ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স

স্বাধীন সাংবাদিকতা ছাড়া গণতন্ত্র ও জবাবদিহি অসম্ভব

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সংকট, সেলফ সেন্সরশিপ, গণমাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাব ও তথ্যদাতার অভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ

স্বাধীন সাংবাদিকতা ছাড়া গণতন্ত্র ও জবাবদিহি অসম্ভব
×

বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাঁ থেকে ইউনেস্কোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি সুজান ভাইজ, সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলস উইক ও এমআরডিআইর নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান। বক্তব্য রাখছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান- সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ | ০৭:৪১ | আপডেট: ০৯ মে ২০২৬ | ১৫:৪০

| প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাধীন সাংবাদিকতা ও শক্তিশালী সম্পাদকীয় কাঠামো ছাড়া গণতন্ত্র, সুশাসন এবং জনজবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব, আত্মনিয়ন্ত্রণমূলক সেন্সরশিপ, মুনাফাকেন্দ্রিকতা এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় তথ্যদাতার সংকট বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল শুক্রবার রাজধানীতে শুরু হওয়া বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্সে দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান সম্পাদক, সাংবাদিক ও গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা এ কথা বলেন।

দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনের আয়োজন করেছে মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই)। গতকাল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ছাড়াও পৃথক অধিবেশন ছিল। এমআরডিআইয়ের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে এ আয়োজন করা হয়।

এতে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা শিক্ষার অন্তত ৩৭ জন শিক্ষক অংশ নেন। দেশের সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকসহ পাঁচশর বেশি সাংবাদিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন। আজ এ অনুষ্ঠানের শেষ দিন।

প্রথম দিনের অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। গণমাধ্যমকে অংশীদার হিসেবেই দেখতে চায় সরকার গণমাধ্যমকে সরকারের ‘ইনফরমেশন পার্টনার’ বা তথ্যের অংশীদার হিসেবে সরকার দেখতে চায় বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।

তিনি বলেন, নতুন মাধ্যম ও প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে গোটা বিশ্বে গণমাধ্যম এক বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার ও সংবাদমাধ্যমকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে।

সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে মন্ত্রী বলেন, আয়োজনটি আগে থেকেই সুপরিকল্পিত ছিল। তাই দীর্ঘ বক্তব্য না দিয়ে তিনি মূলত শুভেচ্ছা জানাতেই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। আয়োজকদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, অল্প সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণে এমন একটি সাংবাদিকতা সম্মেলন আয়োজন দেশের জন্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।

অতীতে সরকার পতনের অন্যতম কারণ স্বাধীন গণমাধ্যমকে বিকশিত হতে না দেওয়া 
সম্মেলনের প্রথম অধিবেশনে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, অতীতের সরকারগুলোর পতনের অন্যতম কারণ ছিল স্বাধীন গণমাধ্যমকে বিকশিত হতে না দেওয়া। তাঁর মতে, সরকারের সাফল্যের জন্যও স্বাধীন সাংবাদিকতা প্রয়োজন। তিনি বলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মধ্যেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিহিত। কিন্তু অতীতে দেশে যথেষ্ট অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা হয়নি, এখনও খুব হচ্ছে বলা যাবে না। ভবিষ্যতে হবে কিনা, তা নির্ভর করছে সম্পাদকদের ভূমিকার ওপর।

সাংবাদিকতার রাজনীতিকীকরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মাহফুজ আনাম বলেন, ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সাংবাদিক নেতৃত্বের পরিবর্তন গণমাধ্যমের জন্য অশনিসংকেত। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা সাংবাদিকতা করতে করতেই রাজনীতির মধ্যে ঢুকে যাই। এক শাসনামলে এক দল সাংবাদিক নেতৃত্বে থাকে, অন্যরা কোণঠাসা হয়ে পড়ে; আবার শাসন বদলালে নেতৃত্বও বদলে যায়।’

প্রথম অধিবেশনের শিরোনাম ‘বাংলাদেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা’। এতে পাকিস্তানের প্রভাবশালী দৈনিক ডনের সম্পাদক জাফর আব্বাস, কানাডার টরন্টো স্টারের সাবেক সম্পাদক মাইকেল কুক, যমুনা টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম আহমেদ, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক তৌহিদুল ইসলাম প্রমুখ অংশ নেন। বিবিসির সাবেক সাংবাদিক শাকিল আনোয়ার এটি সঞ্চালনা করেন।

সরাসরি সেন্সরশিপের চেয়ে সেলফ সেন্সরশিপ প্রায়ই বেশি ক্ষতিকর
জাফর আব্বাস বলেন, একটি সংবাদপত্রের টিকে থাকা সম্পূর্ণভাবে এর সম্পাদকীয় টিমের স্বায়ত্তশাসন ও সততার ওপর নির্ভর করে। এক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং প্রকাশকদের সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও যোগ করেন, ভালো সাংবাদিকতা করার জন্য আপনি যদি আপনার সম্পাদক ও তাঁর সহকর্মীদের বিশ্বাস করতে না পারেন, তবে একটি মিডিয়া হাউস কখনও সফল হতে পারবে না।

বেসরকারি বা রাষ্ট্রীয় খাতের দুর্নীতি উন্মোচনকে ‘এক ধরনের জনসেবা’ আখ্যা দিয়ে আব্বাস সতর্ক করেন, সরাসরি সেন্সরশিপের চেয়ে সেলফ সেন্সরশিপ প্রায়ই বেশি ক্ষতিকর; কারণ গণমাধ্যমগুলো জনসমক্ষে এটি স্বীকার করতে পারে না।

মাইকেল কুক বলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাই একটি সংবাদমাধ্যমকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। তবে এ ধরনের সাংবাদিকতার জন্য শুধু সাংবাদিকের সাহস নয়; সম্পাদক ও মালিকের সমর্থন প্রয়োজন।

গণমাধ্যমের সংকট ও সম্ভাবনা দুইই আছে
এর আগে সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন ইউনেস্কোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি সুজান ভাইজ, সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলস উইক, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, জিআইজেএনের নির্বাহী পরিচালক এমিলিয়া ডিয়াজ স্ট্রাক ও এমআরডিআইর নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান।

মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের (এমআরডিআই) নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান জানান, সম্মেলনের ফেলোশিপ কর্মসূচির জন্য ৬০ জন নির্বাচনের পরিকল্পনা থাকলেও ১৮৮টি প্রতিবেদন প্রস্তাব জমা পড়েছে।

উদ্বোধনী পর্বে অনলাইনে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের নির্বাহী পরিচালক এমিলিয়া দিয়াজ স্ট্র্যাক।

দ্বিতীয় অধিবেশনের শিরোনাম ‘দুর্নীতির অনুসন্ধান’। এতে বক্তব্য দেন কানাডার অনুসন্ধানী সাংবাদিক, লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা জুলিয়ান শের, সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী, সাংবাদিক বদরুদ্দোজা বাবু ও ডেইলি স্টারের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জাইমা ইসলাম। সঞ্চালনা করেন সাবির আনোয়ার।

অনুসন্ধানী ডকুমেন্টারি নির্মাণে কৌশল ও ঝুঁকি
অ্যান্টারা হলে অনুষ্ঠিত ‘মাস্টারক্লাস: ইনভেস্টিগেটিভ ডকুমেন্টারি স্টোরিটেলিং’ অধিবেশনটি পরিচালনা করেন অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও প্রশিক্ষক জুলিয়ান শের। তিনি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মৌলিক উপাদানকে কীভাবে শক্তিশালী ভিজ্যুয়াল গল্পে রূপ দেওয়া যায়, তা তুলে ধরেন।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় সময় নির্বাচন ও দলগত কাজ বড় বিষয়
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় দলগত কাজের গুরুত্ব তুলে ধরে শাহেদ মুহাম্মদ আলী বলেন, এখন আর একা বড় অনুসন্ধান করা প্রায় অসম্ভব। ‘দুর্নীতি একটা প্রক্রিয়া, এটা একটা নেটওয়ার্ক এবং এটা একটা সংস্কৃতি। যারা এই দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত, তারা অনেক বড় জোট। সেই জোটের বিরুদ্ধে আপনি একা ফাইট করতে পারবেন না।’

তিনি বলেন, ‘একটি বড় অনুসন্ধানী প্রতিবেদন কীভাবে উপস্থাপন করা হবে, কতটুকু প্রকাশ করা হবে, সেটিও ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আমি একটা খুব বড় ইনভেস্টিগেশন করলাম, কিন্তু আমি কীভাবে এটাকে প্রেজেন্ট করব এবং কতটুকু এক্সপোজ করব, সেটাও আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনা করে।

অনুসন্ধান যখন অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে, তখন প্রকাশের সময় নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হয়ে দাঁড়ায়। কোন টাইম আমার জন্য সবচেয়ে কম ঝুঁকি সৃষ্টি করবে। কারণ যেসব চ্যালেঞ্জের কথা আমরা শুনি, সেগুলোকে মিনিমাইজ করার জন্য অথবা সেগুলোর ইফেক্টটা একটু কমিয়ে আনার জন্য সময় নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ।’

সমকাল সম্পাদক বলেন, ‘এই সময় নির্বাচন করতে গিয়ে শুধু বার্তাকক্ষের ভেতরের প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়; প্রতিবেদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং প্রতিবেদনের বাইরের বিভিন্ন পক্ষের গতিবিধিও পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়। খবরের বাইরে, পত্রিকার বাইরে আরও কিছু যোগাযোগ স্থাপন করতে হয়। যেই চরিত্রগুলোও থাকে প্রতিবেদনের সঙ্গে এবং প্রতিবেদনের বাইরে। তাদের গতিবিধিও আমাদের নজরদারিতে রাখতে হয়।’

অন্তর্ভুক্তিমূলক নিউজরুম গড়তে হবে
মল্লিকা হলে অনুষ্ঠিত ‘বিল্ডিং ইনক্লুসিভ কালচার উইদিন নিউজ রুমস’ শীর্ষক অধিবেশনে গণমাধ্যমে জেন্ডার সমতা ও বৈচিত্র্যের প্রশ্ন সামনে আসে। সেশনটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর জার্নালিস্ট রিক্রুটমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কনসালট্যান্ট কুররাতুল আইন তাহমিনা। আলোচনায় অংশ নেন আনন্দবাজার পত্রিকার সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর স্বাতী ভট্টাচার্য, প্রথম আলো ওয়েবের (ইংরেজি) টিম লিডার আয়েশা কবির, লাইভ টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তালাত মামুন, গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের (জিআইজেএন) বাংলা সম্পাদক এস কে তানভীর মাহমুদ প্রমুখ।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ
বিশেষ সেশন ‘মিডিয়া ফ্রিডম ইন বাংলাদেশ-রোল অব স্টেকহোল্ডারস’-এ দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের ভূমিকা ও দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা হয়। অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমদ।

আলোচনায় অংশ নেন ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, ইউনেস্কো বাংলাদেশ অফিসার প্রতিনিধি সুজান ভাইজ, গ্লোবাল ফোরাম ফর মিডিয়া ডেভেলপমেন্টের ডেপুটি চিফ ড. লক্ষণ দত্ত পান্ত, মাছরাঙা টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদক রেজোয়ানুল হক এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির মিডিয়া অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের চেয়ারম্যান ড. এস এম রেজওয়ান উল আলম।

দুঃখপ্রকাশ
নিউএজ সম্পাদক নূরুল কবীর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না। কিন্তু ছাপা সংস্করণ ও অনলাইনের প্রথম প্রতিবেদনে ভুলবশত তাঁর নাম প্রকাশিত হয়েছে। এজন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত।

আরও পড়ুন

×