ইউল্যাবে নদী রক্ষায় ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ‘তুরাগ বন্ধন’
ছবি: সংগৃহীত
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬ | ১৫:৫০ | আপডেট: ১০ মে ২০২৬ | ১৭:৫৭
বাংলাদেশের ইতিহাস, সভ্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে নদীর সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা কিংবা বুড়িগঙ্গা—প্রতিটি নদী শুধু জলপ্রবাহ নয়; বরং মানুষের জীবনযাত্রা, অর্থনীতি, লোকসংস্কৃতি, কৃষি, বাণিজ্য ও স্মৃতির ধারক। অথচ এই নদীমাতৃক দেশেই আজ অধিকাংশ নদী দখল, দূষণ, অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার শিকার। নগরায়ণ ও শিল্পায়নের চাপে বিশেষত রাজধানী ঘিরে থাকা নদীগুলোর অস্তিত্বই আজ হুমকির মুখে। এই প্রেক্ষাপটে নদী রক্ষাকে কেন্দ্র করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা এখন শুধু পরিবেশগত প্রয়োজন নয়, বরং একটি সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব।
এই দায়িত্ববোধ থেকেই ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)-এর জেনারেল এডুকেশন বিভাগ (জিইডি) ধরিত্রী দিবস উপলক্ষে গত ২০ এপ্রিল আয়োজন করে ব্যতিক্রমী কর্মসূচি—‘তুরাগ বন্ধন: তুরাগ নদী পদযাত্রা’। এই আয়োজন শুধু একটি প্রতীকী পদযাত্রা নয়; বরং নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তার সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের পক্ষে এক মানবিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক অঙ্গীকার।

দিনব্যাপী এই কর্মসূচির সূচনা হয় একটি গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক সেমিনারের মাধ্যমে। ‘বুড়িগঙ্গা সংলাপ: ঐতিহ্য, সংকট ও বিদ্যায়তনের ভূমিকা’ শীর্ষক এই আলোচনায় মূল বক্তব্য দেন লেখক, নদী গবেষক এবং ‘রিভারাইন পিপল’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সেক্রেটারি জেনারেল শেখ রোকন।
তিনি নদীকে কেবল ভৌগোলিক উপাদান হিসেবে নয়, বরং জ্ঞান, স্মৃতি ও রূপান্তরের ধারক হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, একটি বিশ্ববিদ্যালয় যেমন নতুন চিন্তা, বিতর্ক ও জ্ঞানের প্রবাহ সৃষ্টি করে, তেমনি নদীও বহমানতার মধ্য দিয়ে সভ্যতাকে ধারণ করে।
শেখ রোকন তাঁর বক্তব্যে স্মরণ করিয়ে দেন, বুড়িগঙ্গা একসময় ছিল ঢাকার প্রাণকেন্দ্র—বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও নগরজীবনের প্রধান উৎস। কিন্তু আজ সেই নদী ভয়াবহ দূষণ ও দখলের শিকার। তিনি বলেন, নদী রক্ষার সংগ্রাম কেবল পরিবেশবাদীদের দায়িত্ব নয়; বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষক, শিক্ষার্থী ও নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে নদীকেন্দ্রিক জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন ইউল্যাব-এর উপাচার্য অধ্যাপক সামসাদ মোর্তজা। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, শিক্ষা শুধু শ্রেণিকক্ষের ভেতর সীমাবদ্ধ নয়; সমাজ, প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধতা তৈরিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম কাজ। সমাপনী বক্তব্যে জেনারেল এডুকেশন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক শাহনাজ হুসনে জাহান নদী রক্ষার প্রশ্নে আন্তঃবিষয়ক শিক্ষা ও অংশগ্রহণমূলক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। পুরো আয়োজন সমন্বয় করেন জেনারেল এডুকেশন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. আহমেদ আবিদ।
সেমিনারের পর বিকেলে শিক্ষার্থীরা তুরাগ নদীর তীরে পদযাত্রা করেন। নদীর তীরে গিয়ে শিক্ষার্থীরা প্রদীপ জ্বালান, মাটির হাঁড়ি স্থাপন করেন এবং ফুল দিয়ে কুলা সাজিয়ে নদীর প্রতি প্রতীকী শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। বাংলার লোকঐতিহ্য ও পরিবেশসচেতনতার সমন্বয়ে এই আয়োজন নদীকে ঘিরে মানুষের আবেগ ও সম্পর্ককে নতুনভাবে প্রকাশ করে। এটি নদী রক্ষাকে কেবল পরিবেশগত কর্মসূচি হিসেবে নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক সম্পৃক্ততা ও সামাজিক চর্চা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা।
এ সময় ইউল্যাব-এর বিবিএল বিভাগের শিক্ষার্থী লিথিজলের নেতৃত্বে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা নদী রক্ষার শপথ পাঠ করেন। তারা প্রতিজ্ঞা করেন, নদীতে কোনো ধরনের বর্জ্য ফেলবেন না, অন্যদেরও সচেতন করবেন এবং নদীকে পরিষ্কার ও জীবন্ত রাখতে সামাজিক উদ্যোগে অংশ নেবেন। শপথের এই মুহূর্তটি ছিল আবেগঘন এবং একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও নৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ—কারণ এটি নদীকে কেবল একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, বরং অধিকারসম্পন্ন জীবন্ত সত্তা হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানায়।
এই আয়োজনকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে জেনারেল এডুকেশন বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যৌথ বিবৃতি। বিবৃতিতে তারা বলেন, আমরা, জেনারেল এডুকেশন বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)-এর শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা, ‘তুরাগ বন্ধন: – ইউল্যাব শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে একটি জীবন্ত নদী পুনরুদ্ধার’ উদ্যোগের অংশ হিসেবে একত্রিত হয়ে তুরাগ নদীকে একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করছি। তুরাগ নদী, যা ইউল্যাব ক্যাম্পাসের পাশ দিয়ে প্রবাহিত, আমাদের অঞ্চলের জীবন, স্মৃতি, সংস্কৃতি ও ইতিহাস বহনকারী একটি পরিবেশগত, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক সত্তা।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, নদী কেবল একটি জলাধার নয়; বরং এটি মানব ও অমানব জীবনের ধারাবাহিকতা, জীববৈচিত্র্য ও সম্প্রদায়গত ঐতিহ্যের ধারক। এই উপলব্ধি থেকেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা নদীর মর্যাদা রক্ষা, সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের দায়িত্ব গ্রহণের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
তারা স্মরণ করেন যে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট দেশের সব নদ-নদীকে “জীবন্ত সত্তা”, “আইনি ব্যক্তি” এবং “আইনি সত্তা” হিসেবে ঘোষণা করে। তবে বাস্তবে এই স্বীকৃতির প্রয়োগ এখনও সীমিত। ফলে নদী রক্ষায় সামাজিক ও শিক্ষাগত চর্চা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর তারা গুরুত্বারোপ করেন।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয় যে, তারা নদীতে কোনো ধরনের বর্জ্য বা দূষণকারী পদার্থ ফেলবেন না এবং অন্যদেরও এ বিষয়ে সচেতন করবেন। নদীকে পরিষ্কার, জীবন্ত ও টেকসই রাখতে সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে তারা সক্রিয় ভূমিকা পালন করবেন। “তুরাগ বন্ধন” কর্মসূচির অংশ হিসেবে ভাসমান আলো, ফুল ও মুদ্রা নিবেদনকে তারা নদীর প্রতি শুভকামনা, কৃতজ্ঞতা ও পুনর্জীবনের প্রত্যাশার প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেন।
এই যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা উঠে আসে—নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া শুধু পরিবেশগত বা আইনি প্রশ্ন নয়; বরং এটি একটি শিক্ষাগত, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক চর্চা। বুড়িগঙ্গা–তুরাগ অববাহিকার মধ্যে অবস্থিত একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইউল্যাব-এর শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা মানব ও প্রকৃতির মধ্যে টেকসই সম্পর্ক গড়ে তোলার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
আয়োজকদের মতে, বাংলাদেশে এই প্রথম কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নদীর তীরে গিয়ে এমন প্রতীকী বন্ধন ও শপথের মাধ্যমে নদীর প্রতি দায়বদ্ধতা প্রকাশ করেছে। তারা আশা করছেন, ‘তুরাগ বন্ধন’ ভবিষ্যতে একটি বার্ষিক কর্মসূচিতে পরিণত হবে এবং দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও ছড়িয়ে পড়বে।
প্রকৃতপক্ষে, নদী রক্ষার আন্দোলন কেবল আইন বা প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে সফল হবে না, যদি না সমাজের মানুষের মধ্যে নদীকে ঘিরে নতুন নৈতিকতা ও সচেতনতা তৈরি হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে। কারণ এখান থেকেই গড়ে ওঠে আগামী দিনের নীতিনির্ধারক, গবেষক, সাংবাদিক, উন্নয়নকর্মী ও নাগরিক নেতৃত্ব।
হিমালয় থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত বিস্তৃত বাংলাদেশের নদীমাতৃক ঐতিহ্য আজ নানা সংকটে আক্রান্ত। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পদূষণের কারণে নদীগুলো হারাচ্ছে তাদের প্রাণশক্তি। এই বাস্তবতায় “তুরাগ বন্ধন” শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক কর্মসূচি নয়; এটি নতুন প্রজন্মের পক্ষ থেকে নদীর প্রতি ভালোবাসা, দায়বদ্ধতা ও প্রতিরোধের এক সাংস্কৃতিক ঘোষণা।
নদীকে ঘিরে এমন মানবিক ও শিক্ষামূলক উদ্যোগই পারে ভবিষ্যতে একটি নদীবান্ধব সমাজ গড়ে তুলতে—যেখানে উন্নয়ন ও পরিবেশ, আধুনিকতা ও ঐতিহ্য, মানুষ ও প্রকৃতি পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং সহাবস্থানের অংশ।
- বিষয় :
- বাংলাদেশ
- নদী
- নদী সুরক্ষা
