ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা জনজবাবদিহিতার মেরুদণ্ড: সুইডেনের রাষ্ট্রদূত

বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা জনজবাবদিহিতার মেরুদণ্ড: সুইডেনের রাষ্ট্রদূত
×

ঢাকায় প্রথমবারের মতো শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স’

সমকাল প্রতিবেদক 

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ | ১৯:২০ | আপডেট: ০৮ মে ২০২৬ | ১৯:৩০

সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস বলেছেন, বর্তমান বিশ্বে জনস্বার্থভিত্তিক ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে, তবে একই সঙ্গে এটি নানা ঝুঁকি ও চাপের মুখেও রয়েছে। শুক্রবার রাজধানীর র‌্যাডিশন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স’ এ তিনি এ কথা বলেন। 

সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে তথ্যের পরিবেশ এখন বহুমুখী সংকটের মধ্যে রয়েছে। ভুল তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা কমছে এবং সাংবাদিকরা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ডিজিটাল চাপের মুখে কাজ করছেন। এমন বাস্তবতায় গণমাধ্যমের কাজ শুধু মূল্যবান নয়, বরং অত্যন্ত অপরিহার্য।

নিকোলাস উইকস বলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা হলো জনজবাবদিহিতার মেরুদণ্ড। এই সাংবাদিকতা প্রথম উত্তরে সন্তুষ্ট থাকে না; বরং ঘটনার গভীরে গিয়ে দুর্নীতি, অবিচার ও ক্ষমতার অপব্যবহার উন্মোচন করে। একই সঙ্গে এটি কণ্ঠহীন মানুষের কণ্ঠ হয়ে ওঠে এবং ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় আনে।

তিনি আরও বলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বিকশিত হলে সমাজ আরও স্বচ্ছ, ন্যায়ভিত্তিক ও সহনশীল হয়ে ওঠে। তবে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ছাড়া এ ধরনের সাংবাদিকতা বিকশিত হতে পারে না।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সাংবাদিকদের বিশেষ সুবিধা নয়, বরং নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে উল্লেখ করে সুইডেনের রাষ্ট্রদূত বলেন, এটি মানুষের সঠিক তথ্য, বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সত্য জানার সুযোগ নিশ্চিত করে—যদিও সেই সত্য অনেক সময় অস্বস্তিকর হতে পারে।

তিনি বলেন, সরকার, করপোরেশন বা অন্য কোনো শক্তি যখন সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা করে, তখন তারা শুধু সংবাদমাধ্যম নয়, জনগণের জানার অধিকারকেও আঘাত করে।

গণমাধ্যমে নারী, তরুণ জনগোষ্ঠী ও সংখ্যালঘুদের সমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন নিকোলাস উইকস। তিনি বলেন, সমাজের বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করাই গণমাধ্যমের দায়িত্ব। যদি বিভিন্ন জনগোষ্ঠী সংবাদমাধ্যমে সমানভাবে উপস্থাপিত না হয়, তাহলে গণমাধ্যম তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে না।

ডিজিটাল যুগে বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা, অ্যালগরিদমভিত্তিক বিভাজন এবং ক্ষোভ উসকে দেওয়ার প্রবণতার মধ্যে গণমাধ্যমের নৈতিক কর্তৃত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এই নৈতিক কর্তৃত্ব রক্ষায় আত্মনিয়ন্ত্রণ বা সেলফ-রেগুলেশনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত বলেন, আত্মনিয়ন্ত্রণ মানে সমালোচনা এড়িয়ে যাওয়া নয়; বরং বিশ্বাসযোগ্যতা আরও শক্তিশালী করা। এর মাধ্যমে গণমাধ্যম ন্যায়, নির্ভুলতা ও সততার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকে এবং ভুল হলে স্বচ্ছতার সঙ্গে তা সংশোধন করে।

তিনি বলেন, কার্যকর আত্মনিয়ন্ত্রণ দর্শক-পাঠক, নীতিনির্ধারক এবং সাংবাদিকতা পেশার ভেতরে আস্থা তৈরি করে। জনআস্থা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা একে অপরকে শক্তিশালী করে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে নিকোলাস উইকস বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সংগ্রাম জটিল এবং এজন্য প্রয়োজন আইনি সুরক্ষা, সামাজিক সংস্কৃতি ও স্বচ্ছতার প্রতি সম্মিলিত অঙ্গীকার।

নিজ দেশ সুইডেনের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, সেখানে গণমাধ্যমের প্রতি জনগণের আস্থা তুলনামূলকভাবে বেশি। এর পেছনে রয়েছে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় সরকারের ভূমিকা।

তিনি বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কখনও নিশ্চিতভাবে পাওয়া যায় না; এটি গড়ে তুলতে হয়, রক্ষা করতে হয় এবং বারবার নতুন করে শক্তিশালী করতে হয়।

দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনকে বাংলাদেশের বাস্তবতায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও জনআস্থা নিয়ে গভীর আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন সুইডেনের রাষ্ট্রদূত।

সম্মেলনের আয়োজনে দীর্ঘদিনের অংশীদার এমআরডিআই-এর ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি বলেন, এই আয়োজন শুধু একটি সম্মেলনের সূচনা নয়; বরং সততা, দায়বদ্ধতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে জনগণকে তথ্য দেওয়ার যৌথ অঙ্গীকারের নবায়ন।

আরও পড়ুন

×