ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ভারত ও চীনের চার কেন্দ্রের বিদ্যুতের দাম অস্বাভাবিক

ভারত ও চীনের চার কেন্দ্রের বিদ্যুতের দাম অস্বাভাবিক
×

 হাসনাইন ইমতিয়াজ 

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ | ০৭:১৮ | আপডেট: ০৯ মে ২০২৬ | ০৭:২৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

ভারত ও চীনের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে নির্মিত চারটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। সরকারের অভ্যন্তরীণ এক নথিতে বলা হয়েছে, এসব কেন্দ্রের বিদ্যুতের ট্যারিফ বা ক্রয়মূল্য অস্বাভাবিক বেশি। আগের সরকারের সময় করা বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির (পিপিএ) কিছু শর্তের কারণেই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। 

বিদ্যুৎকেন্দ্র চারটি হলো– ভারতের ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত আদানি গ্রুপের গোড্ডা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, বাগেরহাটে ভারত সরকারের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে নির্মিত রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র (মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্ট), পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় চীনের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে নির্মিত পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আরপিসিএল-নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার লিমিটেড (আরএনপিএল)।

অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির জন্য প্রস্তুত করা নথিতে বলা হয়েছে, এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের বিদ্যুৎ খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এগুলোর উচ্চ ট্যারিফ দেশের ওপর আর্থিক চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রি করতে গিয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) বড় অঙ্কের ভর্তুকির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুসারে, আদানি গ্রুপের গোড্ডা এবং তিনটি যৌথ মালিকানার কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের জন্য বছরে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি লাগবে। 

এমন পরিস্থিতিতে ভারত ও চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা করে সংশ্লিষ্ট চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়ার চিন্তা করছে সরকার। বিদ্যুৎ বিভাগের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব চুক্তিতে রিটার্ন অন ইকুইটি (আরওই), নন-রেগুলেটেড রিটার্ন অন ইকুইটি (এআরওই), পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় (ওঅ্যান্ডএম কস্ট) এবং হিট রেটের মতো আর্থিক উপাদান এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বিদ্যুতের ট্যারিফ অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যয় ও ক্যাপাসিটি চার্জ সরকারের ওপর দীর্ঘমেয়াদি বড় আর্থিক দায় তৈরি করেছে।

সরকারের নথিতে বলা হয়েছে, দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে এসব শর্ত পুনর্বিবেচনা করা গেলে ট্যারিফ কমানো সম্ভব হতে পারে। এতে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। 
অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা কমিটিও এর আগে বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর চুক্তি ও ব্যয় কাঠামো পুনর্বিবেচনার সুপারিশ করেছিল। কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছিল, দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে করা কয়েকটি চুক্তিতে অতিরিক্ত ব্যয় ও ঝুঁকির ভার চাপানো হয়েছে। বিশেষ করে ক্যাপসিটি চার্জ, ডলারভিত্তিক পরিশোধ ব্যবস্থা এবং উচ্চ রিটার্ন নিশ্চয়তার বিষয়গুলো দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে। কমিটি কয়েকটি বিদ্যুৎ প্রকল্পের ট্যারিফ ও চুক্তির শর্ত পুনরায় আলোচনারও পরামর্শ দিয়েছিল।

বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, এখন চুক্তি সংশোধনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদেশি ঋণ। পায়রা ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিপরীতে বিদেশি ঋণ রয়েছে এবং সেই ঋণের জন্য রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টিও দেওয়া হয়েছে। ফলে ট্যারিফ কমাতে গেলে সংশ্লিষ্ট বিদেশি ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমোদন প্রয়োজন হবে। এখন পর্যন্ত সেই ছাড়পত্র না পাওয়ায় সংশোধিত ট্যারিফ প্রস্তাব সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উপস্থাপন করা যায়নি।

বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, এ বিষয়ে ঋণদাতাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি ভারত ও চীনের সঙ্গেও কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

বর্তমানে যৌথ বিনিয়োগের দুটি বড় কেন্দ্র পূর্ণসক্ষমতায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। বাংলাদেশ-চীন যৌথ উদ্যোগের পায়রা এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ২০২০ সালের ডিসেম্বরে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায়। অন্যদিকে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ উদ্যোগের রামপাল এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কেন্দ্র উৎপাদনে আসে ২০২৪ সালের মার্চে। এ দুই কেন্দ্রকে গত মার্চ পর্যন্ত সরকার ভর্তুকি দিয়েছে। তবে আরপিসিএল-নরিনকো পাওয়ার লিমিটেডের (আরএনপিএল) পটুয়াখালী এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র এখনও পুরোপুরি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারেনি। যদিও বিদ্যুৎ সংকট সামাল দিতে কেন্দ্রটির একটি ইউনিট গত সেপ্টেম্বর থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। কিন্তু পুরো প্রকল্পের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিল করতে পারছে না। ফলে কয়লা কেনার জন্য অর্থ সংকট সৃষ্টি হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ আশঙ্কা করছে, দ্রুত আর্থিক সমাধান না হলে কেন্দ্রটির উৎপাদন কার্যক্রমও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় অবস্থিত এক হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। কয়লার মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি নিয়ে আদানি ও পিডিবির মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য থাকায় বিষয়টি বর্তমানে সিঙ্গাপুরে সালিশ পর্যায়ে রয়েছে। আদানির মতে, মার্চ পর্যন্ত বকেয়া প্রায় ৬৮৮ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ৩৯৩ মিলিয়ন ডলারকে বিতর্কহীন বলছে আদানি। 

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার কারণে গ্যাস ও তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো জ্বালানি সংকটে পড়ায় সরকার এখন কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ওপর আরও বেশি নির্ভর করছে। এ জন্য উচ্চমূল্যে কয়লা আমদানি করেও এসব কেন্দ্র সচল রাখার চেষ্টা চলছে। এতে ভর্তুকির চাপ আরও বাড়ছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের নথিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সম্ভাব্য ভর্তুকির একটি হিসাবও দেওয়া হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, শুধু এই চার বড় কেন্দ্রের জন্যই আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সম্ভাব্য ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় ২৭ হাজার ৭২১ কোটি টাকা। এর মধ্যে আদানি পাওয়ারের জন্য সাত হাজার ৮২১ কোটি টাকা, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ছয় হাজার ৮২৫ কোটি টাকা, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ছয় হাজার ৮১৪ কোটি টাকা এবং আরএনপিএলের পটুয়াখালী কেন্দ্রের জন্য ছয় হাজার ২৬০ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রয়োজন হতে পারে বলে সরকারি নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, একসময় দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে যেসব চুক্তি করা হয়েছিল, এখন সেগুলোর আর্থিক প্রভাব সামনে আসছে। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও উচ্চ ট্যারিফ, ডলারের দাম বৃদ্ধি, জ্বালানি ব্যয় এবং ভর্তুকিনির্ভর কাঠামোর কারণে পুরো খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতা চাপে পড়েছে। এ অবস্থায় সরকারের উচিত বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির শর্ত পুনর্বিবেচনার পথ খুঁজে বের করা।

চলতি বছরও বাড়ছে ভর্তুকি 
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, বিদ্যুতের উৎপাদন ও ক্রয় ব্যয় দ্রুত বাড়লেও বিক্রয়মূল্য একই হারে না বাড়ায় এ সংকট সৃষ্টি হয়েছে। গ্যাসের দাম ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে প্রতি ঘনমিটারে ৫ টাকা ২ পয়সা থেকে বেড়ে ১৫ টাকা ৫০ পয়সায় পৌঁছেছে, যা ২০৮ শতাংশ বৃদ্ধি। সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দামও ৩৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। পাশাপাশি ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। 

এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর এলএনজি, ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের সরবরাহ সংকট দেখা দেয়। এরপরও সরকার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণসক্ষমতায় চালু রেখে বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা করছে। এ জন্য উচ্চমূল্যে হলেও আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলএনজি সংগ্রহ করা হচ্ছে। এতে ভর্তুকির চাপ আরও বেড়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে পিডিবির সম্ভাব্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার ৯৬৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। 

তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে মোট বরাদ্দ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। ইতোমধ্যে ৩২ হাজার ৭১০ কোটি টাকা ছাড় হয়েছে। ফলে হাতে রয়েছে মাত্র তিন হাজার ২৮৯ কোটি টাকা। এর বাইরে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজন হবে ১৫ হাজার ২৪৭ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। 

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সম্ভাব্য ঘাটতির পরিমাণ ৬৫ হাজার ৫৫৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা হতে পারে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এর মধ্যে সম্প্রতি তরল জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিজনিত অতিরিক্ত ঘাটতি ধরা হয়েছে ১১ হাজার ২৬৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা।

জানতে চাইলে পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, ‘বিদ্যুতের দাম ও চুক্তির শর্ত পর্যালোচনার জন্য আমরা চেষ্টা করছি। যৌথ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিষয়ে ঋণদাতাদের সম্মতি লাগবে, সেটা পাওয়া যাচ্ছে না। তবে আমরা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি।’

এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সমকালকে বলেন, দেশের বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও উৎপাদন সক্ষমতা এর চেয়ে বেশি, ৩০ হাজার মেগাওয়াট। রিজার্ভ মার্জিন ধরে রাখতে ২২ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা হলেই চলে। ফলে কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র অব্যবহৃত অবস্থায় থাকছে। কিন্তু এসব কেন্দ্রের সঙ্গে করা চুক্তির কারণে সরকারকে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।

মন্ত্রী আরও বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাত এখন সম্পূর্ণভাবে আমদানি করা জ্বালানি, কয়লা ও এলএনজির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামে অস্থিরতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়ছে। অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো নিয়ে একটি প্রতিবেদন দিয়ে গেছে। আমরাও একটি কমিটি করেছি। চুক্তিগুলো যাচাই-বাছাই করে তারা প্রতিবেদন দেবে। এরপর করণীয় ঠিক করা হবে।’

আরও পড়ুন

×