আকস্মিক বৃষ্টি
ধান-ডাল সব গেছে পানির নিচে
বাগেরহাটের কচুয়ায় ভিজে যাওয়া ধান মাথায় করে বাড়িতে নিচ্ছেন কৃষক। গত শুক্রবার উপজেলার ধলনগর গ্রামে সমকাল
বাগেরহাট ও দুমকী (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬ | ০৮:১০
| প্রিন্ট সংস্করণ
বর্গা নেওয়া দুই বিঘা জমিতে ধানের আবাদ করেন ষাটোর্ধ্ব বিনয় সরকার। প্রতি বছর এই জমিতে ধান উৎপাদন হয় ৮০-১০০ মণ। এই ধান দিয়ে চার সদস্যের পরিবারের কয়েক মাস চলে যায়। চলতি মৌসুমে বিনয় সরকারের মাথায় যেন বজ্রাঘাত হয়েছে। আকস্মিক বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে মাঠে কেটে রাখা ধান। গত শুক্রবার বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার বারুইখালী গ্রামে দেখা যায় চাষিদের এই দুর্ভোগের চিত্র।
বিনয় সরকার বললেন, ‘টানা বৃষ্টিতে যে পরিমাণ পানি জমছে, কবে নামবে তার ঠিক নেই। ধান গজ (অঙ্কুর) উঠে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যে অবস্থা দেখছি এ বছর, সর্বোচ্চ ৩৫-৪০ মণ ধান পেতে পারি।’ এতে খরচের টাকাও উঠবে না বলে আফসোস করতে থাকেন তিনি।
কৃষকরা অভিযোগ করেছেন, কৃষি অফিস থেকে বৃষ্টির কোনো পূর্বাভাস পাননি তারা। আবহাওয়া খারাপের সংবাদ পেলে আগেই ধান কেটে নিরাপদ জায়গায় রাখতেন এবং এত বড় লোকসান থেকে রক্ষা পেতেন।
বারুইখালীর পাশেই ধলনগর গ্রাম। এই গ্রামের কৃষক ইয়াসিন আলীকে শুক্রবার সকালে পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ধানে একটু চাল-চাল ভাব আসলেই প্রথমে শিলাবৃষ্টিতে একদফা ক্ষতি হয়। তখনই অনেক ধান ঝরে গেছে। এবার গেল পাকা ধান পানির নিচে। এবার ধানের দাম অন্য
বছরের চেয়েও কম। মণ ৮০০ টাকা। এর চেয়ে কম দামেও বিক্রি হচ্ছে।
দিনমজুর মুজিবর শেখের (৫৫) দুঃখটা যেন অন্যদের চেয়ে বেশি। দিনমজুরির পাশাপাশি সমিতি থেকে ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে এক বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছিলেন। তার সংসারে সদস্য ৫ জন। কিছুটা সচ্ছলতা ফেরাতে ঋণ নিয়ে চাষ করেন। এখন উল্টো বিপদে পড়েছেন। ধান নষ্ট হয়ে লোকসান তো হয়েছেই, কাঁধে চেপে বসেছে ঋণের বোঝা। কীভাবে শোধ করবেন– সে চিন্তায় দিশাহারা তিনি।
মুজিবর শেখ বলেন, বৃষ্টিতে ধান নষ্ট না হলে
এক বিঘা জমি থেকেই প্রায় ৬ মাসের চালের ব্যবস্থা হয়ে যেত। এখন যে শ্রমিক দিয়ে ধান কাটাবেন, তারও উপায় নেই। একজন শ্রমিককে দিনে ১২০০-১৩০০ টাকা দিতে হয়। সঙ্গে তিন বেলা খাবার,
চা-নাস্তা দিয়ে ১৬০০ টাকার বেশি খরচ হয়ে যায়। দুই মণ ধান বিক্রির টাকা একজন শ্রমিকের পেছনে কীভাবে খরচ করবেন– তাই বাধ্য হয়ে মাঠেই ফেলে রেখেছেন ধান।
একই এলাকার কৃষক ইয়াকুব আলী হাওলাদার ৪ বিঘা জমি বর্গা নিয়ে বোরো চাষ করেন। এতে তার খরচ হয়েছে প্রায় ১ লাখ টাকা। মৌসুমের শুরুতেই যে শিলাবৃষ্টি হয়েছে, এতে প্রতি বিঘায় ৫-৭ মণ ধান ঝরে যায়। এখন জমিতে বৃষ্টির পানি হাঁটুসমান। ইয়াকুব আলী বললেন, ‘এ বছর ধানের দামও গতবছরের তুলনায় ২৫০-৩০০ টাকা কম। যে অবস্থা দেখছি সর্বোচ্চ ৬০-৭০ হাজার টাকা বেচাকেনা হতে পারে।’
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় এবার ৬৮ হাজার ১৭১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বাগেরহাট কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মোতাহার হোসেন বলেন, জেলায় ১৫ হাজার হেক্টরের মতো জমির ধান কাটা হয়েছিল। বাকি আছে ৫৩ হাজার হেক্টরের মতো জমি। এর মধ্যে ভারী বৃষ্টি ও ঝোড়ো বাতাসে কিছু জমির ধান হেলে পড়ছে। অনেক কৃষকের জমিতে কাটা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে মোট উৎপাদনের ৫ শতাংশের মতো ধান ঝরে পড়তে পারে। প্রাথমিকভাবে ১২ হাজার ১৮৯ মেট্রিক টনের মতো ধান নষ্ট হতে পারে। ধানের দাম ৮০০ টাকা মণ ধরলে ২৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকার ক্ষতি বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে ফলন ভালো হওয়ায় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে।
তলিয়েছে মুগডালের ক্ষেত
পটুয়াখালীর দুমকী উপজেলার শ্রীরামপুর ইউনিয়নের চরবয়েড়া গ্রামে বাড়ি মজিবুর রহমান গাজীর। চলতি মৌসুমে দুই একর জমিতে মুগডাল ও মরিচের আবাদ করেন। কয়েকদিনের বৃষ্টিতে পুরো ক্ষেত তলিয়ে গেছে। ধারদেনা করে জমি চাষ করেছিলেন তিনি। কীভাবে সেই ঋণ শোধ করবেন, কীভাবেই সংসার চালাবেন– তা ভেবে পাচ্ছেন না।
একই এলাকার কৃষক মিজান খলিফা ও জাকির খানের ফসলি জমিও তলিয়ে গেছে। যে কারণে তাদের যা ক্ষতি হয়েছে, তা কোনোভাবেই পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র জানায়, দুমকীর পাঁচটি ইউনিয়নে ৪২০০ হেক্টর জমিতে মুগডাল, ২০০ হেক্টর জমিতে বাদাম, ১৫০ হেক্টর জমিতে মরিচসহ তিল ও অন্যান্য ফসলের আবাদ করা হয়েছে। বৃহস্পতি ও শুক্রবারের ঝড়–বৃষ্টিতে উপজেলার মুরাদিয়া, শ্রীরামপুর, আঙ্গারিয়া, লেবুখালী ও পাঙ্গাশিয়া ইউনিয়নের সব এলাকার ফসলই তলিয়েছে। ১০-১৫ দিনের মধ্যেই এসব এলাকার জমি থেকে চাষিরা মুগডাল, বাদাম, তিল, সূর্যমুখী, মিষ্টি আলু ও মরিচ তুলতেন। তার আগেই সব হারিয়ে লোকসান গুনতে হবে।
- বিষয় :
- বৃষ্টি
