ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

প্রশাসনে আবার ভারপ্রাপ্ত সচিব প্রথা ফিরল

পদায়ন বন্ধ হয়েছিল ২০১৯ সালে

প্রশাসনে আবার ভারপ্রাপ্ত সচিব প্রথা ফিরল
×

বাংলাদেশ সচিবালয়ের গেট (ফাইল ছবি)

 দেলওয়ার হোসেন

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ | ০৮:৩৬ | আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬ | ০৮:৫৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

সাড়ে ছয় বছর পর প্রশাসনে আবার শুরু হয়েছে ভারপ্রাপ্ত সচিব পদায়ন। এর মধ্য দিয়ে পদোন্নতি ও নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক এড়ানো যাবে এবং জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন রোধ সম্ভব হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তবে অসন্তোষ পিছু ছাড়ছে না। বিশেষ করে সচিব হিসেবে পদোন্নতিপ্রত্যাশী অনেকে মনে করেন, এ উদ্যোগ অবমাননাকর। 

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান (সিএসপি) থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ভারপ্রাপ্ত সচিবের প্রচলন ছিল। বিএনপি, আওয়ামী লীগসহ সব সরকারের আমলেই শুরুতে ভারপ্রাপ্ত সচিব করা হতো। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর সে সময় প্রভাবশালী কিছু আমলা এ ব্যবস্থাকে অবমাননাকর বলে সমালোচনা করেছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে এরপর ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ভারপ্রাপ্ত সচিব পদায়নের বিধান বন্ধ করে দেয় আওয়ামী লীগ সরকার। তবে কোনো সচিব অনুপস্থিত থাকলে সচিবের রুটিন দায়িত্ব পালন করেন অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তারা। 
গত ২৫ মে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগে ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে পদায়ন করা হয় মো. মামুনুর রশীদ ভূঞাকে। এর পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

জানতে চাইলে মামুনুর রশীদ ভূঞা সমকালকে বলেন, ‘আগে ভারপ্রাপ্ত সচিবের পর সচিব করা হতো। মাঝখানে অনেক দিন সেই আদেশ হয়নি। সেই নিয়ম বহাল ছিল, কিন্তু চর্চা ছিল না। আমি হয়তো সেই ব্যক্তি, যাকে দিয়ে আবার ভারপ্রাপ্ত সচিবের পদায়ন শুরু হলো।’

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সচিব পদে সরাসরি পদোন্নতির পরিবর্তে ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের কর্মক্ষমতা মূল্যায়ন করা গেলে প্রশাসনে বিতর্ক কমবে এবং যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচনে সরকার আরও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেন, ভারপ্রাপ্ত সচিব করা কোনো নতুন বিষয় নয়। অতীতেও বিভিন্ন সরকারের আমলে এটি হয়েছে। সাধারণত একজন কর্মকর্তাকে সচিব পদে পদোন্নতির আগে ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারা সচিব পদমর্যাদার পূর্ণ আর্থিক সুবিধা পান না। পূর্ণাঙ্গ সচিব হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার পরই সচিব গ্রেডের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা লাভ করেন।

যে কারণে ফিরছে এ ব্যবস্থা
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একবার কাউকে পূর্ণাঙ্গ সচিব হিসেবে পদোন্নতি দিলে পরে তাঁর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে কিছু সময় দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তাঁর কর্মদক্ষতা, প্রশাসনিক নেতৃত্ব, সততা এবং বিভিন্ন অভিযোগ বা মামলার বিষয় যাচাই করা সম্ভব হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নানা কারণে ১৫ জুন পর্যন্ত ৯ জন সচিব জনপ্রশাসনে সংযুক্ত আছেন। সচিব পদে পদোন্নতির পরও সরকার তাদের কোথাও কাজে লাগাতে পারছে না। 

স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব কাজী আনোয়ার হোসেনকে গত ২৫ মার্চ সচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগে পদায়ন করা হয়। মাত্র দুই মাস পর তাঁকে আবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। 

সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, সচিব পদে সরাসরি পদোন্নতির চেয়ে ভারপ্রাপ্ত সচিব ব্যবস্থা প্রশাসনের জন্য বেশি কার্যকর। কারণ, এতে পদোন্নতি নিয়ে বিতর্ক কমে। আগে অনেক ক্ষেত্রেই ছয় মাস থেকে এক বছর ভারপ্রাপ্ত সচিব রাখা হতো। কর্মদক্ষতা সন্তোষজনক না হলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত।
সচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসএসবির সুপারিশ এবং সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কর্মকর্তাদের সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনও প্রয়োজন হয়।

এ ব্যবস্থাকে ‘অবমাননাকর’ মনে করেন যারা
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সচিব পদোন্নতিপ্রত্যাশী একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ভারপ্রাপ্ত সচিব পদায়নে কর্মকর্তারা অসন্তুষ্ট হন। কারণ, একজন অতিরিক্ত সচিব কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আসেন। এর পর সরাসরি সচিব পদে পদোন্নতি আশা করেন। কিন্তু তাকে ভারপ্রাপ্ত সচিব করা মানে নতুন করে পরীক্ষার মধ্যে ফেলা। শেষমেশ সচিব পদে পদোন্নতি হবে কিনা, তারও ঠিক নেই। তা ছাড়া ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করলেও বেতন-ভাতা বাড়ে না। তিনি অতিরিক্ত সচিবের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। সব মিলিয়ে ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে পদায়নের এ ব্যবস্থা ‘অবমাননাকর’।
 
ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে অবসরের নজির
জনপ্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ভারপ্রাপ্ত সচিব হওয়া মানেই পরবর্তী সময়ে সচিব হওয়া নয়। অতীতে এমন একাধিক নজির রয়েছে। বদরুল আলম তরফদার ২০০৮ সালের ২৩ অক্টোবর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব হলেও পরে সচিব হিসেবে পদোন্নতি পাননি। মোহাম্মাদ গোলাম কুদ্দুস পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব হন ২০১০ সালের ২০ অক্টোবর। এর পর ২০১১ সালের ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে অবসরে যান। আরও কয়েকজন কর্মকর্তা দীর্ঘ সময় ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করে অবসরে গেছেন।

 

আরও পড়ুন

×