এপ্রিলে স্বাভাবিকের প্রায় দ্বিগুণ বৃষ্টি, এ মাসে ঘূর্ণিঝড়ের আভাস
প্রতীকী ছবি
জলবায়ুবিষয়ক প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ | ১০:২৭
দেশে সদ্য বিদায়ী এপ্রিলে স্বাভাবিকের তুলনায় ৭৫ শতাংশের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এটি চলতি মৌসুমের আবহাওয়াকে অস্বাভাবিক করে তুলেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে বরিশাল বিভাগে। সেখানে স্বাভাবিকের চেয়ে ১৬৯ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। অতিবৃষ্টির প্রভাবে তাপমাত্রা তুলনামূলক সহনীয় থাকলেও কৃষি খাতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।
এই অবস্থায় চলতি মাসজুড়েও ঘূর্ণিঝড়, তীব্র কালবৈশাখী, বজ্রপাত ও শিলাবৃষ্টির আশঙ্কা জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় টানা বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে এবং কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে কৃষকদের জন্য দুর্ভোগ আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের মে মাসের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এ মাসে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হলেও এক থেকে দুটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে। এটি একটি নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া মাসজুড়ে পাঁচ থেকে ছয়টি কালবৈশাখী হতে পারে, যার মধ্যে দুই থেকে তিনটি তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।
বাংলাদেশে এপ্রিল সাধারণত সবচেয়ে উষ্ণ মাস হিসেবে পরিচিত। এ সময় গড় তাপমাত্রা থাকে ৩৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এবার সর্বোচ্চ ও গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় যথাক্রমে দশমিক ৬ ডিগ্রি ও দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম ছিল। মাসজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ দেখা যায়নি; বরং বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি অঞ্চলে স্বল্প সময়ের জন্য তাপপ্রবাহ হয়েছে।
গত ২২ এপ্রিল রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠলেও তা স্থায়ী হয়নি। মাসের শুরুতে তাপপ্রবাহ শুরু হলেও দ্রুতই বৃষ্টির কারণে তা কমে যায়। দ্বিতীয় সপ্তাহে আবার তাপপ্রবাহ দেখা দিলেও তা এক সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়নি এবং দেশের সব এলাকায় ছড়ায়নি। মাসের শেষ দিকে আবার বৃষ্টিপাত বেড়ে যায়, যার প্রভাব মে মাসের শুরুতেও বজায় রয়েছে। বৃষ্টিপাতের দিক থেকে বরিশাল বিভাগের পর ঢাকা বিভাগে প্রায় ৮০ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। তবে রাজশাহী বিভাগে স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা কম বৃষ্টি হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ বলেন, মে মাসের প্রথম ১০ দিন থেমে থেমে বৃষ্টি হতে পারে, ফলে তাপমাত্রা সহনীয় থাকবে। এরপর তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে পারে। ১৫ মের পর স্বল্পমেয়াদি তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে, যা ছয় থেকে সাত দিন স্থায়ী হতে পারে।
আবহাওয়াবিদ একেএম নাজমুল হক বলেন, এ বছর এপ্রিল মাসে বৃষ্টিপাতের ধরন ছিল অস্বাভাবিক। সাধারণত এ সময় ভারতের উজানে বেশি বৃষ্টি হয়। কিন্তু এবার বাংলাদেশের ভাটিতে প্রায় দ্বিগুণ বৃষ্টিপাত হয়েছে।
হাওরে বন্যা ও কৃষি ঝুঁকি
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি নদীর পানি ইতোমধ্যে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সিলেট ও সুনামগঞ্জের সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি আগামী তিন দিনে আরও বাড়তে পারে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় কুশিয়ারা নদীর কিছু অংশ প্রাক-মৌসুমি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। ফলে হাওর-সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।
নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের ধনু-বাউলাই নদীর পানিও বাড়তে পারে এবং বাউলাই নদী খালিয়াজুড়ি পয়েন্টে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে ওই অঞ্চলের হাওর এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া হবিগঞ্জের কালনী ও সুতাং এবং মৌলভীবাজারের জুড়ী ও মনু নদীর পানিও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে এসব জেলার নিম্নাঞ্চলে নতুন করে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি বা অবনতি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
আবহাওয়ার এই অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে কৃষি খাত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। আগাম বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও সম্ভাব্য ঝড়-বজ্রপাত মিলিয়ে বোরো ফসলসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ছে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে পানির উচ্চতা বাড়লে সদ্য কাটা বা কাটার অপেক্ষায় থাকা ধান আবারও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
চট্টগ্রামে পাহাড় ধসের শঙ্কায় মাইকিং
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চট্টগ্রামে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে পাহাড় ধসের ঝুঁকি এড়াতে রেলওয়ের পক্ষ থেকে মাইকিং শুরু হয়েছে। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রকৌশল বিভাগ গতকাল রোববার সকাল থেকে নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোয় অবৈধভাবে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
রেলওয়ের তথ্যমতে, চট্টগ্রামে রেলওয়ের মালিকানাধীন সাতটি পাহাড়ে পাঁচ হাজার ৩৩২টি অবৈধ স্থাপনা রয়েছে। এসব স্থাপনায় প্রায় অর্ধলাখ মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি রয়েছে ফয়’স লেকের ১, ২ ও ৩ নম্বর ঝিল পাহাড়ে, যেখানে চার হাজার ৪৭৬টি পরিবার অবস্থান করছে। এ ছাড়া মতিঝর্ণা, বাটালি হিল ও বিজয় নগর পাহাড়ের পাদদেশে কয়েক হাজার মানুষ ঝুঁকিতে রয়েছেন।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ জিসান দত্ত জানান, প্রতিবছর ভারী বৃষ্টিতে পাহাড় ধসে হতাহতের ঘটনা ঘটে বলেই এই আগাম সতর্কতা।
- বিষয় :
- ঘূর্ণিঝড়
