পশ্চিমবঙ্গের এবারের নির্বাচন কেন ব্যতিক্রম
পশ্চিমবঙ্গে এবারের বিধানসভা নির্বাচন নানা কারণেই ছিল অভূতপূর্ব
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ | ১৬:৩১ | আপডেট: ০৪ মে ২০২৬ | ১৬:৩৩
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের সহিংসতা একটি নিয়মিত ঘটনা। কিন্তু এবারের বিধানসভা নির্বাচন ছিল অনেকটাই সহিংসতাবিহীন। ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে এটি বড় ধরনের সহিংসতা ও হিংসাত্মক ঘটনা ছাড়াই। এটি পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ঘটনা।
টানা দেড় মাস ধরে ম্যারাথন ভোটপর্ব শেষে আজ সোমবার সকাল থেকে শুরু হয় ভোটগণনা। ভোটের ফলাফল প্রকাশের পর থেকে জানা যাচ্ছে টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার ছিটকে পরেছে তৃণমূল কংগ্রেস। প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা দখল করতে যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।
ভারতে কোনো নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়া আর ভোটগণনা শুরুর মধ্যে যে ব্যবধানটা থাকে, সেই সময়ে যথারীতি সবচেয়ে বেশি আগ্রহ আর চর্চা থাকে ‘এক্সিট পোল’ বা বুথফেরত সমীক্ষা নিয়ে।
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এবারে যে কয়েকটি এক্সিট পোলের ফল সামনে এসেছে, তার প্রায় সবগুলোতেই তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান খুব কম থাকবে বলে পূর্বাভাস করা হয়। এবং গরিষ্ঠতা পেলেও কোনো দলই খুব বিরাট ব্যবধানে জিতবে না বলেও এক্সিট পোলগুলো থেকে ইঙ্গিত মিলে।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে এখন পর্যন্ত ২৯৩ আসনের মধ্যে ১৯২টিতেই এগিয়ে আছে বিজেপি। আর তৃণমূল এগিয়ে আছে মাত্র ৯৬টি আসনে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিই সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।
মোটের ওপর সহিংসতা মুক্ত নির্বাচন
পশ্চিমবঙ্গ বরাবরই রাজনৈতিক সহিংসতার জন্য পরিচিত। বিশেষ করে নির্বাচনী সহিংসতা ওই রাজ্যের এমন একটি বাস্তবতা, যা সব দলের শাসনামলেই কমবেশি বজায় থেকেছে।
ভোটের সময় বুথ দখল, ছাপ্পা ভোট, রাজনৈতিক খুনখারাপি, ভয় দেখিয়ে ভোট দিতে যেতে বাধা দেওয়া, যেখানে যে দলের প্রভাব বেশি সেখানে অন্য দলের পোলিং এজেন্টকে বসতে না দেওয়া—এগুলো কার্যত পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে উঠেছিল।
সেই জায়গায় রাজ্যে এবারের ভোট হয়েছে একেবারে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে। দুই দফার ভোটগ্রহণে গোটা রাজ্যে একটিও সহিংসতাজনিত মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি, বিক্ষিপ্ত কিছু সংঘাত ছাড়া খুব বড় কোনো গন্ডগোলেরও খবর নেই।
এমন কী, প্রথম দফার ভোটগ্রহণের পর ১৫২টি আসনের একটি বুথেও পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ জারি করতে হয়নি নির্বাচন কমিশনকে।
দ্বিতীয় দফার ১৪২টি আসনের ক্ষেত্রে সামান্য কয়েকটি বুথে অভিযোগ ওঠার পর শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার দুটি বিধানসভা আসনের ১৫টি বুথে পুনর্নির্বাচনের কথা ঘোষণা করেছেন নির্বাচন কমিশন। ওই জেলারই ফলতা আসন নিয়েও বেশ কিছু অভিযোগ জমা পড়েছে। সেখানে পুনর্নির্বাচন হবে কি না, তা এখনো জানানো হয়নি।
এর পেছনে অবশ্যই একটা বড় কারণ ভোটের সময় বিপুলসংখ্যক কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি। রাজ্যে এবার মোট ২ লাখ ৪০ হাজার আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য নির্বাচনী সুরক্ষায় মোতায়েন ছিলেন, যা একটি সর্বকালীন রেকর্ড।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বুধবার (২৯ এপ্রিল) জানিয়েছেন, এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ বা ৭০ হাজারেরও বেশি নিরাপত্তা বাহিনী সদস্য ভোট মিটে যাওয়ার দুইমাস পরে পর্যন্তও রাজ্যে অবস্থান করবেন।
পশ্চিমবঙ্গে যেহেতু ‘পোস্ট-পোল’ বা নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতারও বহু পুরনো নজির আছে, বিগত নির্বাচনগুলোর পর পরাজিত দলের কর্মী-সমর্থকদের দলে দলে গ্রামছাড়া হওয়ার বহু ঘটনা আছে, দাবি করা হচ্ছে সেটা ঠেকাতেই এই ব্যবস্থা।
নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা কতটা ঠেকানো যাবে তা অবশ্য বোঝা যাবে আরও কয়েকটা দিন পরেই। কিন্তু ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন যে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সহিংসতার ইতিহাসে একটি নতুন নজির গড়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
সব রেকর্ড ভাঙল ভোটদানের হার
পশ্চিমবঙ্গে এবারের নির্বাচনে দুই দফা মিলিয়ে ভোট পড়েছে ৯২.৪৭ শতাংশ। দেশের স্বাধীনতার পর থেকে রাজ্যে কোনোদিন কোনো নির্বাচনে এত বেশি হারে ভোট পড়েনি।
পশ্চিমবঙ্গে অবশ্য বরাবরই অন্য অনেক রাজ্যের তুলনায় বেশি ভোট পড়ে। কিন্তু শহর-গ্রামাঞ্চল নির্বিশেষে ৯০ শতাংশর কাছাকাছি বা তার বেশি ভোট পড়া ওই রাজ্যের জন্যও একটি নজিরবিহীন ঘটনা।
জাতীয় নির্বাচন কমিশন তাদের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে এর আগে (শতাংশের হিসেবে) সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছিল ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে, আর তা ছিল ৮৪.৭২ শতাংশ। এবার সেই রেকর্ডও ভেঙে চুরমার।
অনেকেই অবশ্য এত বেশি ভোটদানের হারের সঙ্গে ভোটার তালিকার ‘নিবিড় সংশোধন’ বা এসআইআরের সম্পর্ক টানছেন।
বহু পর্যবেক্ষকই বলছেন, এসআইআরের ফলে ভোটার তালিকা থেকে ৯০ লাখেরও বেশি নাম বাদ পড়ায় তালিকা আগের তুলনায় অনেকটাই সঙ্কুচিত হয়েছে, কাজেই এখন ভোটদানের শতকরা হার বাড়াতে পাটিগণিতের হিসেবেই অস্বাভাবিক কিছু নেই।
তবে দ্বিতীয় আর একটা যুক্তি হল, এসআইআরে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’র কারণে যেহেতু লাখ লাখ বৈধ ভোটারেরও নাম বাদ পড়েছে। তাই, তালিকায় নাম থাকা অনেকের মনেও এই ভয়টা ঢুকে গিয়েছিল যে, ‘এবারের ভোট দিতেই হবে, নইলে সামনে আমাদেরও নাম বাদ পড়তে পারে’! অর্থাৎ, আগামী দিনে নাগরিক অধিকার খর্ব হওয়ার আতঙ্কেও ভুগেছেন বহু মানুষ।
সম্ভবত এটাও একটা বড় কারণ যে, বহু মানুষ এবারের ভোটটা দিতে নিজের কেন্দ্রে ফিরে এসেছেন, ভিনারাজ্য থেকে দলে দলে গাঁয়ে ফিরেছেন পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকরা।
আসল কারণটা যাই হোক, ভোটদানের শতকরা হিসেবে ২০২৬-র নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গে এমন একটি রেকর্ড গড়েছে যা ভাঙা হয়তো বেশ কঠিন হবে।
‘বাঙালি অস্মিতা’ নিয়ে বাড়াবাড়ি?
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচনে সেই রাজ্যের নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা, খাদ্যাভ্যাস বরাবরই একটি আলোচিত নির্বাচনী ইস্যু। এক একটি রাজ্যে এক এক সময় তা নিয়ে বহু বিতর্কও হয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিককালে ‘বাঙালিয়ানা’র সংস্কৃতি যেভাবে ইলেকটোরাল ডিসকোর্সকে প্রভাবিত করে চলেছে, তেমনটা বোধহয় আর কোনো রাজ্যেই কখনো হয়নি।
এর একটা বড় কারণ, ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস চিরকাল নিজেদের ‘বাঙলা ও বাঙালির দল’ হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছে, দাবি করেছে বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষার জন্য তারাই সবচেয়ে উপযুক্ত রাজনৈতিক শক্তি।
বস্তুত, ২০২১-র নির্বাচনে তাদের প্রধান স্লোগানই ছিল, ‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়’। এবারের ভোটের আগেও ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বাংলাদেশি সন্দেহে পশ্চিমবঙ্গবাসীদের হেনস্থার ঘটনাতেও তারা ‘বাঙালি বিপন্ন’ বলে আওয়াজ তুলেছে।
উল্টোদিকে বিজেপিকে ওই রাজ্যে লড়তে হচ্ছে—এমন একটা ধারণার সঙ্গে, যে তারা আসলে ‘হিন্দি হার্টল্যান্ড’ বা গোবলয়ের দল—বাঙালিয়ানার সঙ্গে যে দলের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কোনো মিল নেই।
বিজেপি তথা জনসঙ্ঘের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা পশ্চিমবঙ্গের ছিলেন, সেই যুক্তি দিয়েও বিজেপিকে রাজ্যে পায়ের তলায় জমি পেতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে।
বাঙালির সংস্কৃতি রক্ষার বিষয়টি রাজনৈতিক আলোচনায় এত গুরুত্ব পাওয়ার কারণেই ‘অস্মিতা’ শব্দটি পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে এখন বহুল ব্যবহৃত, যেটি এক সময় গুজরাটের নিজস্ব গর্ব বা সংস্কৃতিকে বোঝাতে নরেন্দ্র মোদী খুব ব্যবহার করতেন।
এই তথাকথিত ‘বাঙালি অস্মিতা’ ভোটের ময়দানে এতটা গুরুত্ব পেয়েছে বলেই কলকাতায় একজন বিজেপি প্রার্থীকে মাছ হাতে ঝুলিয়ে প্রচারে বেরোতে হয়েছে কিংবা স্মৃতি ইরানির মতো বিজেপি নেত্রী এসে গর্ব করে বলেছেন, ‘আমি বাংলার বাগচীবাড়ির মেয়ে, মাছের কাঁটা বেছে খেতে জানি!’
উল্টোদিকে মমতা ব্যানার্জী নিজে তো বটেই, অভিষেক ব্যানার্জীসহ দলের অন্য নেতানেত্রীরাও একের পর এক সভায় দাবি করেছেন, বিজেপি রাজ্যের ক্ষমতায় এলে বাঙালির পাতে মাছ-মাংস ওঠা বন্ধ হবে, তখন নিরামিষ খেয়েই বাঁচতে হবে।
হিন্দি বলয়ের মতো নামের শেষে ‘জী’ বলে সম্বোধন করাটা বাঙালির সংস্কৃতি নয়, সেটাও তারা অনেকে মনে করিয়ে দিয়েছেন। একটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে সেই রাজ্যের সংস্কৃতি-ভাষা-খাদ্যাভ্যাস রক্ষার বিষয়টি এতটা রাজনৈতিক গুরুত্ব পাচ্ছে—এরও সম্ভবত সাম্প্রতিক আর কোনো তুলনা নেই!
তীব্র মেরুকৃত প্রচার অভিযান এবং ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক সত্ত্বেও, ভোটার উপস্থিতি রেকর্ড উচ্চতায় (৯২.৪৭%) পৌঁছেছে, যা জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণের ইঙ্গিত দেয়। তবুও, আগের নির্বাচনগুলোর তুলনায় অনেক জেলায় বড় আকারের সংঘর্ষ, বুথ দখল বা নির্বাচন-পরবর্তী ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কম ঘটেছে।
এর একটি প্রধান কারণ ছিল দুই লাখেরও বেশি কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর অভূতপূর্ব মোতায়েন এবং স্পর্শকাতর নির্বাচনী এলাকাগুলোতে নির্বাচন কমিশনের কড়া নজরদারি।
নিরাপত্তাকর্মীদের গ্রামীণ বুথ এবং সংঘাতপ্রবণ সীমান্ত জেলাগুলোর গভীরে মোতায়েন করা হয়েছিল, যা অতীতের নির্বাচনগুলোর তুলনায় আরও শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করেছিল।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
- বিষয় :
- পশ্চিমবঙ্গ
- ভারত
- নির্বাচন
