কক্সবাজার রেলপথের দুই পাশে আকাশমণি, ঝুঁকিতে প্রাণ-প্রকৃতি
চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের ধ্বংস করা বনাঞ্চলের ক্ষতি পোষাতে রোপণ করা হয় আকাশমণি গাছ
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনের দুই পাশে রোপণ করা আকাশমণি গাছের চারাগুলো দিন দিন বড় হয়ে বন ও বন্যপ্রাণীর জন্য বিপদের কারণ হয়ে উঠছে। সম্প্রতি তোলা- সমকাল
তৌফিকুল ইসলাম বাবর, চট্টগ্রাম, মাহমুদুর রহমান, চকরিয়া
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪৪ | আপডেট: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণের সময় কাটা হয় সংরক্ষিত বনাঞ্চলসহ পাহাড়ের আড়াই লাখ গাছ। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে একটির বদলে রোপণ করা হয় তিনটি করে গাছের চারা। বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য বলছে, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে রেলপথের দুই ধারে সাত লাখ ২০ হাজার গাছের চারা লাগানো হয়। বন বিভাগকে এড়িয়ে রেলওয়ে নিজেরা রোপণ করে এসব চারা। এসব গাছের বড় অংশই আকাশমণি। দ্রুত বর্ধনশীল এ গাছগুলোই বন্যপ্রাণী, বন, পরিবেশ ও মানুষের জন্য এখন ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রেলপথের দুপাশে শিমুল, পলাশ, কৃষ্ণচূড়া, ছাতিম ও সোনালু ফুলের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের বনজ ও ফলদ গাছের চারা রোপণ করার কথা ছিল। এসব গাছগাছালি এখানকার বন্যপ্রাণী ও পশুপাখির খাবারের জোগান দিত; পর্যটকের ট্রেন ভ্রমণের আনন্দ বাড়িয়ে দিত আরও। বন, পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরাও বিষয়টি মাথায় রেখে পরামর্শ দিয়েছিলেন রেলওয়েকে। কিন্তু অযত্ন-অবহেলায় বিভিন্ন প্রজাতির গাছ মরে গেলেও শুধু টিকে আছে লাখো আকাশমণি!
বন ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আকাশমণি গাছ অতিরিক্ত পানি শোষণ করে নেওয়ায় মাটির নিচে পানির স্তর ও আর্দ্রতা কমিয়ে দেয়। এ কারণে আশপাশে অন্য কোনো গাছ, লতাগুল্ম সহজে বাঁচতে পারে না। গাছটির পাতা পড়ে মাটির উর্বরতা শক্তিও নষ্ট করে দেয়। ১০ বছরের মধ্যেই আকাশমণি গাছ থেকে ভালোমানের কাঠ পাওয়া যায়। ফলে গাছটি থেকে অনেক কম সময়ে কাঠ পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদি বনাঞ্চল গড়ে তোলা যায় না।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০২ কিলোমিটার রেলপথের অন্তত ২৭ কিলোমিটার গেছে তিন বনাঞ্চল চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, ফাসিয়াখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যানের মধ্য দিয়ে। এতে কাটা পড়ে নানা জাতের আড়াই লাখ গাছ। এসব গাছের বিপরীতে যেসব চারা রোপণ করা হয়েছিল সেগুলোর দুই-তৃতীয়াংশই হাওয়া হয়ে গেছে! তবে যেসব গাছ টিকে আছে, এর তিন-চতুর্থাংশই আকাশমণি। এ হিসাবে টিকে থাকা আকাশমণির সংখ্যা লাখের কাছাকাছি। রেলওয়ের লাগানো গাছের মধ্যে টিকে রয়েছে দুই লাখ ৬৭ হাজার গাছ। হাওয়া হয়ে গেছে চার লাখ ৫৩ হাজার চারাগাছ। অথচ বন বিভাগের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, ১০ বছর পর্যন্ত এসব গাছ রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যার কথা রেলওয়ের।
কক্সবাজার রেলপথের একটি অংশ গেছে চকরিয়ার ডুলাহাজারা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের মধ্য দিয়ে। সম্প্রতি এই বনাঞ্চলের শাহারবিল থেকে পূর্ব বড় ভেওলা এবং মালুমঘাট থেকে ডুলারছড়া পর্যন্ত রেলপথ ঘুরে দেখা যায়, রেলপথের দুপাশে সারি সারি আকাশমণি গাছ। দুই কিলোমিটারে হাতেগোনা কয়েকটি অর্জুন, জাম, চালতা, জলপাই ও জারুল গাছের চারা দেখা গেছে। এসব গাছের চেয়ে আকাশমণি বড় হয়ে উঠছে অন্তত তিন গুণ বেশি।
স্থানীয় ডুলারছড়া এলাকার বাসিন্দা আরেফা বেগম সমকালকে বলেন, অনেক আগে গাছের চারাগুলো রোপণ করা হয়েছে। এগুলো কী অবস্থায় আছে, তা দেখতে কাউকে এখানে আসতে দেখিনি। গরু-ছাগলে চারাগাছ খেয়ে ফেলছে। তবে আকাশমণির গাছের চারা গরু-ছাগল খেতে চায় না।
কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত রেলওয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, রেলপথ নির্মাণে বনের যে ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে দিতে বন বিভাগের চাহিদা অনুযায়ী রেলওয়ের তরফে গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। আকাশমণি দ্রুত বাড়ে, ডালপালা প্রসারিত হয়ে বন-জঙ্গলে রূপ নেয়। এ জন্য এই ধরনের গাছ লাগানো হয়েছে।
গত বছরের ১৫ মে বন, পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনা করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের বন-১ অধিশাখা থেকে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি গাছের চারা তৈরি, রোপণ ও বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়। তবে আগে থেকেই নিষিদ্ধ ছিল ইউক্যালিপটাস গাছ।
আকাশমণি গাছের ক্ষতিকর দিক রেলওয়েকে জানানো হলেও কেন এ ধরনের গাছ লাগানো হয়েছে– এমন প্রশ্নে কক্সবাজার রেলপথ প্রকল্পের সেই কর্মকর্তা অবশ্য জানিয়েছেন, যখন আকাশমণি গাছ লাগানো হয়, তখন সরকারের তরফে এই গাছের চারা রোপণে নিষেধাজ্ঞা ছিল না।
বাংলাদেশ বন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিএফআরআই) এক গবেষণা বলছে, ফুল ফোটার সময় আকাশমণিতে প্রচুর পুষ্পরেণু সৃষ্টি হয়, যা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। আকাশমণির পুষ্পরেণু অপেক্ষাকৃত ভারী ও আঠালো হওয়ায় স্বাভাবিক বাতাসে নিচে দিয়ে এটা গাছ থেকে ১৫-২০ মিটার দূর পর্যন্ত ভেসে যেতে পারে। ফলে এগুলো মানুষের নাকের নাগালের মধ্যে থাকে। বায়ুবাহিত পুষ্পরেণু নিঃশ্বাসের সঙ্গে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে অ্যালার্জি সংক্রমণ ঘটিয়ে থাকে। ফলে সংক্রমিত ব্যক্তির জ্বর, অ্যালার্জি রাইটিনেজ, আর্টিকারিয়তি, একজিমা, অ্যাজমাসহ নানা রোগ হতে পারে।
গবেষণায় আরও বলা হয়, গাছটি অতিরিক্ত পানি শোষণ করে মাটিকে শুষ্ক করে দেয়। গাছ তার নিচের উদ্ভিদ আচ্ছাদন (আন্ডারগ্রোথ ভেজিটেশন) নষ্ট করে ফেলে এবং এটি থেকে রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরিত হয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন সমকালকে বলেন, আকাশমণি গাছের বেশ কিছু নেতিবাচক দিক আছে। গাছটি অতিরিক্ত পানি শোষণ করে, এ গাছ থেকে পশু-পাখি খাবার পায় না– সবই ঠিক আছে। তবে এটির কিছু ভালো দিকও রয়েছে, যেমন– লবণাক্তসহ যেসব এলাকায় অন্য কোনো গাছ লাগানো যায় না কিংবা যেসব এলাকায় পতিত জায়গা আছে, সেখানে এ গাছ লাগানো যায়। আবার গাছটির শিকড় মাটি ধরে রেখে ভাঙনরোধে সহায়তা করে, প্রতিকূল পরিবেশেও বেড়ে উঠতে পারে।
তিনি বলেন, অন্যান্য গাছের চারার সঙ্গে কিছু আকাশমণির চারাগাছ রোপণ করা যেত। সমস্যা হয়ে গেছে, কক্সবাজার রেলপথে একচেটিয়া আকাশমণি রোপণ করা হয়েছে। এগুলো দ্রুত বড় হয়ে যাচ্ছে। এক পর্যায়ে কেটে না ফেললে ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ফলে দীর্ঘ মেয়াদের জন্য কিংবা একটি বনাঞ্চল গড়ে তোলার জন্য এটি আদর্শ গাছ নয়। ফলে বনাঞ্চল ফিরে পেতে এসব গাছ লাগানো হলেও সেই উদ্দেশ্য সফল হওয়া নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
বন সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করা আরণ্যক ফাউন্ডেশনের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, কোনো প্রাকৃতিক বনে আকাশমণি লাগানো উচিত নয়। তাঁর মতে, আকাশমণি গাছের বীজ মাটিতে পড়ে ঘন হয়ে চারা গজায়, যা বনের প্রতিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। পতিত জমিতে এই গাছ লাগানো যেতে পারে। কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো গাছপালা ও ঝোপঝাড় কেটে আকাশমণি লাগানো উচিত নয়।