহাবিশ্ব এবং মুখস্থ শিক্ষার জগদ্দল
আনুশেহ আনাদিল
আনুশেহ আনাদিল
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:১৩
কোনো নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসে কথাগুলো লিখছি না, কিংবা ঢাকা শহরের তথাকথিত বুদ্ধিজীবী সমাজের ড্রয়িংরুমে বসে কথা বলছি না। নিজের জীবন অজস্র ভুল, দৃশ্যমান ফাটল এবং অন্ধকার গলিতে হেঁটে আসা মানুষের বিনম্র আত্মোপলব্ধিতে ভরা। সাধারণ একজন মা হিসেবে লিখছি– যে নারী এই বাংলাদেশের মাটিতেই নিজের খুঁটি গেড়েছে, যে এই মাটি ছেড়ে যেতে অস্বীকার করে এবং যে মানুষের ভেতরের অন্তর্নিহিত মনুষ্যত্বের ওপর অবিচল বিশ্বাস রাখে।
মানুষের জীবনে, রাষ্ট্রের শাসনে সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্তটি তখনই আসে যখন আমরা শেখা বন্ধ করে দিই; নতুন তথ্যের সামনে নিজেদের মনকে বন্ধ করে ফেলি এবং নিজেদের ‘পরম সত্যের একমাত্র রক্ষক’ ঘোষণা করি। যে মুহূর্তে আমরা বিশ্বাস করতে শুরু করি যে আমাদের আর নেওয়া, বোঝা বা বড় হওয়ার প্রয়োজন নেই, ঠিক সেই মুহূর্তেই আমরা একটি আবদ্ধ বাক্সে পরিণত হই। আমরা পাথরে পরিণত হই।
মহাবিশ্বের দিকে একটু গভীরভাবে তাকান। একটি জড় পাথরকেও যদি আপনি অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে রাখেন, সেখানে আপনি স্তব্ধতা পাবেন না; দেখতে পাবেন এক ঘূর্ণায়মান, জীবন্ত মহাজগৎ। আমাদের শরীরের ভেতরের প্রোটন আর ইলেকট্রনগুলো ঠিক সেই একই গাণিতিক সুষমতায় তাদের নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে ঘুরছে, যেভাবে সৌরজগতের গ্রহগুলো সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। মহাবিশ্বের শতকোটি বছরের ইতিহাস লেখা আছে আমাদের ডিএনএতে। আমরা এক কেন্দ্রীয় আলোকের সঙ্গে, এক পরম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে এবং এই জীবন্ত গ্রহের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত, যেখানে প্রতিটি প্রাণ একই সঙ্গে শ্বাস নেয়।
আপনি যখন অস্তিত্বকে অখণ্ড সত্তা হিসেবে দেখতে শুরু করবেন, তখন একটি গভীর সত্য উন্মোচিত হবে: আপনার কোনো সিদ্ধান্তই বিচ্ছিন্ন নয়। আপনার প্রতিটি ভাবনা, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি সহিংসতার রেশ পুরো সৃষ্টির বুকে তরঙ্গ তৈরি করে। নিজেদের সংকীর্ণ ধারণা বা মতাদর্শের বাক্সে বন্দি করা মানে চারপাশের এই মহাজাগতিক রূপসী অস্তিত্বকে অস্বীকার করা।
ক. অভ্যাসের যান্ত্রিকতা এবং অসহিষ্ণুতার বিষবাষ্প
বিশাল মহাবিশ্বে আমরা কীভাবে এত ক্ষুদ্র হয়ে গেলাম? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের সামাজিক অভ্যাসের চরম ট্র্যাজেডিতে– আমাদের সমাজকে ঘিরে থাকা সেই অনুভূতিহীন, যান্ত্রিক পুনরাবৃত্তির ভেতর।
এই বাংলায় ছোটবেলা থেকে সন্তানদের শুধু মুখস্থ করতে এবং আওড়ে যেতে শেখানো হয়। আমরা রবীন্দ্রসংগীত গাই কিংবা দেশাত্মবোধক কবিতা আবৃত্তি করি, কিন্তু কখনও তার আত্মাকে অনুভব করার নিমন্ত্রণ পাই না। তা হয়ে ওঠে একটি যান্ত্রিক অনুশীলন– হৃদয়ের জাগরণ নয়, কেবল স্মৃতিশক্তির পরীক্ষা। আমাদের নির্দিষ্ট সীমানা দিয়ে বলে দেওয়া হয় কীভাবে ‘ভালো বাঙালি’ হতে হয়, যেখানে প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব উপায়ে সত্যকে উপলব্ধি করার কোনো স্থান রাখা হয় না।
একই ট্র্যাজেডি ঘটে আমাদের ধর্মীয় ঐতিহ্যের ভেতরেও। বহু প্রতিষ্ঠানে বিশ্বাসকে কমিয়ে আনা হয়েছে কেবল কিছু যান্ত্রিক নিয়মের পুনরাবৃত্তিতে, যার ভেতর কোনো আত্মিক স্পর্শ নেই। কোমল মনগুলোকে কেবল মুখস্থ করতে এবং অন্ধভাবে মেনে নিতে শেখানো হয়। তাদের কখনোই প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করা হয় না: এর মাঝে ভালোবাসা কোথায়? আমার প্রতিবেশীর সঙ্গে আমার আচরণের মাঝে সেই ঐশ্বরিক আলোর স্পর্শ কোথায়?
এই আড়ষ্ট নিয়মকানুনের চর্চা জন্ম দেয় এক বিষাক্ত অন্ধত্বের; নিজের থেকে আলাদা মানুষের প্রতি বিদ্বেষের। সমাজের সব রূপেই আমরা এটি দেখতে পাই: সেই তথাকথিত অতি-বাঙালি সংস্কৃতির চর্চায় যা চিন্তার পূর্ণ আনুগত্য দাবি করে, আবার সেই কঠোর অনুশাসনের মাদ্রাসা কাঠামোর ভেতরেও যা বৈচিত্র্যকে এক পাপ হিসেবে দেখে।
অথচ কেউ যখন আপনার থেকে আলাদা হয়, ঠিক সেখানেই তো শেখার সবচেয়ে বড় সুযোগটি লুকিয়ে থাকে! প্রকৃতি টিকে থাকে তার বৈচিত্র্যের প্রাচুর্যে। কোনো মানুষকে কেবল তার পোশাক, তার প্রার্থনার ধরন বা তার ভাষার ভিন্নতার কারণে প্রত্যাখ্যান করা মানে সৃষ্টিকর্তা যেভাবে নিজেকে অসীম বৈচিত্র্যে প্রকাশ করছেন, তার প্রতি চোখ বন্ধ করে রাখা।
খ. অর্থায়ন, রাজনীতি ও ইতিহাস ভোলার ট্র্যাজেডি
বর্তমানকে বুঝতে হলে আমাদের ইতিহাসকে সম্মান জানাতে হবে। ১৮৬৬ সালে যখন ভারতীয় উপমহাদেশে দারুল উলুম দেওবন্দের সূচনা হয়েছিল, তার পেছনে ছিল এক মহান ও অদম্য সামাজিক চেতনা; ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এক আত্মিক প্রতিরোধ। ইংরেজরা আমাদের পরিচয় মুছে দিতে চেয়েছিল, আমাদের দেশীয় জ্ঞানকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল এবং পরজীবী শাসনযন্ত্র চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। দেওবন্দ আন্দোলন সেদিন দাঁড়িয়ে বলেছিল, আমরা আমাদের ঐতিহ্য রক্ষা করব; কোনো উপনিবেশকে আমাদের আত্মা কেড়ে নিতে দেব না।
তদুপরি রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা যে সত্যটি এড়িয়ে যান– কওমি মাদ্রাসাগুলো গ্রামবাংলায় ইতিহাসজুড়ে সবচেয়ে বড় সামাজিক সুরক্ষাজাল হিসেবে কাজ করেছে। তারা দেশের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের লাখ লাখ শিশুকে অন্ন, বস্ত্র ও আশ্রয় দিয়েছে– যে শিশুদের কথিত আধুনিক অর্থনীতি পুরোপুরি পরিত্যাগ করেছিল।
এই মাদ্রাসাগুলোর অর্থায়ন আসে কোথা থেকে? এগুলো কোনো সরকারি অনুদানে চলে না। এগুলো চলে সাধারণ মানুষের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনুদান, জাকাত, সদকা, লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের তহবিল, কোরবানির পশুর চামড়া এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ দিয়ে, যারা নিজেদের অর্জিত অর্থ দেশের ধর্মীয় শিক্ষায় দান করে পুণ্য অর্জন করতে চান।
এই আর্থিক স্বাধীনতা এক অনন্য রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। যেহেতু রাষ্ট্র এদের অর্থ দেয় না, তাই রাষ্ট্র চাইলেই এদের পাঠ্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ফলে আমাদের ইতিহাসের প্রতিটি রাজনৈতিক দল এদের সঙ্গে সুযোগসন্ধানী সম্পর্ক বজায় রেখেছে। রাজনীতিকরা এই ব্যবস্থাগুলোর কাছে নতি স্বীকার করেছেন অথবা চোখ বন্ধ করে থেকেছেন। কারণ কওমি বোর্ডগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে লাখ লাখ সুসংগঠিত তরুণ। রাজপথের ক্ষমতা ও ভোটের জন্য রাজনীতিবিদরা এদের ব্যবহার করেন। একই সঙ্গে তাদের ভয়ও পান। কারণ তারা ধর্মীয় অনুভূতির দোহাই দিয়ে রাজপথে বিশাল প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়।

অথচ আজ ইতিহাসের আয়নায় তাকালে এক ট্র্যাজেডি ফুটে ওঠে। আজ যখন মাদ্রাসার শিক্ষার্থী-শিক্ষকরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ বা সিলেটে গান থামিয়ে দেয়, যাত্রাপালা বন্ধ করে দেয়, নৌকাবাইচ বাতিল করে দেয় কিংবা বাউলদের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেয়, তখন তারা আসলে কীসে পরিণত হয়েছে?
তারা ঠিক সেই সত্তায় পরিণত হয়েছে, যাকে তারা একদা প্রতিরোধ করেছিল। শক্তি প্রয়োগ করে লোকজ সংস্কৃতি মুছতে গিয়ে তারা আসলে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের পদ্ধতিই গ্রহণ করে। ইংরেজরা আমাদের লোকজ ঐতিহ্যকে ‘বিপজ্জনক’ মনে করত; উগ্রপন্থিরা সেই একই ঐতিহ্যকে ‘হারাম’ বলে নাকচ করতে চায়। তারা অজান্তেই ঔপনিবেশিক শাসকের ভূমিকায় অভিনয় করে।
বাংলায় ইসলাম তলোয়ারের জোরে কিংবা ফতোয়ার কঠিন শাসনে আসেনি। তা ছড়িয়েছিল সুফি-সাধক, বাউল এবং আউলিয়াদের ভালোবাসা, সুর আর কবিতার মানবিক স্পর্শে। তারা মানুষকে তাদের সংস্কৃতি মুছে ফেলে বিশ্বাস প্রমাণ করতে বলেননি। তারা এই মাটির সোঁদা গন্ধে, নদীতে আর মানুষের অন্তরে সৃষ্টিকর্তার উপস্থিতি খুঁজে পেয়েছিলেন।
গ. পৃথিবীকে কারাগার ভাবার বিভ্রান্তি
আমরা কেন চারপাশের সুন্দর জগৎকে এত অবহেলা আর নির্মমতার সঙ্গে ধ্বংস করি? এর মূলে রয়েছে এক গভীর ও অনালোচিত ধর্মীয় ও সামাজিক বিভ্রান্তি। বড় ট্র্যাজেডি হলো, এই মানসিকতা তৈরি করা– মানুষকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে পাপের শাস্তি হিসেবে। যখন কোনো শিশু শিখবে যে, পৃথিবী নির্বাসন কেন্দ্র মাত্র, তখন তার ভেতর থেকে পৃথিবীকে ভালোবাসা বা রক্ষার আকুলতা মরে যায়। পৃথিবী যদি ধ্বংসেরই অপেক্ষায় থাকে, তবে নদী পরিষ্কার করে কী হবে? গাছ লাগিয়ে কী লাভ?
বাস্তবে পৃথিবী কোনো কারাগার নয়; সেই পবিত্র আধার, যেখান থেকে সমস্ত প্রাণের সৃষ্টি। এই মাটিই জন্ম দিয়েছে প্রত্যেক নবী, প্রত্যেক সাধু, প্রতিটি ফুল, নদী আর আমাদের প্রতিটি শ্বাসের। যখন আমরা মরে যাওয়া নদী, নিঃশেষ হওয়া বন আর বিষাক্ত বাতাসের দিকে তাকাই, আসলে সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পরিণতি দেখতে পাই। বিজ্ঞান আজ তা-ই প্রমাণ করছে, যা বিশ্বাসীরা চিরকাল জেনে এসেছে: মানুষের ভালোবাসা লুকিয়ে আছে মাটির গভীরে, জোয়ার-ভাটায় আর নীল আকাশে। আমরা যখন শিশুদের ভয় না দেখিয়ে এই পৃথিবীর মহাজাগতিক রূপ দেখতে শেখাব, তখন তারা নিজেদের এই পৃথিবীর আসল অভিভাবক হিসেবে চিনতে পারবে।
ঘ. শ্রেণিকক্ষ যখন শাস্ত্র ও বিজ্ঞানের মেলবন্ধন
আমাদের সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা এবং কওমি ব্যবস্থা– উভয় ক্ষেত্রেই জ্ঞানকে বাক্সে ভরে শিশুর মাথায় জোর করে ঢোকাতে চায়, মহাবিশ্বকে অনুভব করতে দেয় না। আমি সন্তানদের কথা শুনেছি। তারা যখন কোনো গাছের কথা জানতে চেয়েছে, কেবল বৈজ্ঞানিক নাম মুখস্থ বলিনি; যে মাটি গাছকে খাইয়ে বড় করছে, যে পতঙ্গ গাছের ছালে আশ্রয় নিয়েছে, তার পাতা কীভাবে বাতাসকে জীবনদায়ী করে তুলেছে– তা নিয়ে আলোচনা করেছি। তারা যখন প্রজাপতির কথা জানতে চেয়েছে, আমরা তার রূপান্তরের রূপকথা দেখেছি। আমরা নদীর পাড়ে বসে, বর্ষাকালের বৃষ্টি দেখে প্রকৃতিকেই করে তুলেছি আসল শ্রেণিকক্ষ।
যদি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার স্কুল ও মাদ্রাসার লাখ লাখ শিশুর জন্যও এমন হতো! চার দেয়ালের ভেতর বন্দি থেকে তোতা পাখির মতো বই মুখস্থ করার বদলে যদি জীবন্ত গ্রহটাই শ্রেণিকক্ষ হয়ে উঠত! এই শিশুরা যখন কোনো নদীর পাড় পরিষ্কার করতে যাবে, নতুন গাছ লাগাবে কিংবা কোনো বন রক্ষা করবে; তারা কোনো পারিশ্রমিক পাওয়া শ্রমিক হিসেবে যাবে না। তারা যাবে সৃষ্টির পাঠশালার শিক্ষার্থী হিসেবে।
শিশু যখন কোনো বীজ রোপণ করে অঙ্কুরিত হতে দেখবে; সে কেবল জীববিজ্ঞান পড়বে না; নিজের চোখে সৃষ্টিকর্তার অনন্ত কুদরতের নিদর্শন দেখতে পাবে। যখন সে একটি নদী পরিষ্কার করবে, সে সেই কাজকে সরাসরি ধর্মের সেই বাণীর সঙ্গে মেলাতে পারবে, যেখানে পানিকে জীবনের উৎস বলা হয়েছে; মেঘের ঘনঘটা আর শুষ্ক মাটির জেগে ওঠার কথা বলা হয়েছে, এবং সেই মহাজাগতিক ভারসাম্যের কথা বলা হয়েছে, যা রাতের তারা থেকে সাগরের জোয়ারকে ধরে রাখে।
এখানে বিজ্ঞান আর বিশ্বাস প্রতিপক্ষ নয়। উদ্ভিদবিজ্ঞান, হাইড্রোলজি, পরিবেশবিজ্ঞান আর ধর্মীয় শাস্ত্র মিলেমিশে ভালোবাসার রূপ নেয়। শিশু তখন বুঝতে শেখে– নদী পরিষ্কার করা বা গাছ রক্ষা করা কেবল কাজ নয়; এটি পরম করুণাময়ের সৃষ্টির সঙ্গে বান্দার অন্তরের সংযোগ।
ঙ. শিক্ষার সঙ্গে ঐশ্বরিক আলোর সম্পর্ক
আমরা যদি বাংলাদেশের আত্মাকে বাঁচাতে চাই, তবে রাজনৈতিক ভীরুতা আর বিদ্বেষের রাজনীতি সরিয়ে আমাদের একটি সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবমুখী পুনর্জাগরণের পথে হাঁটতে হবে:১. মাদ্রাসা শিক্ষা বা কওমি ব্যবস্থার পেছনে থাকা বিশাল আর্থিক শক্তিকে, বিশেষত প্রবাসীদের দান ও দেশের মানুষের জাকাতকে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি পরিবেশগত ও বাস্তবমুখী শিক্ষার কাজে লাগাতে হবে।
মাদ্রাসার পাশাপাশি স্কুলের শিক্ষার্থীদেরও গাছের চারা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনে দিতে হবে যাতে নদী, বন ও প্রান্তরগুলোও শিশুদের শ্রেণিকক্ষ হয়ে উঠতে পারে।
২. সব শিক্ষা বোর্ডকে দেশের সব পাঠ্যপুস্তক পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। অন্য প্রাণীর প্রতি, অন্য মানুষের প্রতি, অন্য ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি যাতে বিদ্বেষ সৃষ্টি না করে। আমাদের সন্তানদের শেখাতে হবে– নিজের থেকে আলাদা মানুষের কাছ থেকে শেখাই হলো মানুষের বড় হওয়ার সবচেয়ে সুন্দর নিয়ম।
৩. স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের চার দেয়ালের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করতে হবে। পাঠ্যক্রমে প্রকৃতির মাঝে গিয়ে শিক্ষার সুযোগ দিতে হবে। ধর্মতত্ত্বের পাশাপাশি বিজ্ঞান, উদ্ভিদবিজ্ঞান ও পরিবেশবিদ্যা শেখাতে হবে। একটি শিশু যখন পানির পবিত্রতা নিয়ে পড়বে; নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে তার প্রতিবেশ ব্যবস্থা নিয়ে পড়াশোনা করবে; মহাজাগতিক ভারসাম্যের কথা পড়বে; গাছ লাগিয়ে প্রকৃতির ছন্দকে অনুভব করবে; তখন সে নিজেকে এই পৃথিবী ও মহাজগতের মূল্যবান অংশ হিসেবে ভাবতে শিখবে।
৪. স্কুল-মাদ্রাসা এলাকায় শিশু সুরক্ষায় অভিভাবক কমিটি গঠন করা যাতে পারে যাতে তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও ব্যবস্থাপনা কমিটি, কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মিলে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন। শিশু নির্যাতন ও যৌন হয়রানি বন্ধ করতে পারেন। বাল্যবিবাহ ও যৌন হয়রানি বন্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন। শিশুর শরীর ও মনের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই হবে এর প্রধান লক্ষ্য।
৫. শিশুরা যাতে আমাদের লোকজ ঐতিহ্যকে চিনতে পারে; এর গুরুত্ব বুঝতে পারে; এ জন্য সামাজিক সহাবস্থান ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান বাড়াতে হবে। জারি গান, যাত্রাপালা, নৌকাবাইচ ও মেলার মতো আয়োজনকে আমাদের হাজার বছরের যৌথ ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি ও সুরক্ষা দিতে হবে।
আমাদের সন্তানদের রক্ষা করে, আমাদের ইতিহাসের মূল শিকড়কে না ভুলে এবং এই জীবন্ত পৃথিবীকে আসল পাঠশালা বানিয়ে আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারি, যেখানে প্রত্যেক শিশু মুক্ত প্রান্তরে দৌড়াবে; একটি পরিষ্কার নদীতে পরম সত্তার স্পর্শ পাবে এবং কোনো ভয় ছাড়াই নিজের স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকবে।
আনুশেহ আনাদিল: সংগীতশিল্পী ও সমাজকর্মী
- বিষয় :
- বিশ্ব